প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্রের তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে ফিফা। ফলে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আজ বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারবেন তিনি। খবর এপি।
চলতি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সর্বোচ্চ তিন গোল করেছেন বালোগুন। গত বুধবার শেষ ৩২-এর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারানোর সময় প্রতিপক্ষের তারিক মুহারেমোভিচের ডান গোড়ালিতে পা দিয়ে ফেলায় লাল কার্ড দেখানো হয় তাকে। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
তবে গতকাল ফিফা ঘোষণা দেয়, শেষ ষোলোর ম্যাচের জন্য সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৬২ সালের পর এ প্রথম বিশ্বকাপে লাল কার্ড পাওয়ার পরও কোনো খেলোয়াড়কে পরবর্তী ম্যাচে খেলার অনুমতি দেয়া হলো।
খেলা শেষে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে ট্রাম্প লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন বলে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, ‘সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অন্যায়ের সংশোধন করায় ফিফাকে ধন্যবাদ।’
অন্যদিকে বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) এ সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। দলের কোচ রুডি গার্সিয়া ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘ফিফার দপ্তরে যে ৫ জুলাই ইউরোপের ১ এপ্রিল (এপ্রিল ফুল) হয়ে গেছে, সেটা আমি জানতাম না।’
ট্রাম্পের ফোন ফিফার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে কিনা কিংবা ক্রীড়া সালিশি আদালতে (সিএএস) আপিল করা হবে কিনা—এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান গার্সিয়া।
আরবিএফএ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘অংশগ্রহণকারী সব দলের বৈধ অধিকার এবং বিশ্বকাপসহ ভবিষ্যতের সব প্রতিযোগিতায় খেলার ন্যায়সঙ্গত মৌলিক নীতিগুলো রক্ষার স্বার্থে আমরা সম্ভাব্য সব আইনি পথ পর্যালোচনা করছি।’
বালোগুনের লাল কার্ডটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ব্রাজিলের রেফারি রাফায়েল ক্লাউস প্রথমে কোনো কার্ড দেখাননি। পরে ভিডিও পর্যালোচনার (ভিএআর) পর সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ বলেন, ‘ফাউলটি দেখলে বোঝা যায়, সেখানে ইচ্ছাকৃত কোনো কিছুই ছিল না। আমার মনে হয়েছে, এই টুর্নামেন্টে এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর ফাউলেও লাল কার্ড দেয়া হয়নি।’
যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন (ইউএসএসএফ) জানায়, গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩১ মিনিটে ফিফার অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্তটির বিষয়ে জানতে পারে।
ফিফা জানায়, এক বছরের প্রবেশন বা পর্যবেক্ষণকাল রেখে ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ফোলারিন বালোগুন একই ধরনের ও সমান গুরুতর অপরাধ করলে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হবে এবং আগের শাস্তি কার্যকর হবে। পাশাপাশি নতুন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তিও দেয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনো ফিফার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ৩০ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়েছে আমাদের। যে সিদ্ধান্তে লাল কার্ড দেয়া হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ অন্যায্য ছিল।’
চলতি বিশ্বকাপে বালোগুনের তিন গোলের মধ্যে বসনিয়ার বিপক্ষে একটি ছিল জয়সূচক গোল। এতে তিনি ২০১০ বিশ্বকাপে ল্যান্ডন ডোনোভানের তিন গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি চার গোল করার রেকর্ডটি এখনো ১৯৩০ সালের বার্ট প্যাটেনডিউডের দখলে।
২৫ বছর বয়সী বালোগুন ফরাসি ক্লাব মোনাকোর হয়ে খেলেন। গত মৌসুমে লিগ ওয়ানে তিনি ১৩টি গোল করেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৩০ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ১২। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে নাইজেরীয় বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেয়া বালোগুন পরে ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে খেললেও ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন।
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে খেলছে। ২০১০ সালে ঘানা, ২০১৪ সালে বেলজিয়াম এবং ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে শেষ ষোলোয় বিদায় নিয়েছিল তারা। ২০০৬ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে জায়গাই পায়নি।
গতকাল বালোগুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন। সঙ্গে ছিল মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয় গান ‘ব্যাড’।
এর আগে শুক্রবার বালোগুন বলেছিলেন, ‘হলুদ কার্ড দিলেই যথেষ্ট হতো বলে আমার মনে হয়।’
ফিফা জানায়, তাদের এ সিদ্ধান্ত শৃঙ্খলা বিধির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে। সেখানে বলা আছে, বিচারিক সংস্থা চাইলে কোনো শাস্তির সম্পূর্ণ বা আংশিক কার্যকারিতা স্থগিত করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে এক-চার বছরের একটি প্রবেশন মেয়াদ নির্ধারণ করা হবে।
এর আগেও ফিফা এমন নজির তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখার পর পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার শেষ দুই ম্যাচ স্থগিত করা হয়েছিল। ফলে তিনি বিশ্বকাপের শুরু থেকেই খেলতে পেরেছিলেন।
এছাড়া গত এপ্রিলে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লাল কার্ড পাওয়া আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওতামেন্দি এবং ইকুয়েডরের মইসেস কাইসেদোর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও স্থগিত করা হয়েছিল, যাতে তারা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলতে পারেন।
১৯৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি গারিঞ্চা স্বাগতিক চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে লাল কার্ড দেখেছিলেন। তবে চিলির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোর্হে আলেসান্দ্রিসহ বিভিন্ন পক্ষের তদবিরে তিনি ফাইনালে খেলতে পারেন এবং ব্রাজিল টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে।