ইংলিশ ফুটবলে ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান, হ্যারি কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর

গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে মোট ৭৩টি গোল করেছেন কেইন। ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একের পর এক গোলের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপেও রেকর্ড গড়েছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ইংল্যান্ড

ব্যালন ডি’অর জিতেছেন হ্যারি কেইন। ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ২৫ বছরের মধ্যে এটি প্রথম পুরস্কার। এছাড়া নারীদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন স্পেনের তারকা আলেক্সিয়া পুতেয়াস। গতকাল রাতে তাদের হাতে ওঠে ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত এ পুরস্কার। খবর এপি।

গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে মোট ৭৩টি গোল করেছেন কেইন। ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একের পর এক গোলের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপেও রেকর্ড গড়েছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ইংল্যান্ড।

পুরস্কার জয়ের পর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত কেইন তরুণ ফুটবলারদের উদ্দেশে বলেন, ‘কেউ দেখছে না, এমন সময়েও কঠোর পরিশ্রম করলে যেকোনো কিছু সম্ভব। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, দৃঢ়তা, সংকল্প ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে শিখতে হয়।’

৩৩ বছর বয়সী এ খেলোয়াড় বলেন, ‘আমার যাত্রাটা সহজ ছিল না। আমি এমন কেউ ছিলাম না, যে সরাসরি শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমাকে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। আজকের অবস্থানে পৌঁছতে আমাকে লড়াই করতে হয়েছে। আশা করি, আমার যাত্রা তোমাদেরও অনুপ্রেরণা জোগাবে।’

ব্যালন ডি’অর ভোটে কেইনের পরের অবস্থানে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিনে ইয়ামাল, ২০২৪ সালের বিজয়ী রদ্রি এবং রেকর্ড আটবারের বিজয়ী লিওনেল মেসি। টানা তৃতীয়বারের মতো সেরা তরুণ ফুটবল প্রতিভার পুরস্কারও জিতেছেন ইয়ামাল।

পুরস্কার গ্রহণের পর সতীর্থ, কোচ, মা-বাবা, সন্তান ও স্ত্রী কেটকে ধন্যবাদ জানান কেইন। সন্তানদের উদ্দেশে মজা করে তিনি বলেন, ‘তোমাদের তো এখন ঘুমানোর সময় পেরিয়ে গেছে।’

স্ত্রীকে উদ্দেশ করে কেইন বলেন, ‘তুমি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমরা নিশ্চিতভাবেই অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। তুমিই আমার সবচেয়ে বড় সমর্থক। তুমি সব সময় আমার সর্বোচ্চ সাফল্য চাও।’

কেইনের নেতৃত্বে গত মৌসুমে বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ—দুই শিরোপাই জেতে বায়ার্ন মিউনিখ। জার্মান কাপের ফাইনালে স্টুটগার্টের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালেও পৌঁছেছিল বায়ার্ন।

বিশ্বকাপে ছয়টি গোল করে ইংল্যান্ডের হয়ে টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন কেইন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায়ও নিজের অবস্থান করে নেন শীর্ষ পাঁচে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেলেও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এমবাপ্পের ফ্রান্সকে হারায় ইংল্যান্ড। এতে ৬০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা অবস্থান নিশ্চিত করে দলটি।

এর আগে সর্বশেষ ২০০১ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন কোনো ইংলিশ ফুটবলার। সেবার পুরস্কারটি পেয়েছিলেন মাইকেল ওয়েন।

কেইন বলেন, ‘ইংল্যান্ডের জন্য, আমাদের দেশের জন্য এটি বিশাল অর্জন। অনুষ্ঠানটি লন্ডনে হওয়াও আমার জন্য শুভ লক্ষণ ছিল। অনেক দিন ধরে কোনো ইংলিশ ফুটবলার এ পুরস্কার জেতেননি। অসাধারণ অনেক ইংলিশ খেলোয়াড় রয়েছেন। এই ট্রফি দিয়ে ইংল্যান্ডকে আবার বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ফিরিয়ে আনতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা আমার কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান, আর এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ।’

ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল কেইনকে বলেছেন, অধিনায়ক হিসেবে তাকে পেয়ে ইংল্যান্ডের ‘থ্রি লায়ন্স’ সৌভাগ্যবান।

টুখেল বলেন, ‘তোমার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করতে গিয়ে নতুন বিশেষণ খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে আমার। তবে ফুটবল বিশ্ব যে আনুষ্ঠানিকভাবে তোমার অর্জনের স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে আমি আনন্দিত।’

লন্ডনের প্যালাডিয়ামে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ঘিরে ভক্তদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। প্রিয় খেলোয়াড়দের একনজর দেখতে কেউ কেউ উঠে পড়েন সড়ক বাতির খুঁটিতেও। অনুষ্ঠানে প্রবেশের সময় ভক্তদের অটোগ্রাফ দেন কেইন।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও ভক্তরা অপেক্ষায় ছিলেন। অক্সফোর্ড সার্কাসের কাছে থিয়েটার থেকে মধ্যরাতের পর বেরিয়ে আসার সময় কেইনের নাম ধরে স্লোগান দেন তারা।

পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে উদ্‌যাপনের পরিকল্পনা থাকলেও তা সীমিত রাখার কথা জানান কেইন। কারণ, বুধবার ম্যাচ রয়েছে। আজ সকালে মিউনিখে ফিরে দলের অনুশীলনে যোগ দিতে হবে তাকে।

ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার প্রথমবারের মতো লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউজ।

নারীদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন স্পেনের তারকা আলেক্সিয়া পুতেয়াস। ছবি: এপি

তৃতীয়বার ব্যালন ডি’অর জিতলেন পুতেয়াস

নারীদের ব্যালন ডি’অর জিতে রেকর্ডের অংশীদার হলেন স্পেনের তারকা আলেক্সিয়া পুতেয়াস। সাবেক ক্লাব বার্সেলোনাকে গত মৌসুমে একাধিক শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এসব শিরোপার মধ্যে ছিল নারীদের চ্যাম্পিয়ন্স লিগও।

গত ডিসেম্বরে স্পেনের হয়ে নারী নেশনস লিগ জয়ের ক্ষেত্রেও অবদান ছিল পুতেয়াসের। অফসিজনে বার্সেলোনা ছেড়ে লন্ডন সিটি লায়নেসেসে যোগ দেন ৩২ বছর বয়সী এ মিডফিল্ডার।

পুতেয়াসের এ জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো স্পেনেরই আরেক তারকা আইতানা বনমাতির টানা তিন বছরের রাজত্ব। ২০২১ ও ২০২২ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর হাঁটুর চোটে পড়েন তিনি। অন্যদিকে, বনমাতি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে। ২০২৫ সালে টানা তৃতীয়বারের মতো নারীদের ব্যালন ডি’অর জেতেন বনমাতি। তবে ডিসেম্বরে পা ভেঙে যাওয়ায় এবার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পাননি তিনি।

নারীদের ব্যালন ডি’অর দেয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। প্রথমবার এ পুরস্কার জিতেছিলেন আডা হেগারবার্গ।

প্রতিক্রিয়ায় তরুণ ফুটবলারদের খেলাটির প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান পুতেয়াস। তিনি বলেন, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো স্বপ্ন থাকলে সেটি পূরণের চেষ্টা করো, এমনকি কোনো একপর্যায়ে যদি তোমাকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়, তবুও।’

২০১২ সালে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন পুতেয়াস। কাতালান ক্লাবটিতে কাটানো সময়কে ‘বিশেষ কিছু’ বলে অভিহিত করেন তিনি।

পুতেয়াস বলেন, ‘বার্সেলোনায় খেলোয়াড় হিসেবে ১৪টি মৌসুম কাটাতে পেরে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। গত বছর আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা যেন এক নিখুঁত গল্প।’

আরও