ম্যাচের আগে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বলছিলেন, তার দল ও ইংল্যান্ড কেউই এ ম্যাচটি খেলতে চায় না। মানে সেমিফাইনালে হারের পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। দুঃখ ভুলে শেষ পর্যন্ত ‘লা ব্লুজ’ আর ‘থ্রি লায়ন্স’রা মাঠে নামলেন এবং অংশ হলেন এ আসরের অন্যতম সেরা ম্যাচের। এ ম্যাচে হয়েছে একগুচ্ছ রেকর্ড। তাই রেকর্ডের আলোয় উজ্জ্বল ব্রোঞ্জের ম্যাচ।
ইংল্যান্ড তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তৃতীয় হলো এবং ৬০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে এটাই তাদের সেরা সাফল্য। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর কখনই এত বড় অর্জন নেই ইংলিশদের। ১৯৯০ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরে যায় ‘থ্রি লায়ন্স’রা। শিরোপা জিততে না পারলেও বুকায়ো সাকার হ্যাটট্রিক আর ব্রোঞ্জ পদক জিতে ইতিবাচকভাবেই আসর শেষ করল টমাস টুখেলের দল।
ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল করে মেসিকে দুটি রেকর্ডে টপকে গেছেন। চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের রেসে আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে দুই গোলে পেছনে ফেলেছেন এমবাপ্পে। দুজনেরই ছিল সমান ৮টি করে গোল, আর অ্যাসিস্টে মেসি এগিয়ে ছিলেন। ব্রোঞ্জ ম্যাচে এমবাপ্পে করলেন জোড়া গোল, আর একটি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। সব মিলিয়ে ১০ গোল আর চার অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি শীর্ষে উঠে গেছেন। গতকাল রাতের ফাইনালে মেসি জাদুকরী কিছু না করলে এমবাপ্পেই হয়তো পাচ্ছেন এবারের গোল্ডেন বুট। কাতার বিশ্বকাপেও ৮ গোল করে এমবাপ্পে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট, আর মেসি করেছিলেন ৭ গোল।
মেসির চেয়ে ৫৭ মিনিট বেশি খেলেছেন এমবাপ্পে। কাজেই মেসি যদি ফাইনালে ৯০ মিনিট বা তার বেশি সময় খেলে থাকেন তাহলে গোল্ডেন বুট জিততে হলে তাকে অন্তত দুই গোল ও একটি অ্যাসিস্ট কিংবা হ্যাটট্রিক করতে হবে।
ম্যাচ শেষে ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে নিয়ে ফক্স স্পোর্টসকে এমবাপ্পে বলেন, ‘লিও তো সবসময়ই গোল করে। আগামীকাল (রোববার রাতে) সে নিশ্চিতভাবেই গোল করবে। আমি আসলে প্রতি ম্যাচেই গোল করে দলকে সাহায্য করতে চাই। এটা সত্য যে যখন বিশ্বকাপে আপনি এতগুলো গোল করবেন তখন সেটা আপনাকে একটা উচ্চতায় নিয়ে যাবে, কিন্তু সেখানে আপনাকে যেতে হবে। আমি আসলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্কোরার হতে চাইনি, চেয়েছিলাম আগামীকালের ম্যাচটি (ফাইনাল) খেলতে।’
ফরাসি সুপারস্টার মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে এক বিশ্বকাপ আসরে ১০টি গোল করার কৃতিত্ব দেখালেন। তার আগের রেকর্ডটি হয়েছিল আজ থেকে ৫৬ বছর আগে (জার্মানির গার্ড মুলার, ১৯৭০ বিশ্বকাপ)।
এবারের বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ১৪ গোলে অবদান রাখলেন এমবাপ্পে (করেছেন ১০ গোল, অ্যাসিস্ট ৪ গোলে)। গত ৬০ বছরের মধ্যে এক আসরে এত বেশি গোলে অবদান রাখার নজির নেই আর কোনো খেলোয়াড়ের। বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল ছাড়া বাকি প্রতিটি পর্বেই গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এমবাপ্পে (গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড ৩২, রাউন্ড ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, তৃতীয় স্থান ও ফাইনাল)। তিনটি সেমিফাইনাল খেললেও তিনি কোনো গোল পাননি।
১০ গোলের থ্রিলারে ফ্রান্সকে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। ১৯৮২ সালের পর বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এত বেশি গোল হয়নি। সর্বশেষ ১৯৮২ সালে এল সালভাদরকে ১০-০ গোলে হারিয়েছিল হাঙ্গেরি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও যুগ্মভাবে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড গড়েছে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড ম্যাচ। আগের রেকর্ড ৯ গোল, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফ্রান্স। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানিকে ৬-৩ গোলে হারিয়েছিল ফ্রান্স। এছাড়া বিশ্বকাপে মাত্র চারটি ম্যাচে ১০ গোলের বেশি হয়েছে।
ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম সাত গোল করে আসর শেষ করেছেন। বিশ্বকাপের এক আসরে তার চেয়ে বেশি গোল নেই কোনো ইংলিশ খেলোয়াড়ের। বেলিংহামের সবগুলো গোলই এসেছে উন্মুক্ত খেলা থেকে। এখানে তিনি পেছনে ফেলেছেন গ্যারি লিনেকারকে (ছয় গোল, ১৯৮৬)।
চতুর্থ ইংলিশ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেছেন বুকায়ো সাকা। এর আগে হ্যারি কেইন (প্রতিপক্ষ পানামা, ২০১৮), গ্যারি লিনেকার (প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড, ১৯৮৬) ও জিওফ হার্স্টের (প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি, ১৯৬৬) আছে এ কীর্তি। ইংল্যান্ডের ডেকলান রাইস তৃতীয় মিনিটে গোল করার পর ১৮তম মিনিটে এজরি কনসার গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। প্রথম ২০ মিনিটের মধ্যে গোল করা ও অ্যাসিস্ট করা প্রথম ইংলিশ ফুটবলার এখন রাইস।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এমবাপ্পের দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করে দারুণ এক রেকর্ডের সঙ্গে নিজের নামটি লিখিয়েছেন ফ্রান্সের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসে। সব মিলিয়ে চলতি বিশ্বকাপে সাত গোলে অ্যাসিস্ট করেন বায়ার্ন মিউনিখে খেলা এ তারকা। এ পথে তিনি টপকে গেছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলেকে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ছয়টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন পেলে। ৬০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের কীর্তি গড়লেন ২৪ বছর বয়সী ওলিসে। চলতি বিশ্বকাপে ওলিসের পাস থেকে পাঁচটি গোল করেছেন এমবাপ্পে—যা ৬০ বছরের মধ্যে কোনো জুটির সেরা যুগলবন্দির রেকর্ড।
সেমিফাইনালের পর এবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হারল ফ্রান্স। ২০১০ সালের পর এ প্রথম বিশ্বকাপে টানা দুটি ম্যাচে হারল ‘লা ব্লুজ’রা। সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা আসরে তারা টানা দুই ম্যাচে হেরেছিল মেক্সিকো ও স্বাগতিকদের কাছে। এ হারের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের কোচ হিসেবে দিদিয়ের দেশমের ১৪ বছরের অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। এ সময় বিশ্বকাপে তার অধীনে ২৬টি ম্যাচ খেলে ফরাসিরা। এ পথে তিনি ভেঙে দিয়েছেন জার্মানির হেলমুট স্কনের রেকর্ড।
এছাড়া ৫৮ বছরের মধ্যে এ প্রথম প্রথমার্ধে চার গোল হজম করল ফ্রান্স। এর আগে ১৯৬৮ সালে ইউরোর বাছাইপর্বে যুগোস্লাভিয়ার কাছে প্রথমার্ধে চার গোল খেয়েছিল তারা।
অনেক রেকর্ডের মধ্যে আলাদাভাবে আলোতে এমবাপ্পের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটা, যা নিয়ে মেসির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে এমবাপ্পের। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার মধ্য দিয়ে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে টপকে যান মেসি। এরপর অস্ট্রিয়া ম্যাচে করেন দুটি গোল। জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষেও লক্ষ্যভেদ করেন মেসি। যদিও শেষ ফাইনালে মাঠে নামার আগে তিনি শীর্ষস্থান হারালেন দুরন্ত এমবাপ্পের কাছে। ২৭ বছর বয়সী সুপারস্টার করলেন ১০ গোল। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে হয়েছিলেন ‘ইয়াং প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার’। গত বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও মেসিকে প্রথম শিরোপা থেকে রুখতে পারেননি। কাতারে গোল্ডেন বুটজয়ী খেলোয়াড়টি এবারো গোল্ডেন বুট জয়ের কাছাকাছি। টানা তিন বিশ্বকাপে ঈর্ষণীয় পারফরম্যান্স দেখালেন তিনি।