একসময় বলা হতো, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ফুটবলকে আরো নির্ভুল, আরো ন্যায্য করে তুলবে। বিতর্ক কমবে, ভুল সিদ্ধান্তের অবসান হবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ততই যেন উল্টো চিত্র সামনে আসছে। মাঠের খেলাকে টপকে অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত। ভিএআর, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, বলের ভেতরের সেন্সর এবং ভিডিও বুথে অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপকে অনেকেই বলছেন 'প্রযুক্তিনির্ভর ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়'।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আশা করেছিলেন, প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার হয়তো রেফারিং বিতর্কের অবসান ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে ঠিক উল্টো। টুর্নামেন্টের প্রায় প্রতিটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রেই রয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের ঘটনাও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত গড়ায়। ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও পরে ফিফাপ্রধান দাবি করেন, ওই সিদ্ধান্তে তার কোনো ভূমিকা ছিল না।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় আর্জেন্টিনা-মিসরের মধ্যকার শেষ ষোলোর ম্যাচে। মিসরের একটি গোল ভিএআর বাতিল করে দেয়। কারণ গোল হওয়ার আগে নিজেদের অর্ধে মিসর একটি ফাউল করেছিল বলে ভিডিওতে ধরা পড়ে। অন্যদিকে মিসরের দাবি করা একটি পেনাল্টির ঘটনা ভিএআরে পর্যালোচনাই করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে আসর থেকে বিদায় নেয় আফ্রিকার দলটি। ম্যাচ শেষে ক্ষোভ লুকাননি মিসর কোচ হোসাম হাসান। তার অভিযোগ, যা ঘটছে তা মোটেও ন্যায্য নয়।
অবশ্য ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা এসব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, ফাউল যদি ফাউলই হয়, তবে সেটি গোল হওয়ার কতক্ষণ আগে হয়েছে বা মাঠের কোন অংশে হয়েছে, সেটি বিবেচ্য নয়। রেফারি যদি মাঠে ঘটনাটি না দেখে থাকেন, তাহলে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতেই পারে। কলিনার এ ব্যাখ্যা যদিও বিতর্ক আরো উসকে দিয়েছে। কারণ ভিএআরের মূল দর্শনই ছিল ‘স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ভুল’ সংশোধন করা। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই এমন সব সূক্ষ্ম ঘটনা নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলানো হচ্ছে, যা খালি চোখে বোঝাই কঠিন।
প্রকৃতপক্ষে ভিএআরের জন্ম হয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের মতো ঘটনা ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে। সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার দীর্ঘদিন এ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তবে ২০১৬ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর ইনফান্তিনো দ্রুত এটি চালু করেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচের মধ্যে ভিএআরের হস্তক্ষেপ ছিল মাত্র ২০টিতে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে একই সংখ্যক ম্যাচে তা ৩০-এরও কম ছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে ১০৪ হওয়ার পাশাপাশি ভিএআরের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। ফলে টুর্নামেন্টের শুরুতেই হস্তক্ষেপের সংখ্যা আগের সব আসরের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়।
ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) সহযোগিতায় কলিনা এবার ভিএআরের জন্য আরো চারটি নতুন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করেছেন। অর্থাৎ ভিডিও বুথে থাকা কর্মকর্তাদের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু এ বাড়তি ক্ষমতাই প্রশ্ন তুলছে—খেলার নিয়ন্ত্রণ কি ধীরে ধীরে রেফারির হাত থেকে প্রযুক্তির হাতে চলে যাচ্ছে?
এ বিতর্ককে আরো উসকে দিয়েছে ক্রোয়েশিয়া-পর্তুগাল ম্যাচের একটি সিদ্ধান্ত। ম্যাচের যোগ করা সময়ে যোশকো ভার্দিওলের সমতাসূচক গোল বাতিল করে ভিএআর। কারণ বলটি ভার্দিওলের কাছে যাওয়ার আগে সতীর্থ ইগর মাতানোভিচের শরীর স্পর্শ করেছিল বলে বলের ভেতরে থাকা সেন্সর শনাক্ত করে। খালি চোখে বলের গতিপথে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এমনকি অনেক রিপ্লেতেও স্পর্শটি বোঝা যায়নি। তবু প্রযুক্তি বলেছে, স্পর্শ হয়েছিল; ফলে অফসাইড।
ফিফা এটিকে প্রযুক্তির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি লুকা মদরিচের কাছে এটি ছিল প্রযুক্তির অপব্যবহার। তার ভাষায়, ‘কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তি অবশ্যই উপকারী। কিন্তু এখন এটি হয় ভুলভাবে, নয়তো বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদি ২০০ শতাংশ নিশ্চিত ভুল হয়, তাহলে হস্তক্ষেপ করা উচিত। কিন্তু ধূসর অঞ্চলের ঘটনায় প্রযুক্তিকে ঢোকানোর কোনো প্রয়োজন নেই।’ ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনও ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি প্রযুক্তির অপব্যবহার।
বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টের তথ্য বিশ্লেষণ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটওয়ার্ক সায়েন্টিস্ট ব্রেনান ক্লেইন। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার দর্শকদের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অসংখ্য ক্যামেরা দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত বিশ্লেষণ করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও সেটি ফুটবলের আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। স্টেডিয়ামে দর্শকদের বারবার দুয়োধ্বনি সেই অসন্তোষেরই প্রতিফলন।
পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, ভিএআরের প্রভাব নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। রাউন্ড অব ১৬ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের ১৩টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছে। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায় এ সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগুন এবং ইংল্যান্ডের জ্যারেল কোয়ানসাহর লাল কার্ড মাঠের রেফারি প্রথমে দেখাননি; ভিএআরের হস্তক্ষেপেই পরে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়।
ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলও ক্ষোভ ঝেড়েছেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত ভিএআর বদলে দিল, সেটি আদৌ কি ‘স্পষ্ট ভুল’ ছিল? তার মন্তব্য, ‘ভিএআর সিদ্ধান্ত উল্টে দিল, কিন্তু এটি কোনোভাবেই পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট ভুল ছিল না। রেফারি ফাউলই দেননি, অথচ পরে পেনাল্টি হয়ে গেল। রেফারিংয়ের মানও প্রশ্নের মুখে।’