ধুঁকছে, লড়ছে তবু জিতছে আর্জেন্টিনা

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা কতটুকু ভালো খেলেছে বা নান্দনিক খেলেছে, বলের দখল কতটা নিখুঁত ছিল—সেসব প্রশ্ন যেন বড্ড অমূলক আর ধূসর হয়ে উঠেছে।

বরং কতটুকু স্নায়ুক্ষয় আর অনিশ্চয়তার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে টিকে রইল, সেটাই মুখ্য। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেরা লাতিন ফুটবলের রঙিন ক্যানভাস সরিয়ে রেখে যেন নেমেছিল টিকে থাকার যুদ্ধে। সেখানে সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি সত্য স্নায়ুর অবিরাম ক্ষয়। প্রতিটি মুহূর্ত যেন আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। সেই দহন আর অনিশ্চয়তার ঢেউ অতিক্রম করে ক্ষয়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত হুলিয়ান আলভারেজ আর লাউতারো মার্টিনেজের পায়ে ভর করে বিজয় যেন এসে বসে কাঁধে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ঘরে ফেরা ক্লান্ত পথিকের মতো।

তাই খেলা শেষে কানসাসের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন চল্লিশ হাজারেরও বেশি কণ্ঠের আদিম ও রুদ্র গর্জন শুধু উল্লাস নয়, বরং খাদের কিনারা থেকে বিশ্বকাপে জয়ের লড়াইয়ে টিকে থাকার নিগূঢ় আনন্দ। মাঠের সবুজ ঘাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের শরীরগুলো যেন যন্ত্রণাক্লিষ্ট উপাখ্যান। চরম ক্লান্তিতে কেউ মাঠের বুকে আছড়ে পড়ছেন, কারো চোখ বেয়ে নামছে সব হারানোর ভয়কে জয় করার নোনা জল। কেউবা শূন্যে হাত তুলে পরম আশ্রয়ে খুঁজছেন সেই অমোঘ সান্ত্বনা, যিনি প্রতিবার এ দলটাকে প্রলয়ের মুখ থেকে বাঁচিয়ে আনেন। যেন দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক বন্দিত্বের পর প্রথম মুক্ত নিশ্বাস, এক আদিম ক্যাথারসিস।

অথচ একটু আগে এ দলটা ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকে শেষ বাঁশি বাজার আগের সেকেন্ড পর্যন্ত ভুগেছে, ধুঁকেছে, অনিশ্চয়তার ধারালো ছুরির নিচে বিক্ষত হয়েছে। শেষে মাঠের ভেতরের সেই শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকার কেটে গিয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজের ডান পায়ের জাদুকরী ও অবিশ্বাস্য শটে। নাটকের শেষ অঙ্কটি লেখেন লাউতারো মার্টিনেজ। যেন এক চিলতে স্বস্তির আলো নিয়ে, প্রত্যাক্রমণের তীব্র গতিতে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে ডান পায়ের এক আলতো ছোঁয়ায় বলটিকে জালের গহিনে পাঠিয়ে জয় নিশ্চিত করেন।

মাঠের খেলায় কোনো চেনা ছন্দ ছিল না, সৃজনশীলতার বালাই নেই যেন, ছিল সীমাহীন সংশয় ও স্নায়ুচাপ। কিন্তু গ্যালারির সেই অবাধ্য ও অবিচল বিশ্বাসই যেন মাঠের ১১টি ক্লান্ত প্রাণকে টেনে নিয়ে গেছে লক্ষ্যের দিকে। আর্জেন্টিনার ফুটবল তাদের চেনা সামর্থ্যের চেয়ে অনেক নিচে ছিল, ম্যাচজুড়ে ছিল ছন্নছাড়া ভাব, তবু দিন শেষে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩-১ গোলে স্কোরবোর্ডের জয়ী নামটা তাদেরই। ফুটবল কখনো কখনো সুন্দরের চেয়েও বেশি টিকে থাকার নিষ্ঠুর লড়াই। আর সেই স্নায়ুযুদ্ধ সয়ে তারা যেভাবে ভুগেছে, যেভাবে লড়েছে, দিন শেষে ঠিক সেভাবেই বুক চিতিয়ে জিতেছে।

এ জয়ে আধিপত্যের আভিজাত্য ছিল না, ছিল না নিখুঁত অর্কেস্ট্রার সুর। যেন আর্জেন্টিনা মাঠে নেমেছিল এক বুক ক্লান্তি আর ছন্নছাড়া ফুটবল নিয়ে। মিসরের বিরুদ্ধে সেই জাদুকরী ম্যাচের যে রূপকথা দর্শকদের মনে তাজা ছিল, তার লেশমাত্র ছিল না কানসাসের তপ্ত সন্ধ্যায়। প্রথমার্ধে তারা যে গোলটি পেয়েছিল, সেটাও খেলার ধারার বিপরীতে গিয়ে। লিওনেল মেসির নেয়া এক নিখুঁত কর্নার কিকে শূন্যে ভেসে উঠে হেড করেছিলেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার সোর চেয়ে উচ্চতায় ছোট হয়েও ম্যাক অ্যালিস্টারের সেই বাঘের মতো লাফ আর নিখুঁত হেড কোণ ঘেঁষে জালে জড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ ১-০ ব্যবধানের লিড দলটিকে স্বস্তি দেয়ার বদলে এক অদ্ভুত অবশতার জন্ম দেয়। গোল পাওয়ার পর থেকেই স্কালোনির দল যেন এক অদ্ভুত রক্ষণাত্মক খোলসের ভেতর ঢুকে পড়ে। তারা বলের নিয়ন্ত্রণ সুইজারল্যান্ডকে ছেড়ে দিয়ে ম্যাচের গতি ধীর করে দেয়ার চেষ্টা করছিল। ফাউল আদায় করা, সময় নষ্ট করা আর খেলাকে নিজেদের অর্ধেকের মধ্যে আটকে রাখার এ কৌশল আর্জেন্টিনার চেনা দর্শনের সঙ্গে বড্ড বেমানান লাগছিল।

মেসি মাঝমাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন। এনজো ফার্নান্দেজ নিজের স্বাভাবিক ছন্দে নেই। রদ্রিগো ডি পলের দৌড় আছে, কিন্তু সৃজনশীলতা কম। হুলিয়ান আলভারেজ সামনে অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও কার্যকর পাস পাচ্ছেন না। ফলে আক্রমণগুলো ভেঙে পড়তে থাকে শুরু হওয়ার আগেই। আক্রমণের চাকা ঘুরছিল মূলত মেসি ও আলভারেজের উদ্দেশ্যে বাড়ানো লম্বা পাসে, যা সুইজারল্যান্ডের জমাট ডিফেন্স সহজেই প্রতিহত করছিল।

দ্বিতীয়ার্ধে সুইজারল্যান্ড আরো সাহসী হয়ে ওঠে। তারা বুঝে যায়, আর্জেন্টিনা পিছিয়ে আসছে। ব্রিল এমবোলোর শক্তি, দান এনদোয়ের গতি আর গ্রানিত জাকার দূরপাল্লার প্রচেষ্টা একের পর এক সতর্কবার্তা দিতে থাকে। বোঝা যাচ্ছিল, এ অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতার জন্য কোনো বড় মাশুল দিতে হতে পারে। নাহুয়েল মলিনা পুরো ম্যাচেই ছায়ার মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার দিক থেকে আসা প্রতিটা আক্রমণই আর্জেন্টাইন শিবিরে কাঁপন ধরাচ্ছিল।

ডিফেন্সের এ ফাটলগুলো পুরো ম্যাচ আড়াল করা যায়নি। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে এল চরম আঘাত। রদ্রিগেজের সঙ্গে চমৎকার এক ওয়ান-টু পাসের কম্বিনেশনে রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে বল জালে জড়িয়ে দিলেন এনদয়। মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে বল যখন জালে জড়াচ্ছে, তখন অ্যারোহেডের আকাশে যেন এক লহমায় মেঘ নেমে এসেছিল। সমতা ফিরিয়ে সুইজারল্যান্ড তখন ম্যাচ জয়ের সুবাস পাচ্ছিল।

কিন্তু নাটকের আরো বড় এক অধ্যায় দেখা গেল ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআরের পর্দায়। সমতা ফেরার ঠিক ৩ মিনিট পর মাঝমাঠে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো। ব্রেল এমবোলোকে ফাউল করার অপরাধে দেয়া সেই কার্ড নিয়ে যখন তীব্র প্রতিবাদ চলছে, তখনই বেজে উঠল ভিএআরের ঘণ্টা। রিপ্লেতে দেখা গেল, কোনো ফাউলই হয়নি, বরং এমবোলো নিজেই ডাইভ দিয়ে রেফারিকে বিভ্রান্ত করেছেন। ফুটবলের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভুল পরিচয় বা ভুলের বিচার সংশোধনের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রেফারি পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করেন এবং সেটি তুলে দেন এমবোলোর দিকে। এমবোলোর এটি ছিল দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, যার অর্থ অবধারিত লাল কার্ড। এমবোলো যখন অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়ছেন, সুইজারল্যান্ড তখন ১০ জনের দলে পরিণত হয়েছে।

অথচ সেই ১০ জনের দলের বিরুদ্ধেও আর্জেন্টিনা ধুঁকছিল। আক্রমণে ছিল না সৃজনশীলতা, পাসিংয়ের গতি ছিল মন্থর। এ অচলাবস্থা ভাঙতে স্কালোনিকে শেষ পর্যন্ত জুয়ার চাল চালতেই হলো। রক্ষণাত্মক ও মাঝমাঠের ছক ভেঙে তিনি মাঠে নামিয়ে দিলেন নিকোলাস গঞ্জালেস, লাউতারো মার্টিনেজ ও ফ্ল্যাকো লোপেজকে। মাঠের ভেতরে তখন ৪-১-৫ ফরমেশন। মেসি, লাউতারো, আলভারেজ, লোপেজ আর আলমাদা। একঝাঁক ফরওয়ার্ড অলআউট আক্রমণ। ৯০ মিনিটের শেষভাগে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড পোস্টের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায়। মেসির দূরপাল্লার শট রুখে দেন সুইস কিপার কোবেল। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও কোনো দলই গোলমুখ খুলতে পারেনি।

সবাই যখন পেনাল্টি শুটআউটের স্নায়ুযুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ১১২ মিনিটে ঘটল জাদুকরী ঘটনা। সাইডলাইনের ঠিক কোনায় বলটি প্রায় মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছিল, সেখান থেকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখলেন ফ্ল্যাকো লোপেজ। বল বাড়িয়ে দিলেন বক্সের সামান্য বাইরে থাকা হুলিয়ান আলভারেজের দিকে। এ বিশ্বকাপে এতক্ষণ গোলের দেখা না পাওয়া ‘স্পাইডার’ যেন তার সমস্ত ক্ষুধা জমিয়ে রেখেছিলেন এ মুহূর্তের জন্য। কোনো ডিফেন্ডার বাধা দেয়ার আগেই ডান পায়ের এক অবিশ্বাস্য বাঁকানো শট। বলটি হাওয়ায় ভেসে সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক কোবেলকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে জালের একেবারে ওপরের কোনায় গিয়ে ঠেকল।

গোলের পর সুইজারল্যান্ড মরিয়া হয়ে সামনে উঠে আসে। সেই ফাঁকা জায়গাতেই শেষ আঘাত করেন লাউতারো মার্টিনেজ। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, ১২১ মিনিটে থিয়াগো আলমাদা বল নিয়ে একক দৌড়ে সুইজারল্যান্ডের বক্সে ঢুকে পড়েন। কোবেলের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে তার শটটি লাইনে বাধা পেলেও ঠিক পেছন থেকে চিতার গতিতে ছুটে আসছিলেন মার্টিনেজ। ডান পায়ের ছোঁয়ায় বলটিকে পোস্টের ভেতরের দিক দিয়ে জালে জড়িয়ে দিলেন। বিশ্বকাপে ওপেন প্লে থেকে লাউতারোর প্রথম গোল এটি।

রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের দৃশ্যপট বদলে গেল এক চিরন্তন উৎসবে। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, কেন এ দলটা নিখুঁত অর্কেস্ট্রার সুরের মতো মায়াবী ফুটবল খেলছে না। তাদের প্রতিটি পরিবর্তন নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উঠছে—কেন ২৬ জনের স্কোয়াড ঘুরপাক খায় মাত্র ১৬ জনে, কেন একই কৌশলের ক্লান্তিহীন পুনরাবৃত্তি? তবে দিন শেষে সমস্ত সংশয়, স্নায়ুযুদ্ধ আর অনিশ্চয়তার দেয়াল গুঁড়িয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালের জ্বলন্ত মঞ্চে, যেখানে অপেক্ষা করছে ইংল্যান্ড।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও বৈরিতাপূর্ণ এ ঐতিহাসিক দ্বৈরথের আগে আর্জেন্টিনার এই ভুগে ভুগে, রক্ত নিংড়ে লড়ে জেতার আদিম ক্ষমতাটাই কি তবে তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, নাকি কোনো চোরা দুর্বলতা, সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে আটলান্টায়। প্রত্যেক আর্জেন্টাইনের মনে এখন একটাই প্রার্থনা—লড়াইটা যতই কঠিন হোক, দিন শেষে যেন আকাশি-সাদার বিজয় পতাকাটাই ওড়ে। কারণ বিশ্বকাপে সবসময় সবচেয়ে সুন্দর ফুটবলই জেতে না। কখনো কখনো জেতে সেই দল, যারা সবচেয়ে বেশি আঘাত সহ্য করতে পারে, সবচেয়ে দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতে পারে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারায় না। এ আর্জেন্টিনা ঠিক তেমনই। তারা ভুগছে। তারা লড়ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জিতছেও।

আরও