গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ আজ শুরু

আজতেকার পৌরাণিক মঞ্চে পর্দা উঠছে বিশ্বকাপের

চার বছর পর আবারো থমকে দাঁড়াবে পৃথিবী। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বিভাজন, সীমান্ত উত্তেজনা, অভিবাসন সংকট কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে পৃথিবীর শতকোটি মানুষ একসঙ্গে চোখ রাখবে টিভির পর্দায়।

আজ রাতে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এ আসরকে বলেছেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো দ্য প্ল্যানেট হ্যাজ এভার সিন’। সে দাবির সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব অবশ্য ইতিহাসের। তবে সংখ্যাই বলে দেয়, এবারের বিশ্বকাপ আগের যেকোনো আসরের চেয়ে বড়। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। খেলোয়াড় ১ হাজার ২৪৮ জন। ম্যাচ ১০৪টি। আয়োজক দেশ তিনটি—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ১৬টি শহর, চারটি সময় অঞ্চল এবং ছয় সপ্তাহব্যাপী বিস্তৃত এ মহাযজ্ঞের সূচনা হচ্ছে আজ।

আফ্রিকা থেকে রেকর্ড ১০টি দল অংশ নিচ্ছে। আরব বিশ্বের প্রতিনিধিও রেকর্ড আটটি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলবে উজবেকিস্তান, জর্ডান, কেপ ভার্দে ও কুরাসাও। এক অর্থে আজ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং ফুটবলের ভৌগোলিক বিস্তারের নতুন যুগের সূচনা।

এ নতুন যুগের প্রথম দৃশ্যের মঞ্চ মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম, যা আজতেকা স্টেডিয়াম নামে বহুল পরিচিত। নামের মধ্যেই বহন করছে মেসো-আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী সভ্যতা আজতেকদের উত্তরাধিকার। শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে যে উপত্যকায় বীরত্বের কাহিনী রচিত হয়েছিল, সেই ভূখণ্ডেই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ফুটবলের এ তীর্থভূমি। এ মাঠে ফুটবল ইতিহাসের বহু অমর মুহূর্ত জন্ম নিয়েছে। এখানেই ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন পেলে। সেই ‘বিউটিফুল টিম’ আজতেকার সবুজ ঘাসেই কিংবদন্তির মর্যাদা অর্জন করে। এখানেই ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা করেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের নিন্দিত-নন্দিত ‘হ্যান্ড অব গড’। এ মাঠে তিনি লিখেছিলেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ মহাকাব্য। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৬০ মিটার দৌড়ে, পাঁচজনকে কাটিয়ে, মাত্র ১১ সেকেন্ডে। যে ১১ সেকেন্ড আজও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের বুকে জলজ্যান্ত। এ মাঠই শুনেছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বধির করে দেয়া গর্জন। এখান থেকেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ‘মেক্সিকান ওয়েভ’। সে স্টেডিয়ামই ইতিহাসের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করতে যাচ্ছে। যেন ফুটবলের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলছে একই বৃত্তে।

আজ দিবাগত রাত ১টায় উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু ম্যাচের আগে বিশ্বের চোখ থাকবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিকে। মেক্সিকো সিটির অনুষ্ঠানটি শুধু সংগীতানুষ্ঠান নয়; এটি দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রদর্শনী। রঙিন ‘পাপেল পিকাদো’, আদিবাসী ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং আধুনিক শিল্পকলার সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে আয়োজন। মঞ্চে থাকবেন শাকিরা, বার্না বয়, জে বালভিন, টাইলা, আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশান, লিলা ডাউনস, লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলেস ও মানা। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘দাই দাই’ পরিবেশন করবেন শাকিরা ও বার্না বয়। সংগীত, আলো, নৃত্য এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে আয়োজকরা বলতে চায়—ভাষা, জাতি ও সীমান্তের ভিন্নতা সত্ত্বেও কেবল ফুটবলই মানুষকে একত্র করে। তবে এটিই একমাত্র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নয়। প্রথমবারের মতো তিনটি স্বাগতিক দেশই নিজেদের আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। মেক্সিকোর পর আগামীকাল কানাডার টরন্টো এবং যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসেও অনুষ্ঠিত হবে পৃথক অনুষ্ঠান।

তবে বিশ্বকাপের গল্প কখনই শুধু আনন্দের নয়। এর সঙ্গে থাকে বিতর্ক, রাজনীতি ও অর্থনীতির গল্পও। এবারের সবচেয়ে বড় বিতর্ক টিকিটের মূল্য। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার। ২০২৬ সালে সেই মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ডলারে। এ বিপুল মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক সমর্থক মনে করছেন, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ভূরাজনীতির ছায়া আরো দীর্ঘ হয়েছে ইরানের বিষয়টি নিয়ে। পেন্টাগন-তেহরানের হামলা-পাল্টাহামলার মধ্যে ইরানের জাতীয় দল খেলতে যাচ্ছে আমেরিকার মাটিতে। ইরানের ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, তাদের টিকিট বরাদ্দ প্রত্যাহার করা হয়েছে, ১৫ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ভিসা দেয়া হয়নি। দলটি তাদের বেস ক্যাম্প মেক্সিকোর তিহুয়ানায় সরিয়ে নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মাঠে নামবেন, কিন্তু তাদের পরিবার, তাদের দেশের সমর্থকরা গ্যালারিতে থাকতে পারবেন না। সোমালিয়ার রেফারি ওমার আরতান মিয়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্কটল্যান্ডের একদল সমর্থকের প্রবেশানুমতি শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এ বিশ্বকাপ হয়ে উঠতে পারে বর্জন ও ভয়ের প্রতীক।

মেক্সিকোতেও উদ্বোধনের আগে পরিস্থিতি পুরো শান্ত নয়। শিক্ষক ইউনিয়নের আন্দোলন, বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধের হুমকি কর্তৃপক্ষকে বাড়তি সতর্ক থাকতে বাধ্য করেছে। উদ্বোধনী ম্যাচকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আয়োজকরা বলছেন, অনুষ্ঠান ও ম্যাচ পরিকল্পনা অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে।

তবু এসব জটিলতার মাঝেও মাঠের ভেতরে যে গল্প লেখা হবে সেটি হয়তো সবকিছু ছাপিয়ে যাবে। লিওনেল মেসি ৩৮ বছর বয়সে মাঠে নামবেন। ২০২২ সালে কাতারে তিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছেন। ইতিহাস কি দ্বিতীয়বার তার দিকে মুখ ফেরাবে? আছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সে তিনি পর্তুগালের জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন। পুরো ক্যারিয়ারে একটিই অপূর্ণতা—বিশ্বকাপ ট্রফি। পর্তুগাল এবার আরো শক্তিশালী। রোনালদো জানেন, এটিই শেষ সুযোগ। একটি মানুষের স্বপ্ন, একটি জাতির প্রত্যাশা, একটি ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত অধ্যায়—এ তিন সমান্তরাল রেখা ২০২৬ বিশ্বকাপে মিলিত হচ্ছে।

ফুটবল সবসময় নতুন নায়কেরও জন্ম দেয়। রোনালদো-মেসি বিদায়লগ্নে কিলিয়ান এমবাপ্পে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। জুড বেলিংহ্যাম, লামিনে ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, এন্ড্রিক, জুলিয়ান আলভারেজ—তারা সবাই এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলকে নেতৃত্ব দেবে।

এবারের বিশ্বকাপের আরেকটি বড় চরিত্র প্রযুক্তি। একসময় ফুটবল ছিল রেফারির চোখের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল খেলা। এখন প্রযুক্তি মাঠের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত অফসাইড প্রযুক্তি, স্মার্ট বল, রিয়েল টাইম ডেটা বিশ্লেষণ, ত্রিমাত্রিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা—সবকিছুই খেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দর্শক যেমন মাঠে ২২ জন খেলোয়াড়কে দেখছেন, তেমনি অদৃশ্যভাবে খেলা পর্যবেক্ষণ করবে শত শত সেন্সর ও অ্যালগরিদম।

আজ যখন আজতেকা স্টেডিয়ামের আলো জ্বলে উঠবে, তখন শুধু মেক্সিকো নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তে জেগে উঠবে অগণিত স্মৃতি। কেউ মনে করবেন পেলের ব্রাজিলকে, কেউ ম্যারাডোনার জাদু, কেউ জিদানের ফ্রান্স, কেউ ইনিয়েস্তার স্পেন। বিশ্বকাপের আয়নায় প্রতিটি প্রজন্ম ফিরে পায় তার ফেলে আসা দিনের নস্টালজিয়া। ছয় সপ্তাহ পর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নতুন এক চ্যাম্পিয়ন ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে। এখনো কেউ জানে না কোন দল ইতিহাস সৃষ্টি করবে, কোন তারকা জন্ম নেবে, কোন ম্যাচ কিংবদন্তি হয়ে থাকবে, কিংবা কোন গোল আগামী কয়েক দশক ধরে স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। এ অনিশ্চয়তাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

১৯৩০ থেকে ২০২৬—৯৬ বছরের পথচলায় বিশ্বকাপ অনেক কিছু পেরিয়ে এসেছে। যুদ্ধ দেখেছে, বয়কট দেখেছে, কেলেঙ্কারি দেখেছে, অলৌকিক জয় দেখেছে, হৃদয়ভাঙা পরাজয় দেখেছে। কিন্তু প্রতিবার, প্রতিটি বিতর্কের পরও যখন রেফারির বাঁশি বাজে এবং বল মাঠে গড়ায়—পৃথিবী থেমে যায়।

আজ মেক্সিকো সিটিতে বেজে উঠবে সেই প্রতীক্ষিত বাঁশি। আজতেকা স্টেডিয়ামের আকাশে মিশে যাবে ৮৩ হাজার মানুষের সম্মিলিত নিশ্বাস, উল্লাস আর প্রত্যাশা। ঢাকা থেকে দুবাই, লাগোস থেকে লন্ডন, বুয়েন্স আয়ার্স থেকে বেইজিং—পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই আবেগের অংশীদার হবে। আজতেকার আকাশে শাকিরার গলায় যখন ভেসে উঠবে সেই পরিচিত সুর, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, ঢাকার কোনো চায়ের দোকানে, লাগোসের কোনো রাস্তার মোড়ে, বুয়েন্স আয়ার্সের কোনো পাড়ায় কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকবে। পৃথিবীর ভূগোলে তারা সবাই আলাদা কিন্তু ফুটবলের সুতোয় অবিচ্ছিন্ন। এটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে অলৌকিক ক্ষমতা। একটি মাঠে খেলা হয়, কিন্তু অনুভব করা হয় পৃথিবীর প্রতিটি কোণে। ৯০ মিনিটের খেলা, স্মৃতি হয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এটাই বিশ্বকাপ। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। একসময় যে ভূমিতে আজতেক সভ্যতা তাদের মিথ, বিশ্বাস ও সাম্রাজ্যের গল্প লিখেছিল, আজ সেই ভূমিতেই জড়ো হচ্ছে আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উপাখ্যান। ইতিহাসের স্তর পেরিয়ে, কিংবদন্তির উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে সেই পৌরাণিক মঞ্চেই আজ পর্দা উঠছে বিশ্বকাপ মহোৎসবের।

আরও