প্যান্ডোরাকে তৈরি করে দেবতারা প্রমিথিউসকেই উপহার দিতে চেয়েছিলেন। প্রমিথিউস খুব সতর্ক। ফলে এদিকে পা বাড়ালেন না। তবে আপত্তি জানাননি এপিমেথিউস। আর এ আপত্তি না থাকার মাশুল গুনতে হয়েছে সুদে-আসলে। দিন কয়েক পরই দেবতা মারকারি একটা রহস্যময় বাক্স রেখে যান প্যান্ডোরার কাছে। নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কৌতূহল রুখতে পারেননি তিনি। খুলে ফেলেছেন বাক্সের ঢাকনা। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে দুর্ভাগ্য, জরা ও মৃত্যুর মতো অনেক কিছু, যা মানুষকে কষ্ট দেয়। মানবজাতির দুর্দিনের শুরু সেখান থেকেই। গল্পটা গ্রিক পুরাণের। তবে দেবতাদের দিন ফুরালেও প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে কয়েকটি বিষয়। প্রথমত, নারী সবসময় ‘অপর’ হয়ে থেকেছে মানব সমাজে। সে ‘অপরায়ন’ প্রক্রিয়া নেতিবাচক। দ্বিতীয়ত, নারী বৈশিষ্ট্যগতভাবেই কৌতূহলী। তৃতীয়ত, কৈফিয়ত দেয়ার মতো নারীকে সবসময় ব্যাখ্যা করতে হয়েছে নিজের অবস্থান।
দোহায় সন্ধ্যা নেমেছে। সব পাখি ঘরে ফেরার মতো করে ঘরে ফিরেছে ফুটবল দুনিয়া। কিন্তু ব্যস্ততা কমেনি ফিফার। দৃষ্টি এখন নারী বিশ্বকাপে। আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হবে নারীদের বিশ্বকাপ আসর। ভেন্যু অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। কাতারের মতো এখানে শ্রমিক শোষণ নিয়ে অভিযোগ নেই সত্য। তবে আলোচনায় এসেছে আফগান নারী প্রসঙ্গ।
২০২১ সালের আগস্ট থেকে শরণার্থীর জীবন পার করছে আফগান নারী ফুটবল দল। আফগানিস্তানের মাটি ছাড়ার কারণটা ছিল ভয়। নতুন সরকার দ্বারা ফুটবলকে স্বাভাবিকভাবে না নেয়ার ভয়। সেটা অসত্য প্রমাণিত হয়নি। যথারীতি তালেবান সরকার নারীদের জন্য খেলাধুলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। শিরোশ্ছেদ করা হয়েছে জাতীয় ভলিবল দলের এক সদস্যের। নভেম্বর থেকে বন্ধ শরীরচর্চা কেন্দ্র ও পার্কে যাওয়া। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সাধারণ চিত্র এটা। নারী যেন গ্রিক পুরাণের প্যান্ডোরা। যেন সবসময় দুর্দশার বাক্স খুলে দেয়ার ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
তবে নারীদের নিয়ে তালেবানের অবস্থান খেলা ও বিনোদনকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিশোরীদের জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ এক বছরের বেশি সময় ধরে। সম্প্রতি নিষিধাজ্ঞা এল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে। এমনকি নারীরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থায়ও কাজ করতে পারবে না। যেন বাইরের দুনিয়া থেকে ক্রমেই নারীদের সরিয়ে ফেলছে আফগান সরকার। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের পেছনে পড়ে থাকা মানে দেশটির অর্ধেক জনসংখ্যারই পিছিয়ে যাওয়া।
আফগান নারী ফুটবল দল দেশটির জন্য সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এ মুহূর্তে। দলের অধিকাংশ সদস্য এখন অস্ট্রেলিয়ায়। অনেকে আবার আশ্রয় পেয়েছেন পর্তুগালে। ঘর হারিয়ে, জীবিকা হারিয়ে, বন্ধু ও আত্মীয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও তারা ঐক্যবদ্ধ রেখেছে দলটাকে। এটাই তাদের আশ্রয়। দেশ ছেড়ে আসার ট্রমা তাড়া করে। যুদ্ধ করতে হয় অচেনা দেশে খাপ খাইয়ে নিতে। খেলোয়াড়দের রাত কাটে দুঃস্বপ্নে, অনিদ্রায় ও হতাশায়। তার পরও খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে তারা হাসতে চায়। চিৎকার করে। সাগ্রহে উদযাপন করে প্রতিটি গোল। তাদের জন্য কিছুটা ভরসা প্রয়োজন।
এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই ও আফগান নারী দলের সাবেক কোচ খালিদা পপাল। বিশ্বকাপের আগেই আফগান নারীদের ব্যাপারে ফিফার আনুকূল্যমূলক সিদ্ধান্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশ্বকাপের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে খেলতে না পারলেও আফগান শিবির হাল ছাড়েনি। বিশ্বের সেরা দলের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে অব্যাহত রেখেছে মাঠের সঙ্গে সম্পর্ক। তারা নতুন করে দাঁড়াতে চায়। দেশে নিষেধাজ্ঞার ভেতরে বসবাস করা নারীদের আশার আলো দেখাতে চায়। তবে সেজন্য ফিফাকেও এগিয়ে আসতে হবে। দেশের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে আফগান শিবিরকে। ফিফাকে তার মতো করেই উদ্যোগ নিতে হবে। উৎসাহ দিতে হবে মেয়েদের কাজে, শ্রেণীকক্ষে ও ফুটবলের মাঠে যাওয়ার। আফগান নারীরা ফুটবল ভালোবাসে। ভালোবাসে দেশ আফগানিস্তানকে। ফুটবলের ক্ষমতা যে কম নয়, তা এরই মধ্যে কাতার বিশ্বকাপ আসরে প্রমাণিত হয়েছে। ফিফা এক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে প্রয়াস চালাতে পারে।
প্যান্ডোরার গল্পের শেষটুকু ফের তুলে আনা যাক। সবকিছু বের হয়ে যাওয়ার পর বাক্সের ভেতরে একটা শব্দ শুনতে পান প্যান্ডোরা। কিছু একটা কাকুতিমিনতি করে বেরিয়ে আসার জন্য। যত নেতিবাচকতা এরই মধ্যে বের হয়ে এসেছে। এর চেয়ে খারাপ কিছু নেই। ফলে প্যান্ডোরা দ্বিতীয়বারের মতো খোলেন ঢাকনা। আর ভেতর থেকে প্রজাপতির মতো বেরিয়ে আসে ‘আশা’। সমস্ত ক্ষতকে ছুঁঁয়ে দেয় সে। আশা তৈরি করে নতুনভাবে বাঁচার, সমস্ত দুর্দশার পর। আফগান ফুটবল দলের জন্য সেই আশাটুকু সবচেয়ে প্রয়োজন এখন।