গুরু-শিষ্যের কৌশলের লড়াই

কোচিংয়ের পাঠশালায় একসময় লুইস দে লা ফুয়েন্তের সামনে বসে কৌশলের পাঠ নিয়েছিলেন লিওনেল স্কালোনি।

আজ নিউইয়র্কে সেই শিক্ষক ও ছাত্র মুখোমুখি হচ্ছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের লড়াইয়ে। তবে এ দ্বৈরথ স্মৃতি বা সম্পর্কের নয়, প্রতিপক্ষের শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশলের। স্কালোনির প্রধান চিন্তা স্পেনের দুই প্রান্তের গতি, বিশেষ করে লামেন ইয়ামালের ড্রিবল ও পেদ্রো পোরোর ভেতরমুখী দৌড়। অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তে চাইবেন মাঝমাঠে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, বল হারানোর পর দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং লিওনেল মেসির কাছে পাস পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে উৎসেই থামিয়ে দিতে।

আর্জেন্টিনা সাধারণত ৪-৪-২ ছকে মাঠে নামলেও ফাইনালে কাঠামোর ভেতরে কিছু বদল আসতে পারে। সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি হতে পারে রাইট ব্যাকে। নাহুয়েল মোলিনার বদলে গনজালো মন্তিয়েলকে শুরু করানোর কথা ভাবছেন স্কালোনি। স্পেনের বাঁ দিকের আক্রমণ সামলানোর পাশাপাশি রক্ষণে বাড়তি নিরাপত্তা দিতেই এ পরিবর্তন বিবেচনায় রয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার বড় পরীক্ষা হবে বিপরীত প্রান্তে, যেখানে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে সামলাতে হবে লামেন ইয়ামাল ও পেদ্রো পোরোর যুগল চাপ।

স্পেনের ডান প্রান্তের কাঠামো কেবল ইয়ামালের ব্যক্তিগত ড্রিবলনির্ভর নয়। ইয়ামাল টাচলাইনের কাছাকাছি থেকে মাঠের প্রস্থ ধরে রাখেন, আর সেই সুযোগে পোরো ভেতরের চ্যানেলে দৌড় দেন। এতে প্রতিপক্ষের লেফট ব্যাককে একই সঙ্গে দুই ধরনের হুমকি সামলাতে হয়। এ কারণেই তাগলিয়াফিকোর সামনে জিউলিয়ানো সিমিওনে কিংবা নিকো গনজালেসের মতো পরিশ্রমী খেলোয়াড় রাখার কথা ভাবছে আর্জেন্টিনা। তাদের দায়িত্ব হবে ইয়ামালকে দ্বৈত চাপে রাখা এবং পোরোর আন্ডারল্যাপের পথ বন্ধ করা।

আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠে এনজো ফার্নান্দেস ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের জায়গা প্রায় নিশ্চিত। লিয়ান্দ্রো পারেদেসও শুরু করতে পারেন, তবে চতুর্থ মিডফিল্ডার নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু করা জিউলিয়ানো সিমিওনেকে রাখা হবে, নাকি বদলি নেমে ভালো খেলা রদ্রিগো দি পল ফিরবেন—এ সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়। আরেকটি বিকল্প হিসেবে পারেদেসকে বাদ দিয়ে দুই পাশে সিমিওনে ও নিকো গনজালেসকে খেলানোর কথা ভাবছেন স্কালোনি। এতে আর্জেন্টিনা বল ছাড়া ৪-৪-২ কিংবা ৪-৫-১ ধরনের জমাট কাঠামো তৈরি করতে পারবে।

স্পেনও তাদের পরিচিত পজিশননির্ভর ফুটবল থেকে সরে আসছে না। কাগজে ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ দেখা গেলেও বল দখলে দলটি ৩-১-২-৪ আকৃতি নেয়। রদ্রি একক পিভট হিসেবে নিচে থাকেন, ফাবিয়ান রুইস ও দানি ওলমো হাফস্পেসে উঠে পাসিং ত্রিভুজ তৈরি করেন। বাঁ দিকের উইঙ্গার ভেতরে ঢুকলে মার্ক কুকুরেয়া ওপরে ওঠেন, আর ডান দিকে ইয়ামাল প্রস্থ ধরে রাখেন।

স্পেনের প্রধান লক্ষ্য থাকবে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধে ঠেলে রাখা। দীর্ঘ সময় বল দখলে রেখে স্কালোনির দলকে নিচু ব্লকে নামাতে পারলে পাল্টা আক্রমণে মেসিদের সামনে জায়গা কমে যাবে। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে স্পেন দ্রুত কাউন্টার-প্রেস করবে, যাতে এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার বা পারেদেস প্রথম ফরওয়ার্ড পাসটি দিতে না পারেন। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে মেসিকে সরাসরি ম্যান-মার্ক না করেও তাকে খেলা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করবে স্পেন।

মেসি সাধারণত ডান হাফস্পেস ও মাঝামাঝি এলাকায় নেমে বল নেন। সেই জায়গা রক্ষার মূল দায়িত্ব থাকবে রদ্রির ওপর। তিনি মেসিকে অনুসরণ না করে তার সামনে অবস্থান নিয়ে পাসের কোণ বন্ধ করবেন। পাশে ফাবিয়ান রুইস কিংবা ওলমো চাপ সৃষ্টি করলে মেসির বল গ্রহণের সময় ও জায়গা দুটোই কমে আসবে। তবে রদ্রি বেশি ওপরে উঠলে তার পেছনে তৈরি হওয়া জায়গা কাজে লাগাতে পারেন মেসি ও হুলিয়ান আলভারেস।

স্পেনের আক্রমণে মিকেল ওয়ারজাবালের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু সেন্টার ফরওয়ার্ড হিসেবে না থেকে নিচে নেমে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো বা লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে অবস্থান থেকে বের করে আনার চেষ্টা করবেন। ওয়ারজাবাল নিচে নামলে তার ফাঁকা জায়গায় ইয়ামাল, ওলমো কিংবা বিপরীত প্রান্তের উইঙ্গার ঢুকে পড়তে পারেন। এ কারণে আর্জেন্টিনার দুই সেন্টারব্যাককে খুব সতর্ক থাকতে হবে।

ফাইনালের মূল লড়াই তাই শুধু মেসি ও ইয়ামালের ব্যক্তিগত দ্বৈরথে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মাঝমাঠে রদ্রি-ফাবিয়ানদের বিপক্ষে এনজো-ম্যাক অ্যালিস্টারদের প্রতিরোধ, দুই প্রান্তে ফুলব্যাকদের সুরক্ষা এবং বল হারানোর পর প্রতিক্রিয়াই ম্যাচের গতিপথ ঠিক করতে পারে।

আরও