গোল্ডেন বুটে কিংবদন্তি এমবাপ্পে

২০১৮ সালে রাশিয়ায় যখন ১৯ বছরের এক তরুণ প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটা বুঝি কেবল প্রতিভার এক ঝলক, সময়ের এক খেয়ালি উপহার।

২০২২ সালে কাতারে যখন ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও দলকে শিরোপা এনে দিতে পারলেন না, তখন তার চোখে জল দেখেছিল গোটা বিশ্ব। সেই কান্নার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আগামীর জেদ। একজন চ্যাম্পিয়নের আসল পরিচয় তো বোঝা যায় হারের পরে সে কী করে, তাতেই।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যেন সেই জেদেরই প্রতিদান। উত্তর আমেরিকার সবুজ মাঠগুলোয় এমবাপ্পে যেন এক নতুন ভাষায় ফুটবল খেললেন। গোলের পর গোল জমা হতে থাকল। ১০ গোল করে জিতে নিলেন গোল্ডেন বুট। ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কালেভদ্রেই এমন কেউ আসে, যে টানা তিনটি বিশ্বকাপে নিজের ছাপ রেখে যায় এমন প্রবলভাবে। এমবাপ্পে সেই বিরল তালিকায় নাম লেখালেন।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে তার নামের পাশে একটি বিশ্বকাপ, দুটি ফাইনাল, দুটি গোল্ডেন বুট, ২২ ম্যাচে ২২ গোল এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদা। ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হলো ফ্রান্সের জন্য শিরোপাহীনতায়। কিন্তু এমবাপ্পের জন্য শেষ হলো আরেকটি ব্যক্তিগত রাজ্যাভিষেকের মধ্য দিয়ে। ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন তিনি। ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপে ছুঁয়েছেন দুই অংকের গোল। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোল সংখ্যা নিয়ে গেছেন ২২-এ। পেছনে ফেলেছেন লিওনেল মেসিকে, পেছনে ফেলেছেন দীর্ঘ শতাব্দীর অসংখ্য কিংবদন্তিকে। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন এখন তার।

এ অর্জনের ভেতর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয়, ২২ গোল করতে তার লেগেছে ২২ ম্যাচ। বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি একটি গোল—পরিসংখ্যান শুনলে মনে হয় যেন কোনো ভিডিও গেমের তৈরি চরিত্রের কথা বলা হচ্ছে। অথচ এটি রক্ত-মাংসের একজন ফুটবলারের গল্প; এমন একজনের গল্প, যিনি তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই টুর্নামেন্টটির প্রায় সব বড় গোলের দরজায় নিজের নাম লিখে ফেলেছেন।

তার যাত্রা শুরু হয়েছিল রাশিয়ায়। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স দলে তিনি ছিলেন ঝড়ের মতো এসে পড়া এক কিশোর। তখন তার বয়স ১৯। মুখে ছিল কৈশোরের ছাপ, পায়ে ছিল আগামীর নিষ্ঠুর গতি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় তার সেই ছুটে যাওয়া আজও বিশ্বকাপের স্মৃতিতে দগদগে। সেই বিশ্বকাপে চার গোল করে ফ্রান্সকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন এমবাপ্পে। ফাইনালেও গোল করেছিলেন। পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার কীর্তি গড়েছিলেন তিনি। অনেক ফুটবলারের সমগ্র ক্যারিয়ারে যে স্বপ্ন অধরা থেকে যায়, এমবাপ্পে কৈশোর পেরোনোর আগেই তা ছুঁয়ে ফেলেছিলেন।

চার বছর পর কাতারে তিনি আরো নির্মম, আরো পরিণত, আরো একাকী। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনাল সম্ভবত কোনো একক ফুটবলারের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মহাকাব্যগুলোর একটি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফ্রান্স যখন প্রায় মৃত, এমবাপ্পে তখন একাই তাদের জীবনে ফিরিয়েছিলেন। একটি পেনাল্টি, একটি অদ্ভুত সুন্দর ভলি, অতিরিক্ত সময়ে আরো একটি পেনাল্টি। বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক। জিওফ হার্স্টের পর মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে এ কীর্তি। অথচ ট্রফি ওঠেনি তার হাতে। সেদিন লুসাইলের আলোয় এমবাপ্পে দাঁড়িয়ে ছিলেন গোল্ডেন বুট হাতে, কিন্তু চোখে ছিল পরাজয়ের ধূসরতা। ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সোনালি পুরস্কার তখন তার কাছে সান্ত্বনার চেয়েও নিষ্ঠুর কিছু ছিল।

২০২৬ বিশ্বকাপে সেই কঠিন মানুষটিই ফিরে এসেছেন নিজের সবচেয়ে ভয়ংকর সংস্করণ হয়ে। প্রতিপক্ষ বদলেছে, মাঠ বদলেছে, আবহাওয়া বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তার লক্ষ্য। ১০ গোলের পথে তিনি যেন প্রতিটি ম্যাচে নিজের আগের সংস্করণকে অতিক্রম করেছেন। তার দৌড় এখনো বিদ্যুতের মতো, তবে আগের চেয়ে বেশি হিসাবি। তার শট আগের মতোই বিস্ফোরক, তবে এখন তাতে যোগ হয়েছে অপেক্ষা করার ধৈর্য।

বিশ্বকাপের সঙ্গে তার সম্পর্কও অন্যদের মতো নয়। তিনটি আসরে খেলেছেন, আর তিনবারই ফ্রান্স খেলেছে সম্ভাব্য সর্বোচ্চসংখ্যক ম্যাচ। রাশিয়ায় সাতটি, কাতারে সাতটি, উত্তর আমেরিকায় আটটি—মোট ২২টি। অর্থাৎ বিশ্বকাপে নিজের ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত একটি সম্ভাব্য ম্যাচও হারাননি তিনি। ফ্রান্স প্রতিবার গেছে শেষ দিন পর্যন্ত, আর প্রতিবারই সেই যাত্রার কেন্দ্রে ছিলেন এমবাপ্পে।

২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পেকে আরেকটি শিরোপা দেয়নি। দিয়েছে গোল্ডেন বুট। দিয়েছে ১০ গোলের মহিমা। দিয়েছে ২২ গোলের বিশ্বরেকর্ড। দিয়েছে এমন এক অবস্থান, যেখানে তিনি এরই মধ্যে কিংবদন্তি।

আরও