রদ্রির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া স্পেন উদযাপন করছে তাদের বিশ্বজয়, আর সেই বিজয়ের প্রতীক তুলে দিচ্ছেন স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইনালের আগে স্পেনের ফরোয়ার্ড বোরহা ইগলেসিয়াস ট্রফি জিতলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন নিয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন, 'অবশ্যই করমর্দন করব। আমি জেলে যেতে চাই না।'
স্পেনের বর্তমান সরকার ইউরোপের অন্যতম দৃঢ় কণ্ঠ হিসেবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গাজা নিয়ে তাদের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, বিশেষ করে ইসরায়েলকে ঘিরে অবস্থান, বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবু স্পেনের অধিনায়ক ট্রফি গ্রহণ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে। দৃশ্যটি আমাদেরকে এক গভীর বার্তা দেয়। আর তা হল সম্প্রীতির বার্তা।
এ দৃশ্যটি দেখার সময় অদ্ভুতভাবে মনে পড়ে যায় আরেকটি বিখ্যাত ছবির কথা। ১৯৯৫ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকা। মাত্র এক বছর আগে শেষ হয়েছে বর্ণবৈষম্যের দীর্ঘ অধ্যায়। দেশটি তখনও বিভক্ত। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার রাগবি দল ‘স্প্রিংবক্স’ ছিল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের প্রতীক। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বড় অংশের কাছে এই জার্সি ছিল এক ধরনের যন্ত্রণার স্মারক। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনালের দিন যা ঘটেছিল, সেটি ইতিহাস বদলে দেয়। নেলসন ম্যান্ডেলা মাঠে প্রবেশ করলেন সেই স্প্রিংবক্স জার্সি গায়ে। হাজার হাজার দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিল। ম্যাচ শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো। ম্যান্ডেলা নিজ হাতে ট্রফি তুলে দিলেন অধিনায়ক ফ্রাঁসোয়া পিনারের হাতে। পরে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন- "Sport has the power to change the world. It has the power to inspire. It has the power to unite people in a way that little else does."
ফুটবলের ইতিহাস খুললে এমন অসংখ্য মুহূর্ত পাওয়া যায়। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে, দুই দেশের সম্পর্ক তখন ছিল পৃথিবীর অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের একটি।বিশ্বজুড়ে অনেকে সেই ম্যাচকে দেখছিলেন রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রতীক হিসেবে।কিন্তু মাঠে যা ঘটল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।ইরানের খেলোয়াড়েরা ম্যাচের আগে মার্কিন খেলোয়াড়দের হাতে সাদা ফুল তুলে দেন।দুই দল একসঙ্গে ছবি তোলে।নব্বই মিনিট পর একজন জিতেছিল, একজন হেরেছিল।কিন্তু ম্যাচটি আজও স্মরণীয় অন্য একটি কারণে- সেদিন পৃথিবী বুঝেছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর বৈরিতা এক জিনিস নয়।আপনি একজন প্রতিপক্ষকে হারাতে পারেন।তাকে ঘৃণা করতেই হবে-এমন কোনো নিয়ম নেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভক্ত হওয়া উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক দশকের পর দশক ধরে টানাপোড়েন, সামরিক উত্তেজনা ও অবিশ্বাসে ভরা। তবু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে কয়েকবার এমন দৃশ্য দেখা গেছে, যা কূটনীতির ইতিহাসেও বিরল। অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুই দেশের ক্রীড়াবিদ একই পতাকার নিচে একসঙ্গে হেঁটেছেন। সেই পতাকাটি কোনো রাষ্ট্রের ছিল না। সেটি ছিল একটি ভূখণ্ডের। একটি বিভক্ত জাতির। সেই কয়েক মিনিটের পদযাত্রা কোরীয় উপদ্বীপকে এক করে দেয়নি। কোনো শান্তিচুক্তিও সই হয়নি। কিন্তু পৃথিবী দেখেছিল, রাজনীতি যেখানে দেয়াল তোলে, খেলাধুলা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য সেখানে একটি দরজা খুলে দিতে পারে।
২০০২ সালে বিশ্ব ফুটবল আরও এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তের সাক্ষী হয়। ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক দুটি দেশ। জাপান। দক্ষিণ কোরিয়া। এই দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে উপনিবেশ, যুদ্ধ, দখল, ক্ষত এবং জাতীয় স্মৃতির গভীর যন্ত্রণা রয়েছে। তারপরও ফুটবল এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছিল, যেখানে একই টুর্নামেন্ট সফল করতে দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়েছিল। স্টেডিয়াম। পরিবহন। নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক আয়োজন। লক্ষ লক্ষ দর্শক। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক। একটি বিশ্বকাপের জন্য দুই দেশ একসঙ্গে এমনভাবে কাজ করেছিল, যা বহু বিশ্লেষকের মতে ক্রীড়া সহযোগিতার এক অনন্য উদাহরণ।
আফ্রিকার ইতিহাসেও ফুটবল একদিন এক ভিন্ন ভাষায় কথা বলেছিল। ২০০৫ সালে আইভরি কোস্ট প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে। দেশজুড়ে তখন গৃহযুদ্ধ। বন্দুকের শব্দ। রক্ত। অবিশ্বাস। উৎসবের বদলে মানুষের জীবনে ছিল অনিশ্চয়তা। বিশ্বকাপে ওঠার আনন্দ উদ্যাপন করার পরিবর্তে অধিনায়ক দিদিয়ের দ্রগবা জাতির উদ্দেশে এক আবেগঘন আবেদন জানান। ক্যামেরার সামনে হাঁটু গেড়ে তিনি অনুরোধ করেছিলেন- হিংসা থামুক, মানুষ অস্ত্র নামিয়ে রাখুক, দেশ আবার এক হোক। ইতিহাসবিদরা বলেন না যে সেই একটি বক্তৃতাই গৃহযুদ্ধ শেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু এটাও সত্য যে, সেই মুহূর্তটি লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এক বিরাট প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এ কারণেই ২০২৬ সালের সেই ট্রফি গ্রহণের দৃশ্যটি এত গুরুত্বপূর্ণ। না, সেটি কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব ছিল, না সেটি ছিলো কোনো কূটনৈতিক চুক্তি। সেটি ছিল একটি প্রতীক। যেখানে একটি দেশের সরকার, আরেকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্বের বিভিন্ন মতাদর্শ, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি- সবকিছু মিলেমিশে দাঁড়িয়েছিল একটি মাত্র মুহূর্তে।