এ সময়ে মহাদেশটি অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার, উন্মাদনাপূর্ণ দর্শক এবং শক্তিশালী লিগ উপহার দিলেও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাফল্যের ঝুলি খুব একটা ভারী হয়নি। ২০০২ সালে ঘরের মাঠে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনালে ওঠাই এখন পর্যন্ত এশিয়ার সর্বোচ্চ অর্জন। জাপান চারবার শেষ ষোলোয় উঠেও কোয়ার্টার ফাইনালের মুখ দেখেনি। ইরান কখনো গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। আর সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া কিংবা কাতারের সাফল্যও বিচ্ছিন্ন কিছু মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ হিসেবে এশিয়ার আরো দূরে যাওয়ার কথা।
চলতি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নয়টি এশীয় দল অংশ নিচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এ আসরে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের ধারাবাহিকতা, সৌদি আরবের সাহসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কাতারের মহাদেশীয় আধিপত্য, জর্ডানের বিস্ময়কর উত্থান, উজবেকিস্তানের প্রথম পদচারণা ও ইরাকের প্রত্যাবর্তনের গল্প।
প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নয়টি দল অংশগ্রহণ সংখ্যার বিচারে শুধু রেকর্ড নয়; এটি এশিয়ার ফুটবল বিকাশের দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতিও। বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের ফলে এশিয়া সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী অঞ্চলের একটি। আগে যেখানে সরাসরি চারটি স্থান ছিল, সেখানে এখন আটটি নিশ্চিত এবং অতিরিক্ত প্লে-অফের সুযোগও যুক্ত হয়েছে। গত এক দশকে এশিয়ার অনেক দেশের ফুটবল কাঠামো, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, কৌশলগত চিন্তা এবং খেলোয়াড় উন্নয়ন ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে এ প্রতিনিধিত্বে।
পরিবর্তনের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ জাপান। বর্তমানে এশিয়ার সর্বোচ্চ র্যাংকধারী দলটি শুধু মহাদেশের সেরা নয়, বিশ্ব ফুটবলের মধ্যম সারির শক্তিগুলোর সঙ্গেও সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে ‘গ্রুপ অব ডেথ’-এর শীর্ষে ওঠা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। সেটি ছিল বহু বছরের পরিকল্পিত বিনিয়োগের ফল।
কাওরু মিতোমা, তাকেফুসা কুবো, তাকেহিরো তোমিয়াসু, দাইচি কামাদার মতো খেলোয়াড়রা ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে নিয়মিত খেলছেন। তবে ‘ব্লু সামুরাইদের’ শক্তি তারকানির্ভর নয়। তাদের প্রকৃত শক্তি সুসংগঠিত কাঠামো, যেখানে স্কুল ফুটবল, কমিউনিটি একাডেমি, পেশাদার ক্লাব এবং জাতীয় দলের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সংযোগ রয়েছে। নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও তিউনিসিয়াকে নিয়ে গঠিত গ্রুপ-এফ সহজ নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স জাপানকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা অবাস্তব নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামনেও যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে আশাবাদী হওয়ার। সহ-আয়োজক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চেক প্রজাতন্ত্রকে নিয়ে গ্রুপ-এ তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এশিয়ার সবচেয়ে বড় সাফল্যের মালিক এ দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই মহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দল। সন হিউং-মিন ও লি কাং-ইনের মতো তারকাদের নিয়ে গঠিত দলটির বিশ্বকাপে অনেক দূরে যাওয়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে।
কোরিয়ানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তারকানির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক ম্যাচে দেখা গেছে, দলটি অতিরিক্তভাবে সনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করছে। নকআউট পর্যায়ে যেতে হলে তাদের আরো বৈচিত্র্যময় আক্রমণভাগ এবং সমন্বিত দলগত ফুটবল প্রয়োজন হবে।
অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানও কম আকর্ষণীয় নয়। ভৌগোলিকভাবে ওশেনিয়ার অংশ হলেও ২০০৬ সাল থেকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদস্য এ দেশটি এরই মধ্যে এশিয়ান কাপ জিতেছে এবং বিশ্বকাপেও ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত গ্রুপটি ভারসাম্যপূর্ণ। তবে অস্ট্রেলিয়ার ইউরোপভিত্তিক খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা এবং বড় টুর্নামেন্টে লড়াই করার মানসিকতা তাদের এগিয়ে রাখতে পারে।
ইরানের গল্প ভিন্ন। তিনবারের এশিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়ন দেশটি বহুবার বিশ্বকাপে খেললেও কখনো নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি। এবার সেই অভিশাপ ভাঙার সুযোগ এসেছে। বেলজিয়াম, মিসর ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে থাকা গ্রুপে ইরানের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। শারীরিক শক্তি, সংগঠিত রক্ষণ এবং কৌশলগত শৃঙ্খলার কারণে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ।
এদিকে কাতার, জর্ডান, সৌদি আরব, ইরাক এবং অভিষিক্ত উজবেকিস্তান এশিয়ার ফুটবল বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করছে। কাতার টানা দুটি এশিয়ান কাপ জিতলেও বিশ্বমঞ্চে এখনো নিজেদের প্রমাণ করতে পারেনি। জর্ডান মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এশিয়ার রানার্সআপ হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। সৌদি আরব ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে তারা বড় দলকেও কাঁপিয়ে দিতে পারে।
উজবেকিস্তানের গল্প আরো আকর্ষণীয়। এটি তাদের প্রথম বিশ্বকাপ হলেও বয়সভিত্তিক ফুটবলে গত এক দশকে তারা এশিয়ার অন্যতম সফল দেশ। ধারাবাহিক পরিকল্পনা, যুব উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কারণে দেশটি ধীরে ধীরে মহাদেশীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার আধিপত্যে পরিচালিত বিশ্ব ফুটবলে নতুন শক্তির উত্থানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আফ্রিকার দেশগুলো যেমন ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে, তেমনি এশিয়াও ধীরে ধীরে সেই পথে হাঁটছে। ইউরোপে খেলা এশিয়ান ফুটবলারের সংখ্যা বাড়ছে, স্থানীয় লিগগুলোর মান উন্নত হচ্ছে, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ছে এবং ফুটবল বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া যখন সেমিফাইনালে উঠেছিল, তখনো কেউ বিশ্বাস করেনি। ২০২২ সালে জাপান যখন জার্মানি ও স্পেনকে হারাল, তখনো সবাই চমকে গিয়েছিল। তবে ফুটবল এভাবেই ইতিহাস লেখে অপ্রত্যাশিতের পথে, আশার আলোয়। সোনার হরিণ ধরার এ অভিযানে কে শেষ পর্যন্ত কতদূর যায় সেটাই দেখার বিষয়।