আজ রাতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, আগামীকাল রাতে ফাইনাল। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপার ম্যাচে লড়বে দুই মহাদেশের দুই চ্যাম্পিয়ন—আর্জেন্টিনা ও স্পেন। কোপা আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ইউরোর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। এর বাইরে আর্জেন্টিনা বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, আর স্পেন ২০১০ আসরের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
র্যাংকিংয়ের সেরা চারটি দল উঠেছিল সেমিফাইনালে। সেখান থেকে দুই ও তিন নম্বর দল আর্জেন্টিনা ও স্পেন পায় ফাইনালের টিকিট। এ জয় তাদের তুলে দিয়েছে র্যাংকিংয়ের এক ও দুইয়ে। ফাইনালের পরই র্যাংকিং আনুষ্ঠানিকভাবে আপডেট করবে ফিফা। তাই বলা যায়, আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বের সেরা দুটি দল উঠেছে ফাইনালে।
আরেকটি বিষয় নিশ্চিত হয়েছে, শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে শরীরনির্ভর ফুটবল নয়, নান্দনিক ও পাসিং ফুটবলের লড়াই হবে। লাতিন দেশটি চিরাচরিতভাবেই ছন্দময় ফুটবল খেলতে পছন্দ করে। অন্যদিকে স্প্যানিশরা ‘তিকিতাকা’ থেকে খানিকটা বেরিয়ে এলেও তাদের মূল শক্তির জায়গা এখনো সেই পাসিং ফুটবল। পাসিং ফুটবলকেই পুঁজি করে তারা একের পর এক দলকে পরাজিত করে ফাইনালে উঠে এসেছে।
এ দুটি দলের শারীরিক গড়ন ইউরোপ কিংবা আফ্রিকার দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই কম। চলতি আসরে গড় উচ্চতায় তারা বেশ পিছিয়ে। ৪৮ দলের মধ্যে স্পেন ৩১ নম্বরে (১৮১ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার) আর আর্জেন্টিনা ৪৪ নম্বরে (১৭৯ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার) অবস্থান করছে। তবু আকর্ষণীয় ফুটবল খেলে তারা শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নিয়েছে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে। স্পেনের শক্তি বলের ওপর নিরঙ্কুশ দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেয়া, আর আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখছে মেসির মতো সুপারস্টারের বিরাট প্রভাব বিস্তার ও ব্যবধান গড়ে দেয়ার ক্ষমতা। এছাড়া বড় আসর ও বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতাও আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। তাই তো একের পর এক ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনে ম্যাচ জিতে নিচ্ছেন মেসিরা।
কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করা স্পেন যে ফাইনালে উঠে আসবে, তা কি কেউ ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিল? অভাবনীয় সেই ম্যাচের পরই হয়তো সম্বিত ফিরে পেল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এরপর তারা অন্যগ্রহের ফুটবল খেলতে থাকল আর একের পর এক পরাশক্তি তাদের সামনে আত্মসমর্পণ করতে থাকল। সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হিসেবে তারা উঠে যায় নকআউটে। ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারাতে কোনো বেগ পেতে হলো না ইয়ামালদের। এরপর শিকার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। ‘সুপার সাব’ মিকেল মেরিনোর ৯১ মিনিটে গোল করে স্পেনকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট এনে দেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হারাল ইউরোপের আরেক শক্তিশালী দল বেলজিয়ামকে। এবারো জয়ের নায়ক বদলি হিসেবে নামা মেরিনো। ৮৮ মিনিটে গোল করেন তিনি। স্পেন ২-১ গোলের জয়ে উঠে যায় সেমিফাইনালে। সেমিফাইনালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমান দেম্বেলেরা কোনো লড়াই গড়ে তুলতে পারলেন না, অসহায় আত্মসমর্পন করলেন স্পেনের কাছে। ২-০ গোলের জয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়নরা। শিরোপা থেকে এখন মাত্র একটি জয় দূরে তারা।
তারকাখচিত স্পেন দলে এবার অনেকটা ‘অপ্রত্যাশিত’ নায়ক মিকেল ওয়ারজাবাল। রিয়াল সোসিয়েদাদের এ স্ট্রাইকার চলতি আসরে পাঁচ গোল করে স্পেনকে ফাইনালে তোলার বড় নায়ক। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালেও তিনি স্পেনের জয়সূচক গোলটি করেছিলেন। অন্য সতীর্থদের মতো অত বেশি তারকাখ্যাতি না থাকলেও তার গোল ছাড়া ফাইনালে আসা সম্ভব ছিল না স্পেনের। এর বাইরে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৫৮ মিনিটে পেদ্রো পোরোর গোল স্পেনের জয় নিশ্চিত করে ফেলে। তার এ গোলটি প্রমাণ করে দেয়, স্পেন একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো বিভাগের একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের হৃদয় ভেঙে দিতে সমর্থ।
কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনার পথ অনেকটা মসৃণ ছিল। সেমিফাইনালের আগে তাদের সামনে ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৫ নম্বরের ওপরের কোনো দল পড়েনি। সেমির প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড ছিল ৪ নম্বর র্যাংকধারী। রুটটা সহজ থাকলেও বিপদ ঠিকই ছিল। পুঁচকে কেপ ভার্দের বিপক্ষে মেসিদের জিততে হয়েছে অতিরিক্ত সময়ের খেলায়, ১১১ মিনিটের আত্মঘাতী গোলে। মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও জিততে ঘাম ঝরাতে হয় লিওনেল স্কালোনির দলকে। ভিএআর মিসরের গোল বাতিল করে দিলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়টি এসেছে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের গোলে ভর করে।
মেসিদের কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় সেমিফাইনালেও। ৮৫ মিনিটের আগে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আলবিসেলেস্তেরা ৭ মিনিটের মধ্যে দুই গোল দিয়ে অভাবনীয় জয়ে উঠে যায় ফাইনালে। গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ, দুটি গোলেরই উৎস মেসি।
২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়ে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয় করেন মেসি। তার ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতাও কাতারের মাঠে ঘুচিয়েছেন তিনি। ওই আসরের পর অবসরের গুঞ্জন উঠলেও মেসি অপেক্ষা করতে থাকে আর ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেন। অবিশ্বাস্য মেধাবী আর পরিশ্রমী এ খেলোয়াড়টি এবারের আসরেও আর্জেন্টিনার নায়ক ও প্রয়োজনের মুহূর্তের ত্রাতা। ৩৯ বছর বয়সেও আট গোল আর চার অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি গোল্ডেন বুটের চার্টে সবার ওপরে অবস্থান করছেন! যার খেলারই কথা ছিল না, সেই মেসি খেললেন, রাজত্ব করলেন প্রতিটি ম্যাচে আর এখন গোল্ডেন বুট এবং সম্ভবত গোল্ডেন বলেরও সবচেয়ে বড় দাবিদার।
মেসি বড় নায়ক হলেও পার্শ্ব নায়ক এনজো আর লাউতারোকে কৃতিত্ব না দেয়া অন্যায় হবে বৈকি। সেমিফাইনালের দুটি গোল করেছেন এ দুজন। কোয়ার্টার ফাইনালে লাউতারো ও শেষ ষোলোয় এনজো গোল করে দলকে ফাইনালে তুলতে মূল্যবান অবদান রেখেছেন।