সেই কিশোর সেই টুর্নামেন্ট থেকে ফিরে গিয়েছিল কিংবদন্তি হয়ে। ফুটবলের ইতিহাসে বারবার এমনই হয়েছে। বিশ্বকাপের বিশাল মঞ্চে হঠাৎ এক তরুণের আবির্ভাব, আর গোটা দুনিয়া চমকে উঠে বলেছে, ‘এ ছেলে কোথা থেকে এল?’
আগামী জুনে আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকোর মাটিতে যখন বিশ্বের ৪৮টি দেশ একটি ট্রফির জন্য লড়বে, তখন ফুটবলের দুই মহাকাব্যের নায়ক তাদের শেষ পর্বে পৌঁছাবেন। মেসি—যার পায়ে বল যেন নদীর জল, বাধা পেলে পথ বদলায়, কিন্তু থামে না। রোনালদো যেন নিজেই এক অনমনীয় ঢেউ। এ দুজন মিলে গত দুই দশক ধরে ফুটবলকে এমন একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে সে উচ্চতা থেকে নামার কথা ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে আসে। কিন্তু সূর্যও অস্ত যায়, সবচেয়ে দীর্ঘ সন্ধ্যাটাও একসময় রাত হয়। যুগান্তরের এ অমোঘ নিয়মে আজ ক্লান্ত দুই মহানায়ক; মাঠের ঘাসে আজন্মের পদচিহ্ন আর কোটি চোখের মায়া ফেলে রেখে তাদেরও ফিরে যেতে হচ্ছে গোধূলির ওপারে।
কিন্তু ফুটবল কখনো শূন্যতা সহ্য করে না। তাই এ শেষ অধ্যায়ের ঠিক পাশেই, অদৃশ্যভাবে খুলে যাবে আরেকটি দরজা। যেখানে নতুন কোনো কিশোর, নতুন কোনো স্বপ্ন, নতুন কোনো নাম ধীরে ধীরে আলোয় উঠে এসে লিখে ফেলবে পরবর্তী দিনের ইতিহাস। নতুন কোনো নাম ঠোঁটে ঠোঁটে ঘুরবে। কোনো কিশোরের পায়ের জাদুতে স্তব্ধ হয়ে যাবে লক্ষ দর্শক। কারা হতে পারে সেই তরুণ? কাদের নাম এ গ্রীষ্মে হয়তো চিরকালের জন্য লেখা হয়ে যাবে ফুটবলের খাতায়?
লামিনে ইয়ামাল
বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে ১৯ জুলাই। লামিনে ইয়ামালের জন্মদিন ১৩ জুলাই। মানে ফাইনালের মাত্র ছয়দিন আগে এই স্প্যানিশ তারকা হবেন উনিশ বছরের। এখনই তিনি বার্সেলোনা ও স্পেনের আক্রমণের প্রাণ। ডানদিক থেকে বল নিয়ে যখন তিনি এগোতে শুরু করেন, বিপক্ষের ফুলব্যাক কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন। গতি আছে, দুই পায়ে দক্ষতা আছে, আছে সেই অদ্ভুত শান্ত মাথা, যা সাধারণত আসে অনেক বছরের অভিজ্ঞতায়। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপের সেরা ফুলব্যাকদের আতঙ্ক হয়ে ওঠা এ উইঙ্গার এমনভাবে খেলেন, যেন বহু বিশ্বকাপ খেলে ফেলা অভিজ্ঞ ফুটবলার। যদি স্পেন এগোয়, ইয়ামাল হতে পারেন সে টুর্নামেন্টের মুখ। ইউরো ২০২৪ জিতেছেন। এবার চোখ বিশ্বকাপে। ইতিহাস বলছে, ইউরো ও বিশ্বকাপ—দুটোই কুড়ি বছরের আগে জেতার কীর্তি এখনো কেউ করতে পারেনি। ইয়ামাল কি পারবেন?
এস্তেভাও
সাম্প্রতিক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে যেন কান্নার ইতিহাস আছে। জিনগা হারিয়ে গেছে, গোল শুকিয়ে গেছে, প্রতি বিশ্বকাপেই হতাশার মেঘ। মারাকানাজোর ক্ষত শুকায়নি, মিনেইরাজোর অপমান ভোলেনি, পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের দেশ প্রতিটি টুর্নামেন্টে নামে স্বপ্ন নিয়ে, ফেরে নীরবতা নিয়ে। কিন্তু এস্তেভাও উইলিয়ানকে দেখলে ফিরতে পারে লাতিন ফুটবলের সেই পুরনো আনন্দ। মাত্র আঠারো বছর বয়সে চেলসিতে এসে তিনি থমকে যাননি। চেলসির হয়ে ৩৬ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ৮টি আর ব্রাজিলের হয়ে ১১ ম্যাচে ৫। ‘মেসিনহো’ ডাকনামটা এমনি এমনি পাননি। তার খেলায় সেই নিচু হয়ে দৌড়ানো, বল আঁকড়ে ধরা, প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর যে শিল্প, সেটা দেখলে বুক ভরে যায়। ব্রাজিল যদি এবার কিছু করতে পারে, তার পেছনে এস্তেভাওর হাত থাকবেই। তবে কিছুদিন আগে ইনজুরিতে আক্রান্ত হওয়ায় তার বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে সংশয় আছে।
ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো ও নিকো পায়েজ
মেসি যদি এবার মাঠে নামেন, হয়তো এটাই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এরপর কে? রিয়াল মাদ্রিদের আঠারো বছরের এই আর্জেন্টাইন তরুণ সে প্রশ্নের উত্তর হতে পারেন। মৌসুমের শুরুতে ইনজুরি ছিল, তবু মাদ্রিদের হয়ে বেশকিছু ম্যাচ খেলেছেন। লা লিগায় গোলও করেছেন একটি। তার খেলায় এক ধরনের দুঃসাহস আছে। বড় মাঠে, বড় চাপে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয় নেই যেন। মেসির মতো নন তিনি, কিন্তু মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার জন্য যা দরকার, সেটা হয়তো তিনিই।
বিশ্বকাপে মহাতারকা হয়ে উঠতে পারেন আরো এক আর্জেন্টাইন—নিকো পায়েজ। আর্জেন্টাইন এই উনিশ বছর বয়সী কোমোতে খেলছেন রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ধার নিয়ে। সিরি এ-তে ড্রিবলিংয়ে দক্ষতা দেখিয়ে নজর কেড়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনার নকআউট রাউন্ডে যখন ঘন রক্ষণ ভাঙার দরকার হবে, নিকো পায়েজ হতে পারেন সেই চাবিকাঠি।
লেনার্ট কার্ল
বয়স প্রায় সতেরো। অথচ বায়ার্ন মিউনিখের মতো দলে খেলছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে যেভাবে মাঠ পড়েছেন, বুদ্ধি দিয়ে জায়গা তৈরি করেছেন সেটা দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যে ছেলেটি এখনো কৈশোরে আছে। ৩৬ ম্যাচে ৯ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করেছেন এ মিডফিল্ডার। জার্মানির কোচ নাগেলসমান তাকে এখনো সিনিয়র দলে ডাকেননি, কিন্তু যে ফর্মে আছেন কার্ল, সেটা বেশিদিন উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না। এ বিশ্বকাপ যদি জার্মানির হয়, লেনার্ট কার্লের নামটা সেই গল্পে থাকতেও পারে।
কেন্দ্রি পায়েজ
মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গোল। কনমেবল বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে। এ তথ্যই বলে দেয় কেন্দ্রি পায়েজ কতটা অসাধারণ। চেলসির হয়ে চুক্তিবদ্ধ এ একুয়েডোরিয়ান প্লেমেকার এখন আর্জেন্টিনার রিভারপ্লেটে ধারে খেলছেন। ছোট গড়ন, কিন্তু বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অবিশ্বাস্য। মাঠের মাঝখান থেকে খেলা বানান, ভাঙেন, আবার নতুন করে সাজান।
ইব্রাহিম এমবায়ে
সেনেগালের সাদিও মানে পঁয়ত্রিশে পা দিচ্ছেন শিগগিরই। তার উত্তরাধিকার কার হাতে যাবে? এমবায়ের নামটাই সামনে আসে সবার আগে। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) তরুণ উইঙ্গার আফকনে এরই মধ্যে গোল করেছেন এ শতকের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে। ওয়ান টু ওয়ানে মুখোমুখি লড়াইয়ে তাকে সামলানো কঠিন।
ইয়ান দিওমান্দে
লিপজিগে মাত্র ২৯ ম্যাচে ১২টি গোল এবং ৭টি অ্যাসিস্ট। ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। বুন্দেসলিগায় সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবলিং এ উনিশ বছর বয়সী আইভোরিয়ানের। আইভরি কোস্ট বারো বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে। এ ফেরাটাকে উৎসবে পরিণত করতে হলে দিওমান্দেকে দরকার হবে।
গিলবার্তো মোরা
মেক্সিকো এবার নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলবে। সে চাপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সাহস কি তাদের আছে? গিলবার্তো মোরা যদি ফিট থাকেন, উত্তরটা হয়তো হ্যাঁ। মাত্র পনেরো বছরে পেশাদার অভিষেক। গোল্ড কাপ জয়ের সময় দলের কনিষ্ঠতম সদস্য। মাঠের মাঝখান থেকে খেলা বোনার যে ক্ষমতা তার আছে, সেটা মেক্সিকো সমর্থকদের আশা জাগায়।
ম্যাক্স ডাওম্যান
প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ড, মাত্র ষোলো বছর তিয়াত্তর দিনে। আর্সেনালের এ কিশোর মাঠে নামেন যেন তার কাছে সময়ের কোনো ধৈর্য নেই, বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার কোনো ইচ্ছে নেই। ইংল্যান্ডের কোচ টুখেল মার্চে তাকে ডাকেননি, কিন্তু উড়িয়েও দেননি। বলেছেন, দরজা বন্ধ নয়। প্রিমিয়ার লিগের শেষ কয়েক ম্যাচে যদি এ কিশোর আরো কিছু করে দেখান, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ দলে হয়তো সবচেয়ে অবাক করা নামটি হবে তারই।
এ নামগুলো এখন হয়তো অনেকেরই চেনা নয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপ শেষ হলে পৃথিবী তাদের কাউকে কাউকে চিনবে গভীরভাবে, আবেগ দিয়ে। পেলে সুইডেন থেকে ফিরেছিলেন কিংবদন্তি হয়ে। মেসি জার্মানি থেকে ফিরেছিলেন প্রতিশ্রুতি নিয়ে। যে প্রতিশ্রুতি পরে কাতারে পূর্ণ হয়েছে। এমবাপ্পে রাশিয়া থেকে ফিরেছিলেন ইতিহাস লিখে। এবারের গ্রীষ্মে কে ফিরবে তারকা হয়ে? উত্তরটা মাঠেই মিলবে। জুনের রোদ্দুরে, আমেরিকার ঘাসে, কোনো এক কিশোরের পায়ের ছোঁয়ায়।