পৃথিবীর যেসব দুর্গম এলাকা থেকে দেখা হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল

অ্যাসেনশন দ্বীপ থেকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত ত্রিস্তান দা কুনহা। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রত্যন্ত জনবসতিপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ। সেখানে কোনো বিমানবন্দর বা রানওয়ে নেই। তাই দ্বীপটিতে কেবল নৌকার মাধ্যমেই যাওয়া সম্ভব। ত্রিস্তানের মাত্র ২০০ জনের কিছু বেশি স্থায়ী বাসিন্দা বাড়ি থেকেই বিশ্বকাপ উপভোগ করেন, কারণ দ্বীপের একমাত্র বার ‘‌অ্যালবাট্রস বার’ রাত ৯টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়, সাধারণত এ সময়ে খেলা শুরুই হয় না।

ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রীড়া ইভেন্ট। কাতারে ২০২২ সালের ফাইনাল ম্যাচটি আনুমানিক দেড়শ কোটি মানুষ দেখেছিল, আর নিউ জার্সিতে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি সেই সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাবে ধারণা করা হচ্ছে।

যখন লন্ডন, প্যারিস এবং বুয়েন্স আয়ার্সের মতো ফুটবলের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণকেন্দ্রগুলোয় মানুষ বন্ধুদের বাড়ি, বার এবং উন্মুক্ত মাঠের স্ক্রিনিংয়ে ভিড় জমাবে, তখন এ রোমাঞ্চকর লড়াই এমন কিছু জায়গাতেও উপভোগ করা হবে যা কেউ সহজে ভাবতেও পারবে না। এমন কিছু মানুষ রয়েছেন যারা বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রান্ত থেকে খেলা দেখবেন।

এমন একটি নির্জন জায়গা হলো অ্যান্টার্কটিকার রথেরা রিসার্চ স্টেশন। সেখানে ৫৪ দশমিক ৮ লাখ বর্গমাইলের মধ্যে ১ হাজারের কম মানুষ বাস করেন। আর মূল স্টেশনে শীতকাল পার করছেন মাত্র ২৬ জন, যারা মাসের পর মাস ঘুটঘুটে অন্ধকারে জীবন কাটাচ্ছেন। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ তাদের জন্য এক দারুণ সঞ্জীবনী হয়ে উঠেছে। যারা খেলা দেখার জন্য একটি প্রজেক্টর এবং টিভির সামনে জড়ো হন।

তাদের কেউ কেউ টুর্নামেন্টের প্রায় প্রতিটি ম্যাচই দেখেছেন, তবে ব্রিটিশ ঘাঁটির বেশিরভাগ মানুষ মূলত স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচগুলোর সময় বেশি ভিড় জমান। বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচের উপলক্ষে রথেরা ঘাঁটিতে এরই মধ্যে পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। এদিন তারা রঙিন পতাকা টাঙান এবং ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ পাবের খাবার তৈরি করেন।

এমন আরেকটি জায়গা হলো অ্যাসেনশন আইল্যান্ড। এটি দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের একটি আগ্নেয় দ্বীপ—যা আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি ছোট্ট বিন্দুর মতো। এটি উত্তর-পূর্বে লাইবেরিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ১ হাজার মাইল দূরে এবং পশ্চিমে ব্রাজিলের চেয়েও বেশি দূরত্বে অবস্থিত। দ্বীপটিতে একটি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স বেস রয়েছে এবং এর অনুর্বর, লাল ও আগ্নেয় ভূপ্রকৃতির কারণে একে মিড-আটলান্টিকের মঙ্গল গ্রহ বলে ডাকা হয়। এখানকার ৮০০ থেকে ১ হাজার বাসিন্দার মধ্যে ফুটবলপ্রেমীদের একটি ছোট সম্প্রদায় রয়েছে। তাদের অনেকে একসঙ্গে খেলা দেখার জন্য বাইরে বার বা নাফি কমপ্লেক্সে যায়। এখানকার বাসিন্দারা মূল খেলার ভেন্যু থেকে ৫ হাজার মাইলেরও বেশি দূরে বসে বিশ্বকাপ ফাইনালের একটি সরাসরি স্ক্রিনিং আয়োজন করতে যাচ্ছে। তবে এটিই সবচেয়ে দুর্গম এলাকা নয়।

অ্যাসেনশন দ্বীপ থেকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত ত্রিস্তান দা কুনহা। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রত্যন্ত জনবসতিপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ। সেখানে কোনো বিমানবন্দর বা রানওয়ে নেই। তাই দ্বীপটিতে কেবল নৌকার মাধ্যমেই যাওয়া সম্ভব। ত্রিস্তানের মাত্র ২০০ জনের কিছু বেশি স্থায়ী বাসিন্দা বাড়ি থেকেই বিশ্বকাপ উপভোগ করেন, কারণ দ্বীপের একমাত্র বার ‘‌অ্যালবাট্রস বার’ রাত ৯টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়, সাধারণত এ সময়ে খেলা শুরুই হয় না।

ত্রিস্তানের ফুটবলপ্রেমীরা ফাইনালের দিন অ্যালবাট্রস বারে জড়ো হয়ে খেলা দেখবেন। তবে সম্প্রতি একটি শক্তিশালী ঝড় হ্যারিকেনের গতিতে দ্বীপে আঘাত হেনেছিল, যার ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের কাজ চলছে। এছাড়া ব্রিটিশ ফোর্সেস ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের স্ট্রিম নিয়ে কিছু দুশ্চিন্তা রয়েছে, কারণ এটি অনেক সময় ভুল মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এমন আরেকটি জায়গা হলো নরওয়ের দ্বীপপুঞ্জ স্যালবার্ডের লংইয়ারবাইয়েন। এটি বিশ্বের উত্তরতম জনবসতিগুলোর একটি। স্যালবার্ড মূলত ‘‌গ্লোবাল সিড ভল্ট’ (বিশ্ব বীজ ব্যাংক)-এর জন্য পরিচিত, যা কোনো মহাবিপর্যয়ের ক্ষেত্রে পৃথিবীকে নতুন করে সবুজ করে তোলার জন্য ফসলের বীজের একটি ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হয়েছে। লংইয়ারবাইয়েনের 'তিও মনচোস' নামের একটি রেস্তোরাঁ ম্যাচগুলো বড় পর্দায় দেখাচ্ছে, যেখানে ক্রমেই মানুষের ভিড় বাড়ছে এবং ইংল্যান্ডের কাছে নরওয়ের পরাজয়ের ম্যাচটি প্রায় ৪০০ জন মানুষ একসঙ্গে সেখানে বসে উপভোগ করেছেন।

কিরিবাতি প্রজাতন্ত্র মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের ২১টি স্থায়ী বসতিপূর্ণ দ্বীপ বা প্রবালপ্রাচীর (অ্যাটল) নিয়ে গঠিত এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম দর্শনার্থী যাওয়া শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা দেশগুলোর অন্যতম, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র জোয়ারের কারণে এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। ফুটবল মাঠের কথা বললে, কিরিবাতি এমন অল্প কয়েকটি সার্বভৌম দেশের একটি যা ফিফার সদস্য নয়, যদিও এটি ওশেনিয়া ফুটবল কনফেডারেশনের একটি সহযোগী সদস্য। ফিফার আওতাভুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও, দ্বীপের মানুষ ফুটবলের প্রতি দারুণ আগ্রহ রয়েছে। তারাও নানা আয়োজনের মাধ্যমে এ ম্যাচটি উপভোগ করবেন।

আরও