২০১৮ সালে তরুণ কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আতোয়াঁ গ্রিজম্যানদের হাত ধরে ফ্রান্স জিতে নেয় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। গতবার হাতছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়েও ছোঁয়া হয়নি সোনালি ট্রফিটা। এমবাপ্পের হাত থেকে এক অর্থে ট্রফিটা কেড়েই নিয়ে যান লিওনেল মেসিরা। টানা দুই আসরে ঝড় তোলা ফরাসিরা এবার আরো পরিণত ও শাণিত। তাই দেশমের দলকে ঘিরে জেগেছে তৃতীয় শিরোপার আশা।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় এবারের আসরে ফ্রান্স ‘আই’ গ্রুপে খেলবে আফ্রিকান দল সেনেগাল, ইউরোপের নরওয়ে আর এশিয়ার দল ইরাকের বিপক্ষে। ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে বাছাইপর্বে প্রতিটি দলের বিপক্ষে দাপট দেখিয়েছে। এছাড়া আদালতের রায়ে ‘আফকন’ শিরোপা হারানো সেনেগালকে সামনে পেলেই পুরনো স্মৃতি জেগে উঠবে দেশমের মনে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল ওই আসরের নবাগত দল সেনেগাল। বর্তমান সেনেগাল দলটিও বেশ শক্তিশালী, যার আক্রমণভাগের নেতা সাদিও মানে। ফ্রান্সকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্তি প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে সেনেগালের।
গ্রুপের আরেক দল ইরাক। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলা ইরাকিরা বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে ৪০ বছর পর। বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তনটা স্মরণীয় করে রাখতে চাইবে দলটি। এ চারটি দল ট্যাকটিক্যালি ভিন্ন ঘরানার ফুটবল খেলে। কাজেই এ গ্রুপে দুর্দান্ত লড়াইয়ের আভাস মিলছে। তারকায় ঠাসা ফ্রান্স দলটি ছন্দে থাকলে প্রতিপক্ষ স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। এমন বড় আসরের জন্য দলটির কাঠামো বেশ মানানসই। এমবাপ্পে বর্তমানে শীর্ষ তিন-চার সুপারস্টারের একজন। বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী ওসমান দেম্বেলে আছেন এ দলে। দেশমের দলে আছেন আরো একঝাঁক তারকা, যাদের বেশির ভাগই খেলেন প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ক্লাবে। সদ্যই টানা দ্বিতীয়বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতেছে পিএসজি। তাই দুর্দান্ত ফর্ম নিয়েই বিশ্বকাপে যাচ্ছেন ফরাসিরা।
বর্তমান ফর্ম আর গতবারের লড়াইয়ের স্মৃতি প্রেরণা দেবে ফ্রান্সকে। লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও এমবাপ্পের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ম্যাচে ফিরে আসে ফ্রান্স। আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে ১১৮তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ম্যাচে ৩-৩ সমতা আনেন এমবাপ্পে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার অপেক্ষা। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে শেষ মিনিটের একেবারে শেষ দিকে কোলো মুয়ানি ফাঁকা পেয়ে যান আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমি মার্টিনেজকে। সামনের ফাঁকা জায়গা কমিয়ে এনে কোলো মুয়ানিকে বাম দিকে শট নিতে প্রলুব্ধ করেন তিনি। তাতেও লাভ হচ্ছিল না। অবশেষে বাম হাত ও পা বাড়িয়ে কোনোমতে হাঁটু দিয়ে বল ঠেকিয়ে দেন এমি মার্টিনেজ।
এমির হাঁটুতেই আটকে গেল ফরাসি স্বপ্ন। পরাজয় এড়াতে সমর্থ হলো আর্জেন্টিনা। এরপর টাইব্রেকারেও এমির বীরত্বে ৪-২ গোলের জয় পায় আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হন মেসি, ডি মারিয়া, মার্টিনেজরা। মাঠের অন্যপ্রান্তে তখন রাজ্যের বিষণ্নতা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মাঠে নেমে সান্ত্বনা দেন হৃদয় ভেঙে যাওয়া এমবাপ্পে ও তার সতীর্থদের।
জঁ-ফিলিপ মাতেতা, ব্র্যাডলি বারকোলা, দেজিরে দুয়ে, মাইকেল ওলিসে, মার্কাস থুরাম, ওসমান দেম্বেলে ও এমবাপ্পেকে নিয়ে এবার ভয়ংকর আক্রমণভাগ গড়েছেন ফ্রান্সের কোচ দেশম। মিডফিল্ডে আছেন রায়ান চেরকি, ওয়ারেন জাইরে-এমেরি, আদ্রিয়েন রাবিও, এনগোলো কান্তে, অরেলিঁয়ে চুয়ামেনি, মানু কোনে। রক্ষণেও আছে ভরসার করার মতো নাম—থিও ও লুকাস হার্নান্দেজ, ইব্রাহিম কোনাতে, উইলিয়াম সালিবা, জুলেস কুন্দে, দায়োত উপামেকানো, লুকাস দিনিয়ে।
এ দলটির সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়টির নাম এমবাপ্পে, যিনি খেলেছেন মাত্র দুটি বিশ্বকাপ। তাতেই প্রমাণ করেছেন, তিনি বড় আসরের খেলোয়াড়। দুটি আসরেই অবিশ্বাস্য সব কীর্তি গড়েছেন। ২০১৮ ও ২০২২ আসরের নকআউট পর্বে করেছেন আটটি গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে নকআউট পর্বে তার সমান গোল করেছেন আর মাত্র দুজন—ব্রাজিলের লিওনিদাস ও রোনালদো। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের আসরে আট গোল করেন লিওনিদাস। আর রোনালদো আট গোল করেন ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০০৬ আসরে।
২০১৭ সালে ফ্রান্সের জার্সিতে অভিষেক। পরের বছরই বিশ্বকাপে সাড়া ফেলে দেন এ তরুণ। সর্বকনিষ্ঠ ফরাসি খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে গোল করেন এমবাপ্পে এবং পেলের পর দ্বিতীয় টিনএজ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলের কীর্তি গড়েন। রাশিয়ায় আসর শেষে তিনি ছিলেন গোলদাতাদের তালিকায় যুগ্মভাবে দ্বিতীয় স্থানে। সেবার ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ বেস্ট ইয়াং প্লেয়ার’ পুরস্কার পান এমবাপ্পে। পরে হন ফ্রান্সের বর্ষসেরাও।
কাতারে গত আসরেও একের পর এক কীর্তি গড়েন এমবাপ্পে। ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের (১৯৬৬) পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। টাইব্রেকারেও গোল করেন তিনি। সব মিলিয়ে, ফাইনালে চার গোল করেন, যা আগে কেউ করেননি। টানা দুই বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলের কীর্তিও এমবাপ্পে ছাড়া আর মাত্র একজনের রয়েছে।