করপোরেট, রাজনীতি ও মানবাধিকার

বৈশ্বিক ক্ষমতার ধূসর অঞ্চল ফিফার স্পন্সরশিপ

বিশ্বকাপ একসময় ছিল শুধু ফুটবলের উৎসব। এখন এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি। প্রতি ম্যাচে ২২ জন খেলোয়াড় বলের পেছনে ছোটেন, কিন্তু মাঠের বাইরে চলে আরো বড় এক খেলা। বিলিয়ন ডলারের সম্প্রচার স্বত্ব, বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির লড়াই ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের হিসাবনিকাশ করে চলতে হয় আয়োজক সংস্থা ফিফাকে।

শুধু আর মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই ফুটবল বিশ্বকাপ। এটি এমন এক বৈশ্বিক বাণিজ্যিক মঞ্চ—যেখানে বহুজাতিক করপোরেশন, ব্র্যান্ড, রাজনীতি, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক শক্তি এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। যেখানে ধূসর রেখার মতো ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যকে আর আলাদা করা যায়নি। এদিক থেকে ফিফার বিশ্বকাপ স্পন্সরশিপের ইতিহাস তাই শুধু বিজ্ঞাপনের ইতিহাস নয়। এটি আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতার অর্থনীতি বোঝারও একটি উপায়।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ছিল উরুগুয়ে, তখন ফিফার বাণিজ্যিক কাঠামো বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। মূলত অলিম্পিক ফুটবলের বিকল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে শুরু হয়েছিল টুর্নামেন্টটি। তখনো ‘স্পোর্টস স্পন্সরশিপ’ ধারণা গড়ে ওঠেনি। স্টেডিয়ামে কিছু বিচ্ছিন্ন বিজ্ঞাপন থাকলেও সেগুলো ছিল অনানুষ্ঠানিক ও স্থানীয় পর্যায়ের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টেলিভিশনের বিস্তার বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে নতুন অদল দেয়। এর মূল্য বুঝতে শুরু করে ব্র্যান্ডগুলো। অল্প সময়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের এটাই সুবর্ণ সুযোগ।

এ সময় দুই জার্মান ভাইয়ের কোম্পানি অ্যাডিডাস ও পুমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পোর্টস মার্কেটিংয়ের নতুন যুগ তৈরি করে। খেলোয়াড়দের বুট, ম্যাচ বল, ক্যামেরার সামনে দৃশ্যমান লোগো—সবকিছুই ধীরে ধীরে পরিকল্পিত বাণিজ্যিক কৌশলে পরিণত হয়। ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে কিংবদন্তি পেলের পুমা বুট বাঁধার দৃশ্য আজও স্পোর্টস মার্কেটিং ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত মুহূর্ত। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল বনাম পেরু ম্যাচের কিক-অফের মুহূর্তে পেলে রেফারিকে থামিয়ে নিচু হয়ে জুতার ফিতা বাঁধেন। ঠিক সেই মুহূর্তে টেলিভিশন ক্যামেরা জুম করে পুমার লোগো দেখায়। উত্তেজনাকর কিক-অফের ঠিক আগের কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য কোটি দর্শকের সামনে ব্র্যান্ডটিকে পৌঁছে দেয়, যা ছিল পুমার একটি মাস্টারপ্ল্যান।

বিশ্বকাপ স্পন্সরশিপের ইতিহাস আধুনিক বাঁকটি আসে ১৯৭৮ সালে। ওই বছর আয়োজক দেশ ছিল আর্জেন্টিনা। এর আগে বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা ছিল অনেকটা বিশৃঙ্খল। বিভিন্ন স্থানীয় এজেন্ট স্টেডিয়ামের পাশে বিজ্ঞাপন বিক্রি করত, কিন্তু ফিফা নিজে খুব কম আয় করত। ব্রিটিশ মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক ন্যালি প্রথমবারের মতো ‘এক্সক্লুসিভ স্পন্সরশিপ’ ধারণাটি চালু করেন। অর্থাৎ একটি পণ্যের ক্যাটাগরিতে একটিই ব্র্যান্ড বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

নতুন এ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কোকা-কোলা। কোম্পানিটি শুধু বিজ্ঞাপন দেয়নি; স্টেডিয়ামে কোমলপানীয় বিক্রি, টিভি সম্প্রচারে উপস্থিতি, বিশ্বকাপের প্রতীক ব্যবহারের অধিকার—সবকিছু একত্রে পেয়েছিল। বিজ্ঞাপনী মডেলটি এত সফল হয় যে পরে অলিম্পিকসহ প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন একই কাঠামো অনুসরণ করে। সেখান থেকেই বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে করপোরেট সাম্রাজ্যে রূপ নিতে শুরু করে।

আজ ফিফার অর্থনীতি কয়েক বিলিয়ন ডলারের। সংস্থাটি চার বছর মিলিয়ে একটি আর্থিক চক্র হিসাব করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২২ সালে ফিফা প্রায় ৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে, অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আয়ের সবচেয়ে বড় অংশের উৎস সম্প্রচার স্বত্ব, প্রায় ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য বিপুল অর্থ দেয়, কারণ এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দর্শক পাওয়া ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর একটি। এখানেও চ্যানেলগুলোর আয়ের বড় অংশ খেলার বিরতিতে বিজ্ঞাপন।

স্পন্সরশিপ ও মার্কেটিং ফিফার আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। ২০১৯-২২ সালে শুধু মার্কেটিং রাইটস বাবদ ফিফার আয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে ফিফার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুন্দাই মোটর গ্রুপ ও কাতার এয়ারওয়েজ। এরা শুধু বিজ্ঞাপনদাতা নয়, বিশ্বকাপের বৈশ্বিক পরিচয়ের অংশ।

কিন্তু এ বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে তৈরি হয়েছে বড় নৈতিক প্রশ্নও। সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি আসে আয়োজক দেশ নির্বাচনকে ঘিরে। পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং বিশেষ করে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ দেখিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ এখন শুধু ক্রীড়া আয়োজন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি গঠনেরও একটি অস্ত্র।

বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুসারে, কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যয় ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ। এ অবকাঠামো নির্মাণে কাজ করা অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, কাজের পরিবেশ ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন সমালোচনা করেছে।

কিন্তু বিশ্বকাপের বড় স্পন্সরদের বেশির ভাগই খুব সতর্ক ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেয়। কোকা-কোলা, ভিসা ও অ্যাডিডাস মানবাধিকারের গুরুত্ব নিয়ে বিবৃতি দিলেও সরাসরি ফিফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। সমালোচকরা এখানেই ক্রীড়া ধোলাই বা ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ ধারণাটি সামনে আনেন। অর্থাৎ বড় ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে ‘বিতর্কিত রাষ্ট্রগুলো’ নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার সুযোগ পায়।

২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের পর ফিফার স্পন্সর কাঠামোয়ও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। পশ্চিমা কিছু কোম্পানি দূরত্ব তৈরি করলেও চীন ও রাশিয়ার কোম্পানিগুলো দ্রুত জায়গা নেয়। গ্যাজপ্রম, দালিয়ান ওয়ান্ডা গ্রুপ, হাইসেন্স ও ভিভোর মতো ব্র্যান্ড বড় চুক্তি করে। বিশেষ করে দালিয়ান ওয়ান্ডা গ্রুপের চুক্তি ছিল বড় অংকের। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর মূল্য চার বছরে ১৮ কোটি ডলারের বেশি বলা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ব্যবসা নয়; বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার এবং ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি শক্ত করার অংশও।

ফিফার স্পন্সরশিপ নিয়ে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো স্পন্সরদের স্বার্থে আয়োজক দেশের আইন বা নীতি পরিবর্তনের অভিযোগ। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের আগে দেশটির অনেক স্টেডিয়ামে নিরাপত্তার কারণে অ্যালকোহল বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ফিফার বড় স্পন্সর অ্যানহাইজার-বুশ ইনবেভের বিয়ার ব্র্যান্ড বাডওয়াইজারের স্বার্থে আইনটি শিথিল করা হয়। বিশ্বকাপ চলাকালে স্টেডিয়ামে ৩০ লাখের বেশি বাডওয়াইজার ইউনিট বিক্রি হয়েছিল। সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন: একটি বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য কি জাতীয় নীতি বদলানো উচিত?

তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপনও ফিফার ইতিহাসে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে আরজে রেনল্ডস টোবাকোর ক্যামেল ব্র্যান্ড ও ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে আরজেআর ম্যাকডোনাল্ডের এক্সপোর্ট এ ব্র্যান্ড ছিল অফিশিয়াল স্পন্সর। বিশ্বকাপের মাঠে তামাক কোম্পানির বিশাল বিজ্ঞাপন তখন তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে ফিফা বাধ্য হয়ে তামাক স্পন্সরশিপ থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে।

২০১৫ সালের ফিফা দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এ পুরো ব্যবস্থাকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। মার্কিন তদন্তে ফিফা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুস, বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সুইজারল্যান্ডে ফিফা কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের ছবি ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে। এরপর বড় স্পন্সররাও চাপ দিতে শুরু করে। ভিসা জানায়, সংস্কার না হলে তারা সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে। কোকা-কোলা ও অ্যাডিডাস স্বচ্ছতার দাবি তোলে। পরে সনি ও এমিরেটসের মতো কিছু কোম্পানি চুক্তি নবায়ন করেনি।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরেও এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যার বেশির ভাগই আগের বিশ্বকাপগুলোর মতোই মানবাধিকার, রাজনীতি, নিরাপত্তা, করপোরেট প্রভাব ও সামাজিক ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখন মানবাধিকার ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, আয়োজক দেশগুলোর কঠোর অভিবাসন নীতি, সীমান্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বিশ্বকাপ যেন কোনো ‘দমনমূলক পরিবেশের মঞ্চে’ পরিণত না হয়। টুর্নামেন্ট চলাকালে সাধারণ মানুষ, অভিবাসী ও প্রতিবাদকারীদের অধিকার সুরক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছে তারা।

এখানেও রয়েছে স্পোর্টসওয়াশিং বিতর্ক। সম্প্রতি সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি আরামকো ফিফার অফিশিয়াল গ্লোবাল পার্টনার হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই করেছে, যার মূল্য ৬ বিলিয়ন ডলার। সমালোচকরা বলছেন, সৌদি আরব যেভাবে বিশ্ব ফুটবল ও অন্যান্য খেলায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তা মূলত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার রাজনৈতিক কৌশল।

এছাড়া আয়োজক শহরগুলোয় আবাসন সংকট নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শহরে অভিযোগ উঠেছে, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এয়ারবিএনবি ও স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার দাম হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাড়া বৃদ্ধি ও উচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়ছে। কিছু অধিকার সংগঠন বলছে, বিশ্বকাপ ‘স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, পর্যটক ও করপোরেট অতিথিদের জন্য’ হয়ে যাচ্ছে।

ফিফার ওপর আরেকটি সমালোচনা হচ্ছে তারা মানবাধিকার নীতির কথা বললেও বাস্তবে যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করছে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আয়োজক শহরগুলোর অনেকগুলোরই এখনো স্পষ্ট মানবাধিকার সুরক্ষা পরিকল্পনা নেই।

অথচ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পার্টনার হিসেবে কোকা-কোলা, ভিসা, অ্যাডিডাস ও হুন্দাই মোটর গ্রুপের মতো ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্ভুক্তি, বৈচিত্র্য ও বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। যদি কোকা-কোলার বাণিজ্যিক আয়োজন ‘কোক স্টুডিও’ বিবেচনা করা হয়, সেখান থেকেও একটি প্রশ্ন আসে। প্রায়ই ‘কোক স্টুডিও’কে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনে মানবাধিকার হরণের মতো ঘটনা যুক্ত থাকলেও এসব নিয়ে কোম্পানিগুলো থাকে নীরব। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন হলো—যদি বিশ্বকাপ চলাকালে কোনো দেশে মৌলিক অধিকার বা প্রতিবাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে এ ব্র্যান্ডগুলো কী অবস্থান নেবে?

এবার বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে। প্রথমবারের মতো একই আয়োজনে যুক্ত হলো তিন দেশ। একই সঙ্গে এটিই হবে প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে অংশ নেবে ৪৮টি দল। টুর্নামেন্টের পরিধি বাড়ায় ম্যাচসংখ্যা আগের কাতার বিশ্বকাপের ৬৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। ফলে স্পন্সর ও সম্প্রচার অংশীদারদের কাছে বিক্রির মতো অতিরিক্ত বাণিজ্যিক সুযোগ বা ইনভেন্টরি তৈরি হয়েছে ফিফার সামনে।

নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব কাঠামো চালুর পর এটি হলো সেই প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে স্পন্সররা আরো বেশি বিকল্প ও নমনীয়তার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ব্র্যান্ড এখন ফিফার নারী ফুটবল প্রতিযোগিতা ও ইস্পোর্টস প্রপার্টি ঘিরেও আলাদা চুক্তি করার সুযোগ পাচ্ছে। এ বিষয়ে ফিফার প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা রোমি ঘাই বলেন, ‘এটি এরই মধ্যে ফিফার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বাণিজ্যিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে এবং আমরা এখনো গতি ধরে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে আমরা নজিরবিহীন আগ্রহ দেখেছি।’

সমালোচকরা বলছেন, এবারের আয়োজন দল ও ম্যাচের সম্প্রসারণের অন্যতম বাণিজ্যিক সম্পর্ক। বিশেষ করে তিন দেশজুড়ে আয়োজন হওয়ায় উত্তর আমেরিকার বিশাল ভোক্তা বাজারকে কেন্দ্র করে ফিফা আগের যেকোনো আসরের তুলনায় বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখছে।

বিশ্বকাপে স্টেডিয়াম, সম্প্রচার, ডিজিটাল কনটেন্ট—প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে স্পন্সরদের ব্র্যান্ড সরাসরি যুক্ত থাকে। ফলে আয়োজক দেশের রাজনৈতিক বা মানবাধিকার বিতর্ক থেকেও তারা পুরোপুরি আলাদা থাকতে পারে না।

আজকের বিশ্বকাপকে অনেকে ‘করপোরেট মিডিয়া মেগা ইভেন্ট’ হিসেবে দেখেন। স্টেডিয়ামের প্রায় প্রতিটি অংশ ব্র্যান্ডেড। ভিআইপি হসপিটালিটি ও করপোরেট প্যাকেজ বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ দর্শকের জন্য খরচও বেড়েছে অনেক। তবে সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, এ করপোরেট অর্থ ছাড়া আধুনিক বিশ্বকাপের বিশাল সম্প্রচার ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক আয়োজন সম্ভব হতো না।

পরস্পরবিরোধী অনেক অবস্থান নিয়ে ফিফা বিশ্বকাপের স্পন্সরশিপ ইতিহাস জটিল এক বাস্তবতা উপস্থাপন করে। ফুটবল আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে করপোরেট শক্তি, রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি। অর্থাৎ বিশ্বকাপের মাঠে বল গড়ালেও, মাঠের বাইরে আরেকটি খেলা সবসময় চলতে থাকে—ক্ষমতা, প্রভাব ও অর্থের খেলা।

আরও