আপাতদৃষ্টিতে এটি লিওনেল মেসির আক্রমণ বনাম স্পেনের জমাট রক্ষণভাগের দ্বৈরথ হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফির ফয়সালা হতে পারে মধ্যমাঠের যুদ্ধেই। একদিকে স্পেনের শৈল্পিক পাস ও বলের ওপর আধিপত্য; অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আগ্রাসন, শারীরিক দৃঢ়তা, প্রেসিং এবং সেকেন্ড বল জয়ের ক্ষমতা। যে কৌশলগত দ্বৈরথই গড়ে দিতে পারে ম্যাচের গতিপথ।
এ যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন স্পেনের রদ্রি। চলতি বিশ্বকাপে ৬৫৫টি সফল পাস দিয়ে এক আসরে সর্বাধিক পাস সম্পন্ন করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তবে রদ্রির প্রভাব শুধু পাসের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। নিচে নেমে দুই সেন্টারব্যাকের কাছ থেকে বল নেয়া, প্রতিপক্ষের প্রথম প্রেস অতিক্রম করা এবং স্পেনের আক্রমণের দিক নির্ধারণ—সবকিছুরই মূল নিয়ন্ত্রক তিনি। ফলে আর্জেন্টিনার প্রধান লক্ষ্য হবে রদ্রিকে ব্যক্তিগতভাবে অনুসরণ করার চেয়ে তার পাসের সময় ও জায়গা সীমিত করা।
সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। চলতি বিশ্বকাপে তিনি ৩৩টি দ্বৈরথ জিতেছেন এবং করেছেন ১০টি ইন্টারসেপশন। রদ্রি বল গ্রহণ করার সময় ম্যাক অ্যালিস্টার সামনে থেকে চাপ তৈরি করতে পারেন, আবার তার পরবর্তী পাসের পথ বন্ধ করতেও ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে এটি নিছক রদ্রি বনাম ম্যাক অ্যালিস্টারের ব্যক্তিগত লড়াই নয়; আর্জেন্টিনার সামগ্রিক প্রেসিং কাঠামো বনাম রদ্রির চাপ এড়িয়ে স্পেনের খেলা গড়ে তোলার দক্ষতার পরীক্ষা। রদ্রি যদি প্রথম চাপ ভেঙে ফেলতে পারেন, তাহলে স্পেন মধ্যমাঠে সংখ্যাগত সুবিধা নিয়ে আক্রমণে উঠতে পারবে। আর আর্জেন্টিনা যদি তার পাসিং লেন সংকুচিত করে দিতে পারে, তবে স্পেনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ তৈরি হবে পেদ্রির সৃজনশীলতা এবং এনজো ফার্নান্দেজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। পেদ্রি চলতি আসরে ২০২টি পাস শেষ তৃতীয়াংশে পৌঁছে দিয়েছেন, যা টুর্নামেন্টের যেকোনো মিডফিল্ডারের মধ্যে সর্বোচ্চ। দুই লাইনের মাঝখানে জায়গা খুঁজে নেয়া, ছোট পাসে প্রতিপক্ষের ব্লক ভেঙে দেয়া এবং উইঙ্গারদের সঙ্গে সমন্বয় তৈরিতে তিনি স্পেনের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড়দের একজন।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে এনজো ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর। ম্যাচে সর্বাধিক ১০৪ বার বল স্পর্শ করার পাশাপাশি তিনি ৮২টি সফল পাস দেন এবং শেষ তৃতীয়াংশে পৌঁছে দেন ৩৮টি পাস। পেদ্রির সঙ্গে এনজোর সরাসরি ব্যক্তিগত লড়াই সবসময় দেখা না গেলেও দুই দলের মধ্যে কে কেন্দ্রীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই প্রশ্নে তাদের ভূমিকা হবে মুখ্য। পেদ্রি আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড ও রক্ষণরেখার মাঝখানে জায়গা পেলে স্পেন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। বিপরীতে এনজো প্রেস অতিক্রম করে মেসির কাছে পরিষ্কারভাবে বল পৌঁছে দিতে পারলে আর্জেন্টিনা স্পেনের রক্ষণকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে পারবে।
মধ্যমাঠের আরেক প্রান্তে শক্তি, দৌড় এবং দ্বিতীয় বল দখলের লড়াই হতে পারে ফাবিয়ান রুইস ও রদ্রিগো ডি পলের মধ্যে। ফাবিয়ান শুধু পাসিংয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নন; বল পুনরুদ্ধার, প্রতিপক্ষের বক্সের দিকে দৌড় এবং শেষ তৃতীয়াংশে প্রবেশেও তার বড় ভূমিকা রয়েছে। ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনি স্পেনের হয়ে সর্বাধিক সাতবার বল পুনরুদ্ধার করেন এবং ম্যাচের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি আটবার শেষ তৃতীয়াংশে বল নিয়ে প্রবেশ করেন।
তার এ এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ডি পলের দৌড় ও অবস্থানগত শৃঙ্খলা আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। ডানদিকে মেসির পেছনে বাড়তি পরিশ্রম করা, প্রতিপক্ষকে প্রেস করে বল কেড়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ডি পলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ফাবিয়ান সামনে এগিয়ে গেলে তার ফেলে যাওয়া জায়গা কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণ করতে পারে। আবার ডি পল অতিরিক্তভাবে প্রেস করতে সামনে চলে গেলে স্পেনও সেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করতে চাইবে।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সামনে পেদ্রি ও ফাবিয়ানের মধ্যে নির্বাচনও মধ্যমাঠের চরিত্র বদলে দিতে পারে। পেদ্রি খেললে স্পেন পাবে অধিক সৃজনশীলতা ও সূক্ষ্ম পাসিং; ফাবিয়ান থাকলে বাড়বে শারীরিক শক্তি, বল পুনরুদ্ধার এবং বক্সে প্রবেশের সামর্থ্য। একইভাবে লিওনেল স্কালোনিও লিয়ান্দ্রো পারেদেস, ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজোর মধ্যে ভারসাম্য কেমন রাখেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হবে। পারেদেস খেললে আর্জেন্টিনা নিচ থেকে বল ছাড়ার ক্ষেত্রে স্থিরতা পাবে, তবে প্রেসিংয়ের গতি কিছুটা কমতে পারে।
বলের দখল সম্ভবত স্পেনের কাছেই বেশি থাকবে। কিন্তু দখল আর নিয়ন্ত্রণ সবসময় এক বিষয় নয়। আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থেকেও কয়েক মিনিটের মধ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়া যায়। স্পেনও পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ দিকে জয়সূচক গোল করে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে। ফলে প্রতিটি হারানো বল, প্রতিটি দ্বিতীয় বল এবং চাপ ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রতিটি পাসের মূল্য থাকবে অপরিসীম।
রদ্রির পাসিং ছন্দের বিপরীতে ম্যাক অ্যালিস্টারদের প্রেস, পেদ্রির সৃজনশীলতার বিপরীতে এনজোর নিয়ন্ত্রণ এবং ফাবিয়ানের এগিয়ে যাওয়ার বিপরীতে ডি পলের নিরন্তর দৌড়—এই ছোট ছোট কৌশলগত যুদ্ধের সমষ্টিই নির্ধারণ করতে পারে ফাইনালের ফল। ট্রফি জেতানো গোলটি হয়তো করবেন কোনো ফরওয়ার্ড, সেই গোলের উৎস কিন্তু মধ্যমাঠই।