ইউরোপসেরা স্পেনের আবারো বিশ্ব জয়ের হাতছানি

ফুটবলে নির্দিষ্ট পজিশনে মুন্সিয়ানা দেখানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের নাম জড়িয়ে আছে। ইতিহাসে সুন্দরতম ফুল-ব্যাক ব্রাজিলীয়দের সঙ্গেই যায়।

আবার অদম্য সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের আঁতুড়ঘর যেন ইতালি। দিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি ১০ নম্বর জার্সিটাকে বিখ্যাত করে রেখেছেন। এ পজিশনটায় যেন আর্জেন্টাইনদেরই বেশি মানায়। এমনকি তাদের রাস্তার ফুটবলাররাও যেন বাতাসে বল ভাসিয়ে জাদু দেখাতে অভ্যস্ত। এরপর সেন্ট্রাল মিডফল্ড। ২০১০ সালে গোটা বিশ্বকে বিমোহিত করে প্রথমবারের মতো বিশ্ব জয় করে স্পেন। ‘লা রোজা’দের সেই সাফল্যের কারিগর ছিলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভিরা এ পজিশনের কিংবদন্তি। সেই থেকে এ পজিশন যেন স্পেনের সঙ্গেই মানানসই। আরেকবার কি সেন্ট্রাল মিডফিল্ড হয়ে উঠবে স্পেনের বিশ্ব জয়ের মূল অস্ত্র?

স্পেনের সোনালি প্রজন্ম ২০০৮ ও ২০১২ সালে টানা দুটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয় করে। সেই দলটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল মিডফিল্ড। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের জয়সূচক গোলটি করেছিলেন ইনিয়েস্তা, যিনি ছিলেন একজন চৌকস অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।

ইনিয়েস্তা ও জাভি ছাড়াও জাভি আলোনসো, সার্জিও বুসকেটস, সান্তি কাজোরলা, সেস ফ্যাব্রেগাস, থিয়াগো আলকানতারা, কোকে, দানি পারেজোরা নিকট অতীতে স্পেনের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, প্লেমেকার কিংবা অ্যাঙ্করের পজিশনগুলো রাঙিয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন খেলাটির গ্রেট হিসেবে নিজেদের নাম অমর করে রেখেছেন। তবে সাপ্লাই চেইন ফুরিয়ে যায়নি এখনো। বর্তমান হেড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাতে রয়েছে একঝাঁক তরুণ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, যারা পূর্বসূরিদের শূন্যতা পূরণে মরিয়া ও সেই সঙ্গে যোগ্যও বটে। সফলভাবে ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এবার তাদের চোখ ফিফা বিশ্বকাপে। উত্তর আমেরিকার এ আসরে অন্যতম ফেভারিট লামিনে ইয়ামাল ও রদ্রিদের স্পেন।

স্পেনের কেন্দ্রে থাকবেন অধিনায়ক রদ্রি। ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী ও ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার ২০২৪’ পুরস্কারে রানারআপ রদ্রি স্পেনের আক্রমণের সুরটা তুলে দেবেন। মাদ্রিদে জন্মগ্রহণ করা এ তারকা হাঁটুর চোটের কারণে প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে কাটালেও আবার স্পেনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ফিরেছেন। তার পাশাপাশি পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও মার্টিন জুবিমেন্দি এবারের বিশ্বকাপে দে লা ফুয়েন্তের আক্রমণভাগের সেনানী। তাদের পাশাপাশি মিডফিল্ড ও উইং পজিশনে রয়েছেন আরো একঝাঁক অতন্দ্র প্রহরী—গাভি, পাওলো বারিওস ও গাবরি ভেইগা। তারা প্রত্যেকেই এ টুর্নামেন্ট কিংবা ভবিষ্যতে স্পেনের ঝাণ্ডা বহনে পুরোপুরি প্রস্তুত।

ধারাবাহিকভাবে স্পেনকে সেরাদের কাতারে রাখা এত এত মিডফিল্ডার তৈরি হওয়ার পেছনে রহস্যটা আসলে কী? ফরাসি ক্লাব তুলুজের হেড কোচ ও বার্সেলোনার একাডেমির সঙ্গে এক সময় যুক্ত থাকা কার্লস মার্টিনেজ ফিফাকে বলেছেন, স্পেনের ফুটবলের বৃহত্তর দর্শনই মূলত মানসম্মত মিডফিল্ডার তৈরি করে। তার কথায়, ‘আমি দেখেছি স্পেনের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে মিডফিল্ডাররা খেলাটি অন্যদের চেয়ে একটু আলাদাভাবে বোঝেন।’

তিনি মনে করেন, এটা গ্রাসরুট থেকেই শুরু হয়। এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে বলের প্রতি স্পেনের মিডফিল্ডারদের সহজাতভাবেই আলাদা অনুভূতি কাজ করে। তিনি বলেন, ‘এটা সত্য যে ট্রেনিংটাই মূল। আপনি এটা কেন করছেন, এ উত্তরটি জানা থাকলে কাজটি আপনি ভালোভাবে করতে পারবেন। এখানে কেন প্রশ্নটির ওপরই বেশি জোর থাকে। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা দলটির প্রাণ। সবকিছুই তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ বোঝাপড়াটা অবিরত চলতে থাকে: ড্রিল, পজিশনাল খেলা, প্রোগ্রেশন ড্রিল ও ম্যাচ পরিস্থিতি। এগুলো চাহিদা অনুসারে নিত্য সমন্বয় করা হয়।’

টেকনিক ও ট্যাকটিকসের মধ্যে কোনো বিভাজন লাইন নেই বলে মনে করেন মার্টিনেজ। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ভালো পজিশনে থাকেন, আপনার প্রথম টাচে উন্নতি হবে, আপনার পাসিং হবে পরিষ্কার এবং পরিশেষে আপনার কাজটি হবে সুনিপুণ।’

ফারমিন চোটে পড়ে সাইডলাইনের বাইরে। এর পরও কোচ দে লা ফুয়েন্তের কোনো চিন্তা নেই। কেননা তার ভাণ্ডারে আছেন রদ্রি, পেদ্রি, জুবিমেন্দি, ফাবিয়ান ও মিকেল মেরিনোর মতো ‘অস্ত্রভাণ্ডার’। তাদের মধ্যে যারা ফিট থাকবেন তারা যোগ দেবেন অ্যালেক্স বায়েনা, গাভি, মার্কোস লরেন্তের সঙ্গে।

আইবেরিয়ান দলটির মিডফিল্ডে শক্তির প্রাচুর্য থাকলেও কোচকে পড়তে হয় মধুর সমস্যায়। কাকে রেখে কাকে নেবেন? মিডফিল্ডার তৈরি করাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়, বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে সেরাদের বাছাই করায়ও কোচকে পড়তে হয় কঠিন চ্যালেঞ্জে। বিভাগটিতে সেরা খেলোয়াড় বাছাই করতে না পারলে সংকটও আছে। স্পেনের নিকট অতীতের সাফল্যের কারিগর মিডফিল্ডাররা। জাভি, ইনিয়েস্তাদের গড়া সেই উত্তরাধিকার বয়ে চলেছেন বর্তমান প্রজন্ম। এবারের বিশ্বকাপেও দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসাতে পারেন রদ্রি, পেদ্রি, জুবিমেন্দিরা।

আরও