বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ যখন ইংল্যান্ড, তখন ম্যাচটি আর দশটি ম্যাচের মতো নয়। দুই দলের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ, বিশ্বকাপের মঞ্চ এবং ফাইনালে ওঠার হাতছানি সব মিলিয়ে ম্যাচটির গুরুত্ব অনেক বেশি। তার ওপর সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ছকে মাঠে নামার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না লিওনেল স্কালোনি। তাই ফাইনালে ওঠার লড়াই সামনে রেখে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন আর্জেন্টিনা কোচ। সোমবারের অনুশীলনের একটি বড় অংশে তিনি পাঁচ ডিফেন্ডারের ৫-৩-২ ছক পরীক্ষা করেছেন।
কানসাস সিটিতে অনুষ্ঠিত অনুশীলনে রদ্রিগো ডি পলের জায়গায় অভিজ্ঞ সেন্টারব্যাক নিকোলাস ওটামেন্দিকে অন্তর্ভুক্ত করেন স্কালোনি। এর ফলে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে তিনজন সেন্টারব্যাকের সঙ্গে দুই পাশে দুই উইংব্যাক নিয়ে পাঁচ সদস্যের রক্ষণ গড়ে ওঠে। যদিও পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক ম্যাচ অনুশীলন হয়নি, বরং খেলোয়াড়দের কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন কৌশলগত অনুশীলন করানো হয়েছে। তবু সেই অনুশীলন থেকেই ইংল্যান্ড ম্যাচ ঘিরে স্কালোনির সম্ভাব্য পরিকল্পনার কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে।
বিশ্বকাপের শুরুতে স্কালোনির পরিকল্পনা ছিল, মিসরের বিপক্ষে যারা শুরুর একাদশে ফিরেছিলেন, টুর্নামেন্টের বাকি অংশেও মূলত সেই দলটির ওপর ভরসা রাখা। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সামগ্রিক পারফরম্যান্স তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে জয় এলেও বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সেটিই ছিল আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বিবর্ণ পারফরম্যান্স। দলটির খেলায় গতি, সৃজনশীলতা ও আক্রমণাত্মক ধার—সবকিছুরই ঘাটতি ছিল। ব্রিল এমবোলোর লাল কার্ডের আগে পর্যন্ত নিয়মিত গোলের সুযোগ তৈরি করতেও হিমশিম খেয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাই শুধু খেলোয়াড় পরিবর্তন নয়, পুরো কাঠামোতেই পরিবর্তন আনার কথা ভাবছেন স্কালোনি। পাঁচ ডিফেন্ডারের ছকটি তার কাছে একেবারে নতুন নয়। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য এই কৌশল নিয়ে কাজ করেছেন আর্জেন্টিনা কোচ। এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইংল্যান্ড এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে। টুখেলের দল সেট পিসে বিপজ্জনক, দুই প্রান্ত দিয়ে দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলতে সক্ষম এবং আক্রমণের শেষ পর্যায়ে জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইনের মতো খেলোয়াড়রা মাঝখান দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ঢুকে পড়েন। ইংল্যান্ডের এই শক্তির জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেই রক্ষণে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় রাখতে চাইছেন স্কালোনি।
পাঁচ ডিফেন্ডারের ছকে ডান প্রান্তে শুরুতে অনুশীলন করেন নাহুয়েল মোলিনা। তবে চলতি বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স ধারাবাহিক নয়। কখনো আক্রমণে কার্যকর হলেও রক্ষণে তার অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুশীলনের পরের অংশে মোলিনার জায়গায় গঞ্জালো মন্তিয়েল ও সিমিওনেকে ব্যবহার করেন স্কালোনি।
এই ভূমিকায় জিউলিয়ানো সিমিওনেকেই সম্ভবত সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হলেও তার রক্ষণে নেমে সহায়তা করার ক্ষমতা, গতি এবং পুরো ম্যাচজুড়ে দৌড়ানোর সামর্থ্য তাকে উইংব্যাক পজিশনের জন্য উপযোগী করে তুলেছে। একই সঙ্গে আক্রমণে ওঠার সময় তিনি নিয়মিত বিকল্প তৈরি করতে পারেন। ইংল্যান্ডের শক্তিশালী বাঁ প্রান্ত সামলানোর পাশাপাশি পাল্টা আক্রমণে কার্যকর হওয়ার জন্য সিমিওনেকে ব্যবহার করার সম্ভাবনাও তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাঁ প্রান্তেও একই ধরনের পরীক্ষা চালিয়েছেন স্কালোনি। শুরুতে ছিলেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। পরে তার জায়গায় নিকোলাস গঞ্জালেসকে নামানো হয়। গঞ্জালেস মূলত আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হলেও উইংব্যাক হিসেবে খেলার প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য তার রয়েছে। আক্রমণে গতি, বল ছাড়াই জায়গা তৈরি করা এবং রক্ষণে ফিরে প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার সামর্থ্যের কারণে তাকে বাঁ প্রান্তের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
অনুশীলনে রক্ষণভাগে পরিবর্তন হলেও মধ্যমাঠের মূল কাঠামো অনেকটাই অপরিবর্তিত ছিল। লিয়ান্দ্রো পারেদেস, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার পুরো সময়ই অনুশীলনের অংশ ছিলেন। মিসর ম্যাচের আগে একাদশে ফেরার পর থেকে পারেদেস আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা পারফরমার। বল নিয়ন্ত্রণ, খেলার গতি নির্ধারণ এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে বল সরবরাহে তার ভূমিকা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টার এখনো নিজেদের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি। তা সত্ত্বেও শুরুর একাদশে থাকার দৌড়ে তারা এগিয়ে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাক অ্যালিস্টারের গোল এবং তার প্রতি কোচিং স্টাফের আস্থা তাকে একাদশে রাখার সম্ভাবনা আরও বাড়িয়েছে। তবে এনজোর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠে তিনি প্রত্যাশিত প্রভাব রাখতে পারেননি।
অনুশীলনে পালাসিওসকেও আবার দেখা গেছে। বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচগুলোয় তিনি উল্লেখযোগ্য সময় খেলেছিলেন। লিয়ান্দ্রো পারেদেস পেশির চোট থেকে সেরে ওঠার সময় পালাসিওসের পারফরম্যান্স কোচিং স্টাফকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি প্রায় উপেক্ষিত। এমনকি জর্ডানের বিপক্ষে যে অল্প সময় খেলেছিলেন, সেখানেও তাকে নিজের স্বাভাবিক মধ্যমাঠের জায়গার পরিবর্তে ডানদিকে খেলানো হয়েছিল।
আক্রমণভাগে প্রত্যাশিতভাবেই অধিনায়ক লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ। মেসি চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা। আর সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ ডান পায়ের শটে গোল করে দলকে সেমিফাইনালে তোলার অন্যতম নায়ক আলভারেজ। স্কালোনি ৫-৩-২ ছক বেছে নিলে এই দুজনই সামনে জুটি বাঁধবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাঁচ ডিফেন্ডারের ছক বাস্তবায়িত হলে একাদশে জায়গা হারানোর সবচেয়ে বড় শঙ্কায় আছেন রদ্রিগো ডি পল। স্কালোনি যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেও চলতি বিশ্বকাপে তিনি নিজের সেরা ছন্দে নেই। বিশেষ করে পারেদেস একাদশে ফেরার পর এবং দল ৪-৪-২ ছকে খেলতে শুরু করার পর দি পলকে ডান প্রান্তে সীমাবদ্ধ ভূমিকায় দেখা গেছে। সেখানে তার প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে।
টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচেই ডি পলকে বদলি করা হয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ, যেখানে তিনি বিশ্বকাপে নিজের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স করেছিলেন। এরপর থেকে তার ছন্দ ক্রমেই নিচের দিকে নেমেছে। ফলে রক্ষণে ওটামেন্দিকে যোগ করতে হলে ডি পলকেই একাদশ থেকে বাদ দেয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনা কিছুটা রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেলেছিল। তবে সেটি খেলোয়াড় নির্বাচনের চেয়ে বেশি ফুটে উঠেছিল তাদের খেলার ধরনে। দলটি ঝুঁকি নিতে চায়নি, ধীরগতিতে বল চালিয়েছে এবং আক্রমণে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় ওঠায়নি। ফলে আর্জেন্টিনার ফুটবল হয়ে উঠেছিল ধীর, অনুমানযোগ্য এবং সৃজনশীলতাহীন। এমবোলোর লাল কার্ডের আগে পর্যন্ত সুইস রক্ষণ ভাঙার মতো ধারাবাহিক সুযোগও তৈরি করতে পারেনি স্কালোনির দল।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্কালোনি আরো রক্ষণাত্মক কাঠামো বেছে নিলেও একই ধরনের নিষ্প্রভ ফুটবল যেন না হয়, সেটিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। পাঁচ ডিফেন্ডারের ছকে উইংব্যাকদের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিচে নেমে রক্ষণে সহায়তা করার পাশাপাশি বল দখলে থাকলে দ্রুত সামনে উঠে আক্রমণের প্রস্থ বাড়াবেন। সেটি ঠিকমতো না হলে মেসি ও আলভারেজ সামনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
অবশ্য ৫-৩-২ এখনো স্কালোনির একমাত্র পরিকল্পনা নয়। তিনি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত ৪-৪-২ ছকেও থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে কাঠামো না বদলে কয়েকটি নির্দিষ্ট পজিশনে পরিবর্তন আনা হতে পারে। সেই পরিকল্পনায় নিকোলাস গঞ্জালেসের শুরুর একাদশে ফেরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
গঞ্জালেসকে বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডার হিসেবে নয়, মধ্যমাঠের খেলোয়াড় হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তিনি ডি পলের জায়গায় খেললে এনজো ফার্নান্দেজকে ডানদিকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। আবার এনজোকেই একাদশ থেকে বাদ দিয়ে গঞ্জালেসকে নেয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশ্বকাপে এনজোর পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনার দুর্বল জায়গাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের জায়গাতেও গঞ্জালেসকে ভাবা যেতে পারে। তবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাক অ্যালিস্টারের গোল এবং কোচিং স্টাফের কাছে তার গুরুত্ব বিবেচনায় এই সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তাই ৪-৪-২ বজায় থাকলে ডি পল বা এনজোর যেকোনো একজনের জায়গায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি।