নরওয়ের রূপকথার যাত্রাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে দিলেন আর্লিং হালান্ড। ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে। আর জোড়া গোল করে পুরো ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন কেন তিনি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন।
শেষ ষোলোর ম্যাচে দীর্ঘ সময় ব্রাজিলের রক্ষণভাগে আটকে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী এ ফরোয়ার্ড। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষের বক্সে মাত্র চারবার বল ছুঁয়েছিলেন। কিন্তু ৭৯ মিনিটে সেই চার স্পর্শের একটিতেই হেডে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন। এর পর ৯০ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নিচু শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এ জয়ে নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা করে নিল।
এ দুই গোলের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে হালান্ডের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনি এখন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সমান উচ্চতায় রয়েছেন।
সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট বলেন, ‘অনেকে সবসময় বলে হালান্ড কত কম বল স্পর্শ করে। কিন্তু তার অনেক স্পর্শের প্রয়োজনই হয় না।’
অন্যদিকে সাবেক স্কটল্যান্ড উইঙ্গার প্যাট নেভিনের মতে, হালান্ডের জয়সূচক গোলটি ছিল অসাধারণ। তার ভাষায়, ‘ওই মুহূর্তে কোনো সুযোগই ছিল না। অর্ধেক সুযোগও নয়, একেবারেই কিছু ছিল না। অথচ হালান্ড সেখান থেকেই গোল বের করে আনল।’
১৯৯৮ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে নরওয়ে। অথচ স্টালে সোলবাক্কেনের দল এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, যারা শেষ ষোলোয় মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে।
সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওয়েন রুনি বলেন, ‘হালান্ড পুরো নরওয়েকেই বিশ্বাস এনে দিয়েছে যে তারা অনেক দূর যেতে পারে।’
বিশ্বকাপে চার ম্যাচে সাত গোল করেছেন হালান্ড। এর মধ্যে গ্রুপ পর্বে ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে দুটি করে গোল করেছিলেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্রামে ছিলেন। এরপর নকআউট পর্বে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করার পর এবার ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করলেন।
নরওয়ের হয়ে সিনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫৪ ম্যাচে তার গোল এখন ৬২টি। গড়ে প্রতি ৭১ মিনিটে একটি করে গোল করেছেন। আরো অবাক করার বিষয়, এ ৬২ গোলের মধ্যে মাত্র ছয়টি এসেছে পেনাল্টি থেকে। এছাড়া নরওয়ের হয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে গোল করতে পারেননি।
ব্রাজিল ম্যাচের আগে হালান্ড ও ব্রাজিলের সেন্টার-ব্যাক গ্যাব্রিয়েলের দ্বৈরথ নিয়েও ছিল ব্যাপক আলোচনা। প্রথমার্ধে গ্যাব্রিয়েল তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই জায়গা খুঁজে নিয়েছেন হালান্ড। প্রথম গোলে গ্যাব্রিয়েলকে হারিয়েই হেড করেন, আর দ্বিতীয় গোলে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ছিলেন শুধু দর্শক।
পুরো ম্যাচে হালান্ড বল স্পর্শ করেছেন মাত্র ৩০ বার এবং সফল পাস দিয়েছেন ১৩টি। তার প্রত্যাশিত গোলের মান (এক্সজি) ছিল মাত্র দশমিক ৩৯। পরিসংখ্যান বলছে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি, কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন তিনিই।
হালান্ড নিজেও মনে করছেন, তিনি ক্যারিয়ারের নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছেন। ম্যাচ শেষে বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টে কয়েকবারই মনে হয়েছে আমি নতুন এক শিখরে উঠেছি। আমি যদি এক-দুটি সুযোগ পাই, বেশির ভাগ সময়ই গোল করি। এটাই আমার কাজ।’
ম্যাচ শেষে সতীর্থদের নিয়ে সমর্থকদের সামনে বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে নেতৃত্ব দেন হালান্ড। হাজারো সমর্থক ভাইকিং হেলমেট পরে, লাল পতাকা উড়িয়ে সেই উদযাপনে যোগ দেন।
নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন বলেন, ‘আজ পুরো দেশ একসঙ্গে বৈঠা চালাচ্ছে। এই উদযাপন আসলে আমাদের ঐক্যের প্রতীক।’
হালান্ডের কণ্ঠেও ছিল একই আবেগ, ‘এটি নরওয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিনগুলোর একটি।’
এখন নরওয়ের সামনে ইংল্যান্ড। আর হালান্ডের দুর্দান্ত ফর্ম দেখে বলা যায়, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম একটাই—আর্লিং হালান্ড।