আটলান্টায় মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড

ইতিহাসের ভারে ফাইনালে ওঠার লড়াই

সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর ড্রেসিংরুম থেকে ফিরতে ফিরতে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা গলা মিলিয়েছিলেন একটা গানে ‘মালভিনাসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, লিওর শেষ অধ্যায়ের জন্য’।

তিনটি শব্দবন্ধ, অথচ তার ভেতরে জমাট বাঁধা চার দশকের ইতিহাস, একটা যুদ্ধ, একজন স্বর্গীয় জাদুকর, আর একজন জীবিত কিংবদন্তির শেষ বিকালের আলো। আজ রাতে আটলান্টার আকাশের নিচে যখন আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি দাঁড়াবে তখন মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস নিছক ফুটবল ম্যাচের সাক্ষী হতে যাচ্ছে না। সেখানে রচিত হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন গোলার্ধের অহংকার, রক্তক্ষরণ আর ইতিহাসের অলিখিত যুদ্ধ। ফুটবলের ব্যাকরণ সেখানে তুচ্ছ, নন্দনতত্ত্ব সেখানে গৌণ, কারণ যখনই সাদা-আকাশি আর সাদা জার্সি দুটি চেনা আয়তক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন মাঠের চার কোনায় ফকল্যান্ডের ঠাণ্ডা বাতাস আর দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই আদিম ‘ঈশ্বরের হাতের ছায়া’ এসে ভর করে।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ কখনো নিছক ফুটবল ছিল না। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যাকে আর্জেন্টাইনরা ডাকে মালভিনাস নামে, ১৮৩৩ সাল থেকে ব্রিটিশ শাসনাধীন, কিন্তু আর্জেন্টিনার মানচিত্রে তা কখনো মুছে যায়নি। ১৯৮২ সালে জেনারেলদের শাসনাধীন আর্জেন্টিনা যখন সেই দ্বীপ দখলের চেষ্টা করেছিল, মার্গারেট থ্যাচারের ব্রিটেন তা মেনে নেয়নি। চুয়াত্তর দিনের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন আর ২৫৫ ব্রিটিশ সৈনিকের রক্তে ভিজেছিল বরফশীতল জল। চার বছর পর মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে দিয়েগো ম্যারাডোনা যখন হাত দিয়ে বল জালে জড়ালেন, সেটাকে ফকল্যান্ড প্রতিশোধের মঞ্চ বানিয়েছিলেন আর্জেন্টাইনরা। তারপর এল ‘শতাব্দীর সেরা গোল’, ছয়জন ইংলিশ খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত দৌড়। রণাঙ্গনে পরাজিত আর্জেন্টিনা সেদিন ফুটবল মাঠে খুঁজে নিয়েছিল হারানো মর্যাদা। আজও এ দ্বৈরথে কোনো ইংলিশ রেফারি আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনা করতে পারেন না। কোনো আর্জেন্টাইন রেফারি ইংল্যান্ডের ম্যাচ পরিচালনা করতে পারেননি। এত বছর পরও রেফারি নিয়োগে সেই ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রাখে ফিফা।

চব্বিশ বছরের নীরবতা ভেঙে বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার মুখোমুখি দুই দল। শেষবার ২০০২ সালে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি গোলে গ্রুপ পর্বে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। তারও আগে ১৯৯৮ সালের সেঁত-এতিয়েনে বেকহামের লাল কার্ডের পর ২-২ সমতার ম্যাচে টাইব্রেকারে জিতেছিল আর্জেন্টিনা; আর ১৯৮৬ সালে আজতেকায় রচিত হয়েছিল ‘ঈশ্বরের হাত’ ও শতাব্দীর সেরা গোলের মহাকাব্য। প্রতিটি সাক্ষাতে জন্ম নিয়েছে নতুন কিংবদন্তি। এবার সেই মঞ্চে হাজির থাকবেন লিওনেল মেসি। যার ক্যারিয়ারের বিস্তৃতি প্রায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা রেষারেষির শেষ পর্বের সমান দীর্ঘ। অথচ তিনি কখনো এ সাদা জার্সির মুখোমুখি হননি। দুইশর বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা মেসির কাছে ইংল্যান্ড এখনো অলিখিত অধ্যায়।

আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল পর্যন্ত আসার পথটা ছিল কাঁটা বিছানো দুর্গম গলি। যেখানে প্রতি বাঁকে ছিল পতনের হাতছানি। কেপ ভার্দে, মিসর কিংবা সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচগুলো কোনো শৈল্পিক ফুটবলের বিজ্ঞাপন ছিল না, বরং তা ছিল হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে লড়াইয়ের আর্তনাদ। এই আলবিসেলেস্তে দলটির মাঝে এখন আর সেই চিরচেনা লাতিন ছন্দ নেই, নেই পাসের পর পাসে প্রতিপক্ষকে সম্মোহিত করার জাদুকরী ঘোর। তবে যা আছে, তাকে ফুটবলীয় ভাষায় বলা যায় আদিম চারিত্রিক দৃঢ়তা, এক অদ্ভুত মিস্টিক। তারা পুরো ম্যাচ ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ভান করে, আর ঠিক আগ মুহূর্তে এক ঝটকায় খাদের কিনারা থেকে উঠে এসে মরণকামড় দেয়।

মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ আর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার নিজেদের সেরা ছন্দ থেকে অনেক দূরে, পারেদেস এবার প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। তবু এ দলটা জেতে, কারণ তাদের কাছে আছে অন্য এক অস্ত্র—বিশ্বাস, হৃদয়, আর শেষ মুহূর্তের অবিচল জেদ। কিন্তু সেমিতে জেতার জন্য সেটাই কি যথেষ্ট? উত্তরটা হয়তো স্কালোনি জানেন। জানেন বলেই কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ। অনুশীলনে স্কালোনি তাই তার চিরচেনা দর্শন থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। রদ্রিগো ডি পল, যিনি এতদিন ছিলেন আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের ইঞ্জিন, সেই বিশ্বস্ত সৈনিককে বেঞ্চে বসিয়ে যখন নিকোলাস ওটামেন্ডিকে নিয়ে পাঁচ ডিফেন্ডারের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তোলার মহড়া দেয়া হয়, তখন বোঝা যায় লাতিন অহংকার কতটা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এ আর্জেন্টিনা দলটির ডান প্রান্ত যেন বিক্ষত সীমানা। নাহুয়েল মলিনা কিংবা মন্তিয়েল, কেউই যেন প্রতিপক্ষের উইঙ্গারদের ঝড়ের সামনে টিকতে পারছেন না। আর সেই ক্ষতস্থান দেখেই ইংলিশ শিবিরের অ্যান্থনি গর্ডন কিংবা মার্কাস র‍্যাশফোর্ডরা দূর থেকে নিজেদের নখ ধারালো করছেন নিশ্চয়ই। স্কালোনি তাই রোমেরো আর লিসান্দ্রোর পাশে ওটামেন্ডির অভিজ্ঞতার পাহাড় দাঁড় করিয়ে নতুন কৌশলের নকশা আঁকছেন।

তবে এই সমস্ত রণকৌশল, সমস্ত ফর্মেশন আর সব জল্পনাকল্পনার ঊর্ধ্বে লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এ মহাতারকা তার অবিশ্বাস্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দুই শতাধিক ম্যাচ খেললেও থ্রি লায়ন্সের মুখোমুখি হননি কখনো। ইংলিশ পণ্ডিতেরা যখন তার মাঠে অলস হেঁটে বেড়ানোকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন, তখন তারা আসলে ভুলে যাচ্ছেন যে মেসি যখন মাঠে হাঁটেন, তখন তিনি আসলে দাবার বোর্ডে প্রতিপক্ষের চালগুলো পড়তে থাকেন। তিনি যখন জোন-১৪-তে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ান, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মনে যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়, তা কোনো ট্যাকটিকস দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

টমাস টুখেলের সামনেও এক জটিল ধাঁধা। মেসিকে থামানোর সবচেয়ে সহজ উত্তরটাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁদ। জেড স্পেন্সকে, নির্দিষ্টভাবে মেসির পেছনে লেলিয়ে দেয়া মানে রক্ষণের বাকি কাঠামোয় ফাটল তৈরি করা, কারণ আর্জেন্টিনা তাদের প্রতিটি আক্রমণ সাজায় মাঠের কেন্দ্রীয় অঞ্চল ঘিরে। সেই বিখ্যাত জোন ১৪, পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরের এলাকা, যেখানে মেসি প্রায় রাজত্ব করেন। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গত ম্যাচেও তার স্পর্শ ছিল ১০২ বার। হাঁটার ভান করেও তিনি কখনো খেলা থেকে দূরে সরে যান না।

আক্রমণে ইংল্যান্ডের ভরসা সেট-পিস। আর প্রান্ত ধরে দ্রুতগতির আক্রমণ, যেখানে বেলিংহাম আর কেইন নিয়মিত ফিনিশিং টাচ দেন কেন্দ্র থেকে। আর্জেন্টিনার দুর্বল ডান প্রান্তকে পুঁজি করে অ্যান্টনি গর্ডন বা মার্কাস র‍্যাশফোর্ডের গতি হতে পারে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র, বিশেষত মোলিনা বা মন্তিয়েলের মতো ক্লান্ত, ইনজুরি জর্জরিত ফুলব্যাকদের বিপক্ষে।

ইংল্যান্ডও আর্জেন্টিনার মতো ধুঁকতে ধুঁকতেই সেমিফাইনালে এসেছে। ছয়টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটিতে এক গোলের বেশি ব্যবধানে জিতেছে তারা। নকআউট পর্ব শুরুর পর থেকে কোনো ম্যাচেই এক গোলের বেশি ব্যবধান তৈরি করতে পারেনি। তেইশ বছর বয়সী বেলিংহাম যেন এ টুর্নামেন্টে ইতিহাস লিখছেন, পরপর দুই নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করে ম্যারাডোনার পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এ কীর্তি গড়েছেন তিনি। কেইন আর বেলিংহাম মিলে ইংল্যান্ডের ১৩ গোলের ১২টাই করেছেন, যা এক অর্থে দলের শক্তি, আবার তার দুর্বলতাও।

এছাড়া খেলার প্রতিটি কোণে লুকিয়ে থাকবে ছোট ছোট দ্বৈরথ। মাঝমাঠে ডেক্লান রাইস আর এনজো ফার্নান্দেজের লড়াইকে কেউ কেউ বলছেন লন্ডন ডার্বি। আর্সেনাল আর চেলসির দুই প্রায়-সমমূল্যের সাইনিং, একজন প্রতিরক্ষার প্রাচীর, আরেকজন আক্রমণভাগের চাবিকাঠি। রাইস অসুস্থতা কাটিয়ে কতটা ফিট, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে জুড বেলিংহামের বুটে। বেলিংহামের বক্স-টু-বক্স দৌড় আর কড়া আক্রমণের ক্ষমতা আর্জেন্টিনার ধীরগতির মাঝমাঠের জন্য এক মহাবিপদ সংকেত হতে পারে। লিয়ান্দ্রো পারেদেস কিংবা ম্যাক অ্যালিস্টার যদি বেলিংহামের উত্থান রুখতে না পারেন, তবে আটলান্টার মাঠ আর্জেন্টিনার বধ্যভূমি হয়ে উঠতে পারে। সামনের দিকে হ্যারি কেইনকে ঘিরে থাকবেন প্রিমিয়ার লিগের পরিচিত তিন আর্জেন্টাইন—এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও বিশেষ করে তার সাবেক টটেনহ্যাম সতীর্থ ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। একই জার্সিতে একসময় পাশাপাশি লড়া কেইন ও রোমেরো এবার দাঁড়াবেন পরস্পরের বিপরীতে। বন্ধুত্বের সেই পুরনো সুতো এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুনে পুড়বে। একই রকম এক চেনা লড়াইয়ের মুখোমুখি হবেন আর্জেন্টিনার তরুণ তুর্কি জুলিয়ান আলভারেজ, যার সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবেন তার ম্যানচেস্টার সিটির প্রাক্তন সতীর্থ জন স্টোনস, সঙ্গে মার্ক গুয়েহি। এ চেনা ও অচেনার দোলাচলেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হবে কোনো এক অমোঘ মুহূর্তে।

মাঠের এ নির্মম লড়াইয়ের সমান্তরালে গ্যালারিতে চলবে অন্য এক সুরের যুদ্ধ। উত্তর আমেরিকার এ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা যেন এক যাযাবর বেদুইন দলের মতো। যেখানেই যাচ্ছে, সেখানেই এক টুকরো বুয়েনস আইরেস তৈরি করছে। ম্যাচের আগের রাতে কোনো পার্ক বা স্কয়ার দখল করে বিশাল সব ব্যানার, ম্যারাডোনা আর মেসির জার্সির সমুদ্র, আর বারবিকিউয়ের ধোঁয়ার সঙ্গে ফ্লেয়ারের আলোয় তারা যে উন্মাদনা তৈরি করে, তা ইউরোপীয়দের চেনা ব্যাকরণের বাইরে। তাদের গলার আওয়াজ স্টেডিয়ামে এক বধির করে দেয়া পরিবেশের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ইংলিশ সমর্থকরা হয়তো অমন রঙিন উৎসব করে না, কিন্তু তাদের দলবদ্ধ গান, তাদের সেই বিখ্যাত সমবেত কণ্ঠস্বর যেকোনো প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরাতে বাধ্য। ম্যাচ শেষে আটলান্টার আকাশে হয়তো ওয়াসিসের ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ ধ্বনিত হবে ব্রিটিশদের গৌরবে, আর না হয় আর্জেন্টিনার ভক্তদের নতুন আরাধ্য গীতি ‘লা কুয়ার্তা এস্ত্রেয়া’ পুরো স্টেডিয়ামকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অলৌকিক আনন্দের বন্যায়।

স্কালোনি অবশ্য ম্যাচের আগে ইতিহাসের ভার হালকা করার চেষ্টা করেছেন, বলেছেন এটা নিছক একটা ফুটবল ম্যাচ, আর কিছু নয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে তা কখনো স্রেফ খেলা নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে ১৯৮২ সালের সেই ৭৪ দিনের যুদ্ধ, ফকল্যান্ডের সেই পাহাড়ি উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া তরুণ প্রাণের দীর্ঘশ্বাস। মাঠের খেলোয়াড়রা যতই বলুন না কেন এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ, কিন্তু ড্রেসিংরুমের বন্ধ দরজার ওপাশে যখন স্লোগান ওঠে ফকল্যান্ডের জন্য, ডিয়েগোর জন্য, তখন আর কোনো সংশয় থাকে না যে ম্যাচটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিশোধের মঞ্চ। সেমিফাইনালের এ মঞ্চ আর্জেন্টিনার জন্য ফেলে আসা গৌরব আর কষ্টের এক কোলাজ, আর ইংল্যান্ডের জন্য ১৯৬৬ সালের পর অধরা থাকা সেই সোনালি ট্রফির দিকে পা বাড়ানোর পরম পরীক্ষা।

আরও