বিশ্বকাপ ফাইনাল আজ

আর্জেন্টিনার চতুর্থ নাকি স্পেনের দ্বিতীয়

নিউ জার্সির আকাশ গতকালও ছিল অস্থির। কখনো ঘন কালো মেঘ, কখনো বজ্রপাত, কখনো প্রবল বৃষ্টি। ফাইনালের আগের শেষ প্রস্তুতিতেও তাই প্রকৃতি হস্তক্ষেপ করেছে নিজের মতো করে।

বজ্রঝড়ের কারণে স্পেনের মাঠের অনুশীলন বাতিল করতে হয়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে কানাডার দাবানল থেকে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া, নিউইয়র্ক নিউ জার্সি অঞ্চলের বায়ুমানের উদ্বেগ এবং গরম-আর্দ্র আবহাওয়ার সম্ভাবনা। এ পরিস্থিতিতে আজ রাত ১টায় নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপসেরা স্পেন। আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালিপনার মধ্যেও আজ ঝলমল করবে একটি সোনালি ট্রফি। সেই ট্রফির জাদুকরী স্পর্শে আর্জেন্টিনা কি আজ তাদের জার্সিতে খোদাই করবে পরম গৌরবের চতুর্থ নক্ষত্র, নাকি দীর্ঘ ষোলো বছরের একাকিত্ব ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের উল্লাসে মাতবে স্প্যানিশরা? ফুটবল বিশ্বের সব আলো এখন সেই প্রশ্নে এসে থেমেছে।

চার বছর আগে কাতারে বিশ্বজয়ের পর আর্জেন্টিনার আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনাও অনেকের কাছে দূরবর্তী কল্পনা ছিল। গত বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির বয়স ছিল ৩৫। মনে হয়েছিল, ফুটবলের সর্বোচ্চ পুরস্কারটি হাতে নিয়ে তার অসমাপ্ত গল্প পূর্ণ হয়েছে, এখানেই হয়তো বিশ্বকাপের সঙ্গে তার সম্পর্কের সুন্দর সমাপ্তি। কিন্তু সময়ের নিজস্ব ব্যাকরণ আছে, আর মেসির ক্ষেত্রে সেটি যেন বারবার ব্যর্থ হয়ে যায়। এখন তার বয়স ৩৯। গতি আগের মতো নেই, কিন্তু খেলাটিকে কয়েক সেকেন্ড আগে পড়ে ফেলার ক্ষমতা এখনো অটুট। তার শরীর ধীর হয়েছে, অথচ মস্তিষ্ক যেন আরো দ্রুত। এ বিশ্বকাপে তিনি আবার গোল করেছেন, গোল করিয়েছেন, মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের ভাষা বদলে দিয়েছেন। আজকের ফাইনাল তার বিশ্বকাপ জীবনের শেষ ম্যাচ হতে পারে। কিন্তু আর্জেন্টিনা চায়, সেটি যেন বিদায়ের অনুষ্ঠান না হয়ে, হয়ে ওঠে আরেকটি রাজ্যাভিষেকের রাত।

স্কালোনির দল এবারের বিশ্বকাপে ফাইনালে এসেছে নানা বাঁক পেরিয়ে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয়, মিসরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন লড়াই, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও শেষ ৫ মিনিটে ম্যাচ উল্টে দেয়া—প্রতিটি ধাপেই আর্জেন্টিনাকে নিজেদের শেষ সীমা পর্যন্ত যেতে হয়েছে। নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচেই ৯০ মিনিটের আগে তারা আরামদায়ক অবস্থায় ছিল না। কখনো অতিরিক্ত সময়, কখনো শেষ মুহূর্ত, কখনো মেসির পাস, কখনো এনজো ফার্নান্দেজের জাগরণ, কখনো লাউতারো মার্টিনেজের মুক্তির গোল—এ আর্জেন্টিনা যেন শেষ বাঁশির আগে পরাজয়কে সত্য বলে মানতেই রাজি নয়।

দলটির ২৬ জনের মধ্যে ১৭ জনই ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডের সদস্য। সেই অভিজ্ঞতা তাদের ভেতরে এক ধরনের গভীর বিশ্বাস তৈরি করেছে। পরিস্থিতি যত কঠিন হোক, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেষ কথা বলা যায় না। আর্জেন্টিনার ফুটবল এবার সবসময় সুন্দর ছিল না, সবসময় নিয়ন্ত্রিতও ছিল না; কিন্তু প্রায় সবসময় জীবন্ত ছিল। তাদের খেলায় আছে শেষ মুহূর্তে উঠে দাঁড়ানোর এক দুর্বোধ্য শক্তি। যেন রকি বালবোয়া প্রতিটি রাউন্ডে আঘাত খেতে খেতে আবার মুঠি উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের এ দীর্ঘ অভিযানে আর্জেন্টিনা অনেকবার টলেছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি।

অন্যদিকে স্পেনের যাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে বিশৃঙ্খলা যেন কোনো ফুটবলীয় ঘটনা নয়, বরং দ্রুত সংশোধনযোগ্য ত্রুটি। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল চাপকে ভয় হিসেবে দেখে না; তারা চাপকে আগেই নির্ধারিত কোনো বৈঠকের মতো সামলায়। বল দখল, জায়গা নিয়ন্ত্রণ, ধারাবাহিক পাস, প্রতিপক্ষের দৌড়ের পথ বন্ধ করা এবং ধীরে ধীরে ম্যাচকে নিজেদের কাঠামোর মধ্যে বন্দি করা—এ স্পেন ফুটবলকে প্রায় যন্ত্রের নির্ভুলতায় নামিয়ে এনেছে।

তারা ৩৭ ম্যাচ ধরে অপরাজিত। আজ জিতলে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ডও নিজেদের করে নিতে পারে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উত্তর আমেরিকায় পা রাখার সময় থেকেই স্পেন ছিল অন্যতম ফেভারিট। এখন পর্যন্ত মাঠেও তারা সেই মর্যাদা ধরে রেখেছে। অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে নকআউট অভিযান শুরু, এরপর পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ব্যবধানে ছোট কিন্তু নিয়ন্ত্রণে বড় জয়। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারানোর ম্যাচে স্পেন দেখিয়েছে, তাদের ফুটবল কতটা শান্ত অথচ নির্মম হতে পারে। ফ্রান্সের তারকায় ভরা আক্রমণভাগকে তারা এমনভাবে দূরে রেখেছিল, যেন আলো ঝলমলে একটি ঘরে প্রতিপক্ষ আটকা পড়েছে, অথচ কোথাও বের হওয়ার দরজা নেই।

স্পেনের পাসিং ফুটবল প্রতিপক্ষকে কেবল ক্লান্ত করে না, বিভ্রান্তও করে। একের পর এক ছোট পাস, জায়গা বদল, ত্রিভুজ তৈরি এবং হঠাৎ গতির পরিবর্তনে তারা যেন প্রতিপক্ষকে এক ঘূর্ণায়মান নাগরদোলায় তুলে দেয়। রদ্রি সেই ব্যবস্থার কেন্দ্র। মৌসুমের বড় অংশ চোট কাটিয়ে ফেরার লড়াইয়ে পার করলেও বিশ্বকাপে তিনি আবার নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন। তার পাশে ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো স্পেনের মাঝমাঠকে ভারসাম্য, সৃজনশীলতা এবং গতি দিয়েছে। রক্ষণে পাউ কুবারসি, আয়মেরিক লাপোর্ত, পেদ্রো পোরো ও মার্ক কুকুরেয়া এতটাই স্থির যে গোলরক্ষক উনাই সিমোনকে অনেক ম্যাচেই বড় পরীক্ষায় পড়তে হয়নি।

এ যন্ত্রের মধ্যে অবশ্য একটি বুনো কল্পনাও আছে, যার নাম লামিনে ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সে এমন এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে, যেখানে বহু কিংবদন্তিও পৌঁছতে পারেননি। ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেকের পর থেকেই বয়সের সমস্ত সীমা ভেঙে চলেছেন তিনি। ডান প্রান্তে তার ড্রিবল, গতি বদল, সংকীর্ণ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা এবং আচমকা শট স্পেনের নিয়ন্ত্রিত খেলায় অনিশ্চয়তার প্রয়োজনীয় মাত্রা যোগ করেছে। আজ তার সামনে দাঁড়াবেন সেই লা মাসিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, যার সঙ্গে শিশুকালে তোলা একটি ছবি এখন প্রায় পৌরাণিক হয়ে উঠেছে।

তবে ফাইনালটি শুধু মেসি ও ইয়ামালের নয়। এটি দুটি বিপরীত ফুটবলীয় মানসিকতার সংঘর্ষ। স্পেন চাইবে ম্যাচকে পরিচ্ছন্ন, হিসাবি এবং নিয়ন্ত্রিত রাখতে। তারা এগিয়ে গেলে ইংল্যান্ড বা মিসরের মতো পেছনে বসে আর্জেন্টিনাকে আক্রমণের আমন্ত্রণ দেবে না। ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করার পরও স্পেন বল নিজেদের কাছে রেখেছিল, প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফেরার কোনো আবেগী সুযোগ দেয়নি। এটাই আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ স্কালোনির দল এবারের বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের ভয়, দ্বিধা ও পশ্চাদপসরণকে শাস্তি দিয়েছে। স্পেন যদি ভয় না পায়, ম্যাচের দখল না ছাড়ে, তাহলে আর্জেন্টিনার সেই শেষ মুহূর্তের জলোচ্ছ্বাস তৈরির জায়গা সংকুচিত হয়ে যাবে।

কিন্তু স্পেনের সব হিসাবের বাইরে একটি নাম থেকে যায়—মেসি। তাকে আটকানোর জন্য মার্ক কুকুরেয়াকে বড় দায়িত্ব নিতে হতে পারে। কুকুরেয়া পুরো বিশ্বকাপে এখনো একবারও ড্রিবলে পরাস্ত হননি। তবে এখনো তিনি মেসির মুখোমুখি হননি। স্কালোনি নিজের দলকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে মেসিকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দেয়া যায়। তিনি কোথায় নামছেন, ডানদিকে যাচ্ছেন নাকি মাঝখানে ঢুকছেন—তার ওপর নির্ভর করে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় বদলও বদলে যায়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ দিকে রদ্রিগো ডি পল ও গনজালো মন্তিয়েলকে এনে মেসির ডান পাশ শক্তিশালী করাই ছিল তার উদাহরণ।

আর্জেন্টিনার উদ্বেগ তাদের রক্ষণে। প্রথম দুই ম্যাচ ছাড়া তারা কোনো ম্যাচেই গোলশূন্য রাখতে পারেনি প্রতিপক্ষকে। ইয়ামালের গতি যেমন সমস্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি স্পেনের নিরন্তর জায়গা বদলও ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ কিংবা নিকোলাস ওটামেন্ডিদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। বিপরীতে স্পেনের জন্য উদ্বেগ হবে ম্যাচ যদি ভেঙে যায়। মাঠের মান খারাপ হলে তাদের পাসিং ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। তাপ, আর্দ্রতা, বায়ুমানের অবনতি কিংবা হঠাৎ বৃষ্টি ম্যাচকে খণ্ডিত করে তুললে সেটিই আর্জেন্টিনার পছন্দের আবহ—যেখানে ফুটবল কৌশল থেকে আবেগে, শৃঙ্খলা থেকে বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়।

আজ আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিল ও ইতালির পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বে। একই সঙ্গে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকার পর টানা চতুর্থ বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতবে তারা। স্পেন জিতলে ২০০৮ ইউরো ও ২০১০ বিশ্বকাপের পর আবার ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।

নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক বসবেন। বাইরে হয়তো ধোঁয়ার আবছায়া থাকবে, বাতাসে আর্দ্রতা, আকাশে অনিশ্চিত মেঘ। মাঠে থাকবে স্পেনের ঠাণ্ডা যন্ত্র আর আর্জেন্টিনার উত্তপ্ত হৃদয়। একদল ফুটবলকে শৃঙ্খলায় বেঁধে শিল্পে পরিণত করেছে, অন্য দল স্নায়ুচাপকে শক্তিতে এবং বিশৃঙ্খলাকে নাটকে রূপ দিতে শিখেছে।

সেই নাটকের কেন্দ্রে দাঁড়াবেন মেসি। হাতে হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপের ৯০ মিনিট, অথবা অতিরিক্ত আরো ৩০ মিনিট। এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে তিনি নিশ্চয়ই বিদায়ের কথা ভাবছেন না। তার সামনে একটি ট্রফি, একটি দেশের চতুর্থ তারার স্বপ্ন এবং নিজের মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠাটি সোনালি অক্ষরে লেখার সুযোগ। অন্য পাশে স্পেন, নতুন প্রজন্মের নির্ভুল দল, যারা বিশ্বাস করে ভবিষ্যৎ এরই মধ্যে তাদের।

ফয়সালা হবে শেষবারের মতো ইতিহাস কি মেসির হাতে নিজের কলম তুলে দেবে, নাকি ইয়ামালদের স্পেন নতুন যুগের প্রথম অধ্যায় লিখবে। আর্জেন্টিনার চতুর্থ, নাকি স্পেনের দ্বিতীয়? উত্তর মিলবে নিউ জার্সির অস্থির আকাশের নিচে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।

আরও