ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ মানেই স্নায়ুর লড়াই, আর সেই লড়াইয়ে এবার পাকিস্তানকে তাদের নিজেদের অস্ত্রেই ঘায়েল করল ভারত। কলম্বোর মন্থর উইকেটে পাকিস্তানকে বাগে আনতে সালমান আলী আগারা যখন স্পিন আক্রমণকে ‘প্ল্যান এ’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, ঠিক তখনই পাল্টা মারণাস্ত্র হয়ে আবির্ভূত হলেন ঈশান কিশান। একদিকে ইশানের খুনে ব্যাটিং, অন্যদিকে হার্দিক-বুমরাহর গতির তোড়—দুইয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে দিশেহারা পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত হলো ৬১ রানের বড় ব্যবধানে।
টস জিতে বোলিংয়ে আসা পাকিস্তানের কৌশল ছিল পরিষ্কার—পাওয়ার প্লেতেই স্পিনারদের লেলিয়ে দিয়ে ভারতের টপ অর্ডারকে চেপে ধরা। বোলিংয়ের শুরুতে দেখা গেল না শাহিন শাহ আফ্রিদিকে। আক্রমণ শুরু করলেন অধিনায়ক সালমান আর প্রথম ওভারেই শূন্য রানে ফেরালেন টি-২০ সেনসেশন ও এই ম্যাচের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাটার অভিষেক শর্মাকে। তারপর নতুন বলে এলেন শাহিন। দেখালেন, দিনটি তার নয়। সালমানও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করলেন মোট ৬ জন স্পিনারকে। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ স্পিনার দুইজন। আলোচিত উসমান তারিক তারিক তার বোলিংয়ের ব্যতিক্রমী ও বৈচিত্রপূর্ণ রিলিজ পয়েন্ট দিয়ে ভালোই ভালোই ভোগালেন ভারতীয় ব্যাটারদের। কিন্তু আবরার আহমদকে বারবার বাউন্ডারির বাইরে আছড়ে ফেলেছেন ইশান কিশান। উসমানকে অনেক দেরিতে বোলিংয়ে আনা আর স্পিনে দক্ষ ইশানের সামনে বাকিদের বেধড়ক পিটুনি খাওয়ার সময়টা স্মরণে রাখলে পুরো ম্যাচের প্রেক্ষাপটে মনে হতেই পারে, ইশান হয়তো অন্য কোনো উইকেটে খেলেছেন! যে ইশানকে একসময় স্পিনের বিরুদ্ধে দুর্বল ভাবা হতো, তিনিই কাল হয়ে দাঁড়ালেন পাকিস্তানের স্পিন ব্রিগেডের যমদূত।
ম্যাচের বড় বাঁক আসে যখন তিনি মুখোমুখি হন পাকিস্তানের প্রধান লেগস্পিনার আবরার আহমেদের। প্রথম বলেই দারুণ এক স্লগ সুইপে ছক্কা, পরে কাভার ড্রাইভ। পরের ওভারে শাদাব খানও একই পরিণতির শিকার। শাদাবের লেগ স্টাম্পে ফিড করা ডেলিভারি ইশানের কাছে ছিল মহার্ঘ উপহার—এক ছক্কা ও এক চারেই তা স্পষ্ট।
মাত্র ২৭ বলে ফিফটি পূর্ণ করে তিনি গড়লেন ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপে দ্রুততম হাফ-সেঞ্চুরির রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত ৪১ বলে ৭৭ রানের যে টর্নেডো ইশান বইয়ে দিলেন, তাতে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৭৫। মজার বিষয় হলো, ঈশান যখন আউট হন, তখন ভারতের স্কোরবোর্ডের ৮৭ শতাংশ রানই ছিল তার একার। স্পিনের বিরুদ্ধে তার ২১৪ স্ট্রাইক রেট প্রমাণ করেছে, ঘরোয়া ক্রিকেটে ঝাড়খণ্ডের হয়ে কঠোর পরিশ্রমের ফল তিনি হাতেনাতে পাচ্ছেন।
পাকিস্তানের কৌশল যে কাজ করেনি তা আরো স্পষ্ট হয় তাদের বোলিং পর্ব শেষে। অধিনায়ক সালমান আগা ম্যাচ শেষে স্বীকার করেন, স্পিনারদের দিনটা খারাপ ছিল। তবে তিনি যা বলেননি তা হলো স্পিনে পাকিস্তানের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। ২০ ওভারের মধ্যে ১৮ ওভারই স্পিন—শ্রীলঙ্কান কন্ডিশনের কথা মাথায় রেখেও এতটা একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতীই হলো।
এই কৌশলে পাকিস্তান আগেও সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু ইশানের কাউন্টার অ্যাটাকে পাকিস্তানের সেই স্পিন-বিলাস কার্যত দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। শাদাব খান থেকে শুরু করে মিস্ট্রি স্পিনার উসমান তারিক—ইশানের রিভার্স সুইপ আর ডাউন দ্য গ্রাউন্ড হিটিংয়ের সামনে কারোরই যেন কিছু করার ছিল না। পাকিস্তান কোচ মাইক হেসনের ভাষায়, ইশানের ওই নির্ভীক ব্যাটিং তাদের স্পিনারদের লাইন-লেন্থ গুলিয়ে দিয়েছিল।
ভারতের ইনিংস মানেই যেখানে ছিল পাকিস্তানের স্পিন ব্রিগেডের লড়াই, সেখানে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের সময় চিত্রনাট্য বদলে দিলেন হার্দিক পান্ডিয়া ও জাসপ্রিত বুমরাহ। পাকিস্তানের ওপেনাররা যখন স্পিন খেলার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন হার্দিক তার প্রথম ওভারেই উইকেট তুলে নিয়ে কাঁপন ধরিয়ে দেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে হার্দিকের রেকর্ড বরাবরই ঈর্ষণীয়, আর কালকের উইকেট-মেডেন সেই আধিপত্যকেই আরো পোক্ত করল। বুমরাহর ১৪৫ কিমি গতির ইয়র্কার আর ইনসুইংয়ের কোনো জবাব ছিল না আগাদের কাছে। মাত্র ১৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে বসা পাকিস্তান আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
প্রেমাদাসার এ ম্যাচটি ছিল কৌশলের লড়াই। পাকিস্তান যেখানে স্পিন নিয়ে বাজি ধরেছিল, ইশান কিশান সেখানে গায়ের জোরে সেই বাজি নস্যাৎ করে দিলেন। আর বল হাতে ভারত প্রমাণ করল, উইকেট যেমনই হোক, মানসম্পন্ন পেস বোলিং এখনো ক্রিকেটের আসল ‘গেম চেঞ্জার’। পাকিস্তানের ১৮ ওভারের স্পিন যেখানে ব্যর্থ, সেখানে ভারতের পেসারদের শুরুতেই নেয়া উইকেটগুলোই গড়ে দিয়েছে ব্যবধান। দিনশেষে, এই ম্যাচকে ইশান বিশেষভাবে মনে রাখবেন, আর পাকিস্তানের কাছে হয়ে থাকবে তাদের রণকৌশলের এক চরম পরাজয়ের গল্প।