লিভারপুলে তখন চরম দুঃসময়। শিরোপার দেখা নেই ম্যানইউর পর ইংল্যান্ডের সর্ববৃহৎ ফুটবল ক্লাবে। ধারাবাহিক ব্যর্থতায় ছাঁটাই হলেন কোচ ব্রেন্ডন রজার্স। তখনই লিভারপুল শহরে এলেন ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ ইয়ুর্গেন ক্লোপ।
তিনি এসেই লিভারপুলের ত্রাতা। বলতে গেলে খাদের কিনারা থেকে ক্লাবটিকে টেনে তুললেন। উপহার দিলেন একের পর এক শিরোপা। সুদিন ফিরল অ্যানফিল্ডে।
২০১৯ সালে মাদ্রিদ ফাইনালে টটেনহামকে হারিয়ে ২০০৫ সালের পর প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয় করে লিভারপুল, যা অল রেডদের ষষ্ঠ ইউরোপিয়ান মুকুট। পরের বছর অ্যানফিল্ডে আবারো শিরোপা উৎসব। ৩০ বছর পর ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগের শিরোপা যায় অ্যানফিল্ডে। ২০২১-২২ মৌসুমে ঘরোয়া ‘ডাবল’ জয় করে লিভারপুল। ২০২২ সালে শেষ দিনের নাটকীয়তায় ম্যানসিটির কাছে শিরোপা হারায় অল রেডরা। কিছুদিন পর প্যারিসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হেরে যায় ইংলিশ জায়ান্টরা। তবু শ্রেষ্ঠত্বের কাছাকাছিই থাকে তারা।
অ্যানফিল্ডে আবার শোক নেমেছে। চলে যাবেন জার্মান জাদুকর ক্লোপ। গত ৮ বছরে অ্যানফিল্ডে অসংখ্যবার উৎসবের উপলক্ষ নিয়ে আসা এ কোচ চলতি মৌসুম শেষে বিদায় নেবেন।
চলতি মৌসুমই লিভারপুলের কোচ হিসেবে তার শেষ মিশন। ইউরোপিয়ান ফুটবলের এ খ্যাতিমান কোচ শুক্রবার অবসরের বিদায়ে বলেছেন, নিজের কাছে লিভারপুল ছাড়ার সিদ্ধান্তটি ‘সঠিক’ মনে হয়েছে এবং এ নিয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র ‘আক্ষেপ’ নেই।
বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে দুটি বুন্দেসলিগা শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে নিয়ে যান ক্লোপ। ২০১৫ সালের অক্টোবরে লিভারপুলের কোচ হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এ ক্যারিশম্যাটিক কোচকে স্বাগত জানায় অল রেড সমর্থকরা। এরপর মাঝের আট বছরে তিনি ক্লাবটিতে ইতিহাস গড়েন। এবার যাওয়ার সময় হলো। তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। যদিও চুক্তি শেষ হওয়ার দুই বছর আগেই অল রেডদের বিদায় বলে দেবেন তিনি।
৫৬ বছর বয়সী ক্লোপ লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণায় বলেন, ‘আমি নভেম্বরেই ক্লাবকে বলে দিয়েছি। জানি, অনেক মানুষ প্রথমবার এটি শুনে অবাক হবেন। কিন্তু আমাকেও তো ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ ক্লাবটির সবকিছুই আমি ভালোবাসি। এ শহর আর এ ক্লাবের সমর্থকদেরও আমি ভালোবাসি, আর এ টিমটাকে। আমি সবকিছুই ভালোবাসি। এর পরও আমাকে সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছে। কারণ আমি ক্রমেই শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।’
জার্মান কোচ দায়িত্ব নেয়ার পর প্রতিটি বড় শিরোপাই জিতেছে লিভারপুল। তিনি অ্যানফিল্ডের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনেন। লিভারপুলের একমাত্র কোচ হিসেবে প্রিমিয়ার লিগ, ইউরোপিয়ান কাপ/চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, এফএ কাপ ও লিগ কাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেন ক্লোপ।
তার দল চলতি মৌসুমে চারটি শিরোপার রেসেই আছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ২১ রাউন্ড শেষে তারা ৪৮ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষস্থানে রয়েছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটি ৪৩ পয়েন্ট নিয়ে তাদের পরেই। গতবার পঞ্চম হওয়া এ মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলতে পারেনি অল রেডরা। ক্লোপের দলটি ইউরোপের দ্বিতীয় সেরা প্রতিযোগিতা ইউরোপা লিগের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে। ২৮ জানুয়ারি তারা এফএ কাপের চতুর্থ রাউন্ডে মুখোমুখি হবে নরউইচ সিটির। আর ২৫ ফেব্রুয়ারি ইংলিশ লিগ কাপের ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ চেলসি।
বিদায়ের ঘোষণা নিয়ে ক্লোপ বলেন, ‘এ কাজটি আমি ২৪ বছর ধরে করে আসছি। একই কাজ বছরের পর বছর ধরে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের মধ্যে যা কিছু ছিল সবই বিনিয়োগ করেছি। আমি উপলব্ধি করছি আমার মেধা আর দক্ষতা অফুরন্ত নয়। তাই এ মৌসুম শেষে আমি ব্যাগ গুছিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এরপর কিছুদিন বিরতি দিয়ে ভাবব পরবর্তী সময়ে কী করা যায়। আমরা আর সেই তরুণ খরগোশটি নই যে ইচ্ছেখুশি যতটা উঁচুতে পারা যায় লাফ দেবে।’
জার্মান এ ট্যাকটিশিয়ান আরো বলেন, ‘আমি এখনো মনে করি, এটা সঠিক সিদ্ধান্ত। এটিকে হালকাভাবে নিচ্ছি না। আমি সিদ্ধান্তটি সঠিক বলেই মনে করছি। আমার কোনো অনুশোচনাও নেই। তবে এখানে আমার অনেক মধুর স্মৃতি পড়ে থাকবে। আর সমর্থকদের এতটা ভালোবাসা পেয়েছি, তাই তাদেরও সত্যটা জানার অধিকার আছে।’