পেনাল্টিতে অ্যাভারেজেরও নিচে মেসি

বিকল্প ভাববেন স্কালোনি?

লিওনেল মেসি যেন বয়সকে অস্বীকার করেই খেলছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সেও তিনি একের পর এক রেকর্ড ভাঙছেন, গোল করছেন, অ্যাসিস্ট করছেন, ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন।

শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনাকে অবিশ্বাস্যভাবে জয়ের পথে ফিরিয়েছেন তিনিই। একটি অ্যাসিস্ট, একটি গোল—দুটোই এসেছে সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে। তবু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল না তার আরেকটি রেকর্ড কিংবা সেই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন; বরং ছিল একটি ব্যর্থ পেনাল্টি। সেটিই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বকাপের বাকি পথেও কি আর্জেন্টিনার পেনাল্টি নেবেন মেসি, নাকি কোচ লিওনেল স্কালোনির বিকল্প ভাবার সময় এসে গেছে?

ম্যাচের ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ৫ মিনিট পর নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে বক্সে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টি দেন। এটি ছিল ম্যাচে ফেরার আদর্শ সুযোগ। কিন্তু মেসির নেয়া শটটি খুব বেশি কোনায় ছিল না, উচ্চতাও ছিল গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের নাগালের মধ্যে। শোবেইর সঠিক দিকে ঝাঁপিয়ে বল ঠেকিয়ে দেন। সেই মুহূর্তে ম্যাচের মোড় পুরোপুরি মিসরের দিকে ঘুরে যায়। পরে মিসর আরো একটি গোল করে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, ৮৩ মিনিটে মেসি এবং যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় প্রত্যাবর্তন উপহার দেন। কিন্তু ম্যাচের গল্প অন্যরকমও হতে পারত। পেনাল্টিটি গোল হলে হয়তো আর্জেন্টিনাকে শেষ ১৫ মিনিটে অলৌকিক কীর্তি গড়তে হতো না।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দল এত দেরিতে দুই গোল পিছিয়ে থেকেও অতিরিক্ত সময় ছাড়াই জয়ের নজির আগে ছিল না। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে মেসির দল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেছে—যদি সেই প্রত্যাবর্তন না ঘটত, তাহলে কি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতো মেসির ব্যর্থ পেনাল্টিই?

এ বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। এর আগে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও স্পট কিক থেকে গোল করতে পারেননি তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেক বাদে একই আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম ফুটবলার হয়ে গেছেন মেসি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তিনি আটটি পেনাল্টি নিয়েছেন। গোল করেছেন চারটি, তিনটি ঠেকিয়েছেন গোলরক্ষক এবং একটি বাইরে মেরেছেন। অর্থাৎ তার সফলতার হার মাত্র ৫০ শতাংশ। যে ফুটবলার ওপেন প্লেতে প্রায় অতিমানবীয়, তার জন্য এ পরিসংখ্যান বিস্ময়কর।

শুধু বিশ্বকাপ নয়, পুরো ক্যারিয়ারের পেনাল্টির হিসাবও মেসির ক্ষেত্রে খুব উজ্জ্বল নয়। বার্সেলোনা, প্যারিস সেন্ট জার্মেই, ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি নিয়েছেন ১৪৮টি পেনাল্টি। গোল করেছেন ১১৪টি। সফলতার হার ৭৭ শতাংশ। সংখ্যাটি শুনতে খুব খারাপ না লাগলেও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আধুনিক ফুটবলে একটি পেনাল্টির গড় সফলতার হার প্রায় ৭৯ শতাংশ, অর্থাৎ পরিসংখ্যান অনুযায়ী একজন গড় মানের পেনাল্টি টেকারও মেসির চেয়ে সামান্য বেশি সফল হওয়ার কথা।

এখানেই সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর্জেন্টিনা দলে কি মেসির চেয়ে ভালো পেনাল্টি টেকার আছেন? উত্তরটা হলো আছেন, একজন নন, একাধিক। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ, মেজর লিগ সকার, আর্জেন্টাইন প্রিমেরা ডিভিশন ও জাতীয় দলের প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ মিলিয়ে বর্তমান আর্জেন্টিনা স্কোয়াডের মধ্যে অন্তত ১০টি পেনাল্টি নেয়া খেলোয়াড়দের সফলতার হারে শীর্ষে রয়েছেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তার সফলতার হার ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ দুজনেরই সফলতা ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ। হুলিয়ান আলভারেজের ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নিকো গনসালেসের ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ তালিকায় মেসি মাত্র ষষ্ঠ, ৭৭ শতাংশ সফলতা নিয়ে। তার নিচে রয়েছেন রদ্রিগো দে পল, লাউতারো মার্টিনেজ ও থিয়াগো আলমাদা।

তবে সংখ্যাই সব কথা বলে না। বাস্তবতা হলো, জাতীয় দলের হয়ে পেনাল্টি নেয়ার অভিজ্ঞতায় মেসির ধারেকাছেও নেই তার সতীর্থরা। মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ৩০টির বেশি পেনাল্টি নিয়েছেন, যেখানে বর্তমান স্কোয়াডের অন্য সবাই মিলে নিয়েছেন হাতেগোনা কয়েকটি। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনালের প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে পেনাল্টি নেয়ার অভিজ্ঞতাও মূলত তারই। পারেদেস, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো কিংবা আলভারেজ ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত পেনাল্টি নিলেও বিশ্বকাপের সেই মানসিক চাপ তারা এখনো অনুভব করেননি। তাই শুধু শতাংশের হিসাব দেখেই স্কালোনি সিদ্ধান্ত নেবেন, এমনটাও বলা যায় না।

তবু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিটি মিস করা পেনাল্টি আর্জেন্টিনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দল জিতেছে, মিসরের বিপক্ষেও শেষ পর্যন্ত অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছে। কিন্তু সামনে যদি প্রতিপক্ষ হয় স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা ব্রাজিল, তাহলে হয়তো দ্বিতীয় সুযোগ মিলবে না। একটি ব্যর্থ পেনাল্টিই শেষ করে দিতে পারে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন।

মেসি এখনো আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ম্যাচজয়ী অস্ত্র। এ বিশ্বকাপে তিনি গোল করছেন, অ্যাসিস্ট করছেন, রেকর্ড ভাঙছেন এবং অসম্ভবকে সম্ভব করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে পরিসংখ্যান বলছে, ১২ গজ থেকে তিনি আর পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নন। ফলে স্কালোনির সামনে হয়তো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কঠিন কৌশলগত সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। তিনি কি আবেগ, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের প্রতীক মেসির হাতেই পেনাল্টির দায়িত্ব রাখবেন, নাকি পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে পারেদেস, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা হুলিয়ান আলভারেজের মতো আরো সফল কোনো পেনাল্টি টেকারের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দেবেন? অপটা অ্যানালিস্ট অবলম্বনে

আরও