২০২২ সালে কাতারে লিওনেল মেসি যখন বিশ্বকাপ ট্রফিটি হাতে নিলেন, সেই মুহূর্তটা মনে আছে? কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গিয়েছিল পুরো পৃথিবী। একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল পেলের সময়। ম্যারাডোনার সময়। প্রতিটি বিশ্বকাপের গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যার নাম অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমীই জানেন না।
তিনি কখনো বিশ্বকাপে খেলেননি। কখনো গোল করেননি। ফুটবল সুপারস্টারও ছিলেন না। তবুও, তিনি না থাকলে হয়তো বিশ্বকাপ বলে কিছুই থাকত না। তার নাম জুলে রিমে।
এ গল্প বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এক এমন সময়ে, যখন টেলিভিশন ছিল না। বৈশ্বিক ক্রীড়া সাম্রাজ্য বলে কিছু ছিল না। মহাসাগর পাড়ি দিতে লাগত সপ্তাহের পর সপ্তাহ। ১৮৭৩ সালে ফ্রান্সের ছোট্ট গ্রাম থ্যুলেতে জন্ম রিমের। তিনি কোনো অভিজাত পরিবারে জন্ম নেননি। পরবর্তীতে তার পরিবার জীবিকার সন্ধানে প্যারিসে চলে আসে। সেখানে তিনি গড়ে তোলেন একেবারে সাধারণ একটি জীবন। পেশায় ছিলেন আইনজীবী।
১৯ শতকের শেষভাগে ইউরোপজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল ফুটবল। কিন্তু সেই সময়ের অনেক ক্লাবই ছিল শ্রেণিবিভাজনের প্রতিচ্ছবি। কোথাও শুধু ধনীদের প্রবেশাধিকার, কোথাও নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর আধিপত্য। এই ধারণার বিরোধী ছিলেন জুলে রিমে। ১৮৯৭ সালে তিনি প্যারিসে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রেড স্টার ফুটবল ক্লাব’। তার দর্শন ছিল একেবারে সরল— ফুটবল সবার জন্য।
এর পর ইতিহাস তার জীবনে নিয়ে আসে এক নির্মম মোড়। ১৯১৪ সালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় অসংখ্য শহর।
পেলে ও জুলে রিমে ট্রফি। ছবি: ফিফা মিউজিয়াম
জুলে রিমে তখন ফরাসি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন যুদ্ধের বিভীষিকা। তিনি দেখেছিলেন, কীভাবে একসময়ের প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলো মুহূর্তেই পরিণত হতে পারে একে অপরের শত্রুতে। অনেকেই যুদ্ধ শেষে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। রিমে ঠিক উল্টোটা ভাবলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন খেলা মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এবং ফুটবল পারে সীমান্তের দেয়াল ভাঙতে। পারে ভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে একই মঞ্চে দাঁড় করাতে।
১৯২১ সালে তিনি ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন। আজকে ফিফা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তখনকার ফিফা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক ফুটবল ছিল বিচ্ছিন্ন। দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ছিল সীমিত। ভ্রমণ ছিল ব্যয়বহুল। আর বিশ্বব্যাপী কোনো ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপই ছিল না। অলিম্পিক গেমসে ফুটবল খেলা হতো ঠিকই, কিন্তু রিমে বিশ্বাস করতেন, ফুটবলের জন্য দরকার নিজস্ব একটি বৈশ্বিক আসর।
কিন্তু তার এ স্বপ্ন সহজে গ্রহণ করেনি কেউ। অনেকে এটিকে অবাস্তব বলেছিলেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, এমন উদ্যোগ আর্থিকভাবে টিকবে না। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, মহাদেশ পেরিয়ে দলগুলো আদৌ অংশ নিতে রাজি হবে কিনা। কিন্তু রিমে হাল ছাড়েননি। বছরের পর বছর ধরে তিনি আলোচনা করেছেন, সমর্থন আদায় করেছেন। প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাখ্যান এসেছে। তবুও তিনি থামেননি।
১৯৩৩ সালে জুলে রিমে। ছবি: সংগৃহীত
অবশেষে ১৯২৯ সালে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—ফিফা বিশ্বকাপ। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপ শুরুর আগেই প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ইউরোপের অনেক দেশ অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখায়। মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যেতে হতো জাহাজে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি দল অংশ নিয়েছিল সেই বিশ্বকাপে। মাত্র তেরোটি।
সেবার রিমে নিজে বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিয়ে জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। যে মানুষটি বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনিই নিজের হাতে সেই স্বপ্নের প্রতীককে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য মহাদেশে। তার সামনে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। শুধু ছিল অটল বিশ্বাস। ফুটবল সফলতা পাবেই।
পরবর্তী কয়েক দশকে ফুটবল ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। নতুন নতুন দেশ ফিফায় যোগ দেয়। আন্তর্জাতিক ফুটবল ধীরে ধীরে সত্যিকারের বৈশ্বিক রূপ নিতে শুরু করে। ১৯৫৪ সালে ফিফার সভাপতির পদ ছাড়ার সময় পর্যন্ত জুলে রিমে একটি সীমিত ইউরোপীয় সংগঠনকে রূপ দিয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী এক প্রতিষ্ঠানে। দুই বছর পর, ১৯৫৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
জুলে রিমে কখনো পেলের বিশ্বজয় দেখেননি। ম্যারাডোনার জাদু দেখেননি। মেসির বিশ্বকাপ জয় দেখেননি। দেখেননি বিলিয়ন মানুষের সামনে সম্প্রচারিত বিশ্বকাপ। দেখেননি পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে ফুটবলের বিস্তার। কিন্তু তিনি যে বীজটি রোপণ করেছিলেন, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এই বিশাল বৃক্ষ। আজ যখন বিশ্বকাপ শুরু হয়, আমরা খেলোয়াড়দের গল্প দেখি। কিন্তু সেই গল্পগুলোর অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে আরেকটি গল্প। একজন ফরাসি আইনজীবীর গল্প। যিনি বিশ্বাস করেছিলেন, একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট পৃথিবীকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।