আরেকটি ইতিহাসের সাক্ষী হলো নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপের ফাইনালে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের যেন কোণঠাসা করে রেখেছিল লামিন ইয়ামালরা। একের পর এক আক্রমণে আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণ বার বার ভাঙলেও দীর্ঘসময় গোলের দেখা পায়নি তারা। তবে ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে টরেসের গোলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়ের মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো লা ফুয়েন্তের স্পেন ।
ম্যাচের শুরু থেকেই বেশ আক্রমণাত্মক ছিল দুদলই। প্রথম সুযোগও আসে মাত্র চার মিনিটের মাথায়। বক্সের ভেতর দারুণ ওয়ান-টু পাসের পর ফাইনাল ম্যাচের প্রথম সুযোগটি পান ইয়ামাল। তবে সংকীর্ণ কোণ থেকে নেয়া তার শটটি গোলরক্ষক মার্টিনেজ আটকে দেন। এরপরই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ থেকে আবার বলের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্পেন। সেখান থেকে বল পেয়ে আরেকবার লক্ষ্যভেদের চেষ্টা করেন ইয়ামাল। কিন্তু সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয় দিবু কারণে।
এরপরই আসে আর্জেন্টিনার কাউন্টার অ্যাটাক। স্প্যানিস রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যান মেসি। কিন্তু প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক সিমোন দ্রুত নিজের লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে বলটি ক্লিয়ার করেন। ষোলোতম মিনিটে ফাউলের শিকার হন মেসি। স্পেনের বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি-কিক নিলেও গোলের দেখা পাননি।
ম্যাচের ৩৭তম মিনিটে আরেকটি সুযোগ পান মিকেল ওইয়ারসাবাল। আর্জেন্টাইন বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়ে তাৎক্ষণিক শট নেন তিনি। তবে তার সে চেষ্টা সহজেই রুখে দেন গোলরক্ষক। পরের মিনিটেই বাম প্রান্ত থেকে গোলপোস্ট বরাবর একটি নিচু জোরালো শট নেন কুকুরেয়া। শটটি গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও, ব্যাক পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়।
ম্যাচের ৪৪ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখা লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে চোটের কারণে তুলে নিলেন স্কালোনি। মাঠে নেমেছেন নিকোলাস ওতামেন্দি। এরপর আরো কয়েক দফা চেষ্টা করেও গোলের দেখা পাইয়নি কোনো দলই। গোলশূন্যভাবে শেষ হয় প্রথমার্ধ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোন্সালেসকে উঠিয়ে নেন স্কালোনি। তার পরিবর্তে মাঠ আসেন পারেদেস। আর্জেন্টিনা তাদের চিরচেনা ৪-৫-১ ফর্মেশনে ফিরে যায়।
এর পরের মিনিটেই স্পেনের হয়ে বোনা লক্ষ্যের দিকে একটি শট নিয়েছিলেন। কিন্তু তা গোলে পরিণত হয়নি। পর মুহূর্তেই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে হলুদ কার্ড দেখেন বদলি নামা লিয়ান্দ্রো পারেদেস।
ম্যাচের ৫৬ মিনিটে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ চিরে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন ওইয়ারসাবাল। কিন্তু বক্সের প্রান্তে এসে পাস দিতে গিয়ে আক্রমণের গতি ও ধার হারিয়ে ফেলেন তিনি। সেই সুযোগে বলটি ক্লিয়ার করে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ।
৫৮তম মিনিটে মন্তিয়েলের পরিবর্তে মাঠে নামেন মোলিনা। রাইট-ব্যাক পজিশনে এটি আর্জেন্টিনার সরাসরি পরিবর্তন। ৬২ মিনিটে একসঙ্গে দুজনকে বদলি করে স্পেন। মিকেল ওইয়ারসাবাল ও ফাবিয়ান রুইজের পরিবর্তে মাঠে আসেন ফেরান তোরেস ও পেদ্রি।
এর কিছু পরই বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ওলমো একটি ডিপিং ড্রাইভ শট নেন। গোলরক্ষক মার্টিনেসের সামনে এসে ড্রপ খেয়ে স্পিন করে বল মাঠের বাইরে কর্নারে চলে যাওয়ায় এ যাত্রায় বেঁচে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যায় স্পেন। হাইড্রেশন ব্রেকের ঠিক ইয়ামালের ক্রস থেকে ফেরান তোরেসের দারুণ এক হেড থামিয়ে দিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
৭০তম মিনিটে রোমেরো এবং দে পলের পরিবর্তে মাঠে নামেন মেদিনা এবং সিমিওনে। এরপরই ছন্দে ফেরার চেষ্টা করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাক অ্যালিস্টার বলের দখল ফিরে পেয়ে স্পেনের সীমানায় থাকা ফাঁকা জায়গায় বাড়িয়ে দেন। এ পাস থেকে অবশ্য কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি, তবে আর্জেন্টিনা ওপরের দিকে উঠে এসে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। যদিও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আবারও পাল্টা আক্রমণে উঠে আসে স্পেন।
৭৪তম মিনিটে ওলমো এবং বোনার পরিবর্তে মাঠে নামেন মেরিনো এবং উইলিয়ামস। ৭৬তম মিনিটে বক্সের প্রান্তে কিছুটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন পেদ্রি। কিন্তু তার নেয়া শটটি সরাসরি গোলরক্ষকের গায়ে চলে যায়।
৭৭ ও ৭৮তম মিনিটে পরপর দুটি কর্ণার পায় স্পেন। তবে সেখান থেকেও কোনো গোলের দেখা পায়নি তারা।
৮১তম মিনিটে গোলের আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া করে স্পেন। ডান প্রান্ত থেকে উইলিয়ামস চিপ করে বল বাড়িয়ে দেন এবং লাপোর্তে সেটি হেড করার জন্য তেড়ে আসেন। কিন্তু তার নেয়া হেডটি সরাসরি গোলরক্ষকের হাতে চলে যায়।
৮৭তম মিনিটে আক্রমণ সাজায় আর্জেন্টিনা। ইনসাইড-রাইট পজিশনে বল পেয়ে যান টরেস। এবার তাকে বল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মেরিনো। তবে নিজের ডান কাঁধের ওপর দিয়ে আসা বলটিকে তিনি টেনে গোলপোস্টের দিকে রাখতে পারেননি।
অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় মিনিটে পাউ কুবারসিকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এনজো ফার্নান্দেজকে। সেখান থেকে ফ্রি কিক নেন ইয়ামাল। তবে তার সেই শট রুখে দেন মার্টিনেজ। দ্বিতীয়ার্ধও শেষ হয় গোলশূন্যভাবেই।
অতিরিক্ত সময়েও একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যায় স্পেন। মেরিনোর গোল বাতিল
৯৬তম মিনিটে স্পেনের হয়ে গেল দেন মেরিনো। গোলটি সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল করে দেন রেফারি। গোলের আগে স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ওপর ফাউল করেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত দেন তিনি।
১০৫তম মিনিটে আক্রণ সাজানোর চেষ্টা চালান মেসি। প্রথম টাচে নিজের মার্কারকে কাটিয়ে একটু সরে যান, আর দ্বিতীয় টাচে বাঁ পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে আলতো বাঁকানো পাসে বল বাড়িয়ে দিলেন সিমিওনের দিকে। উইঙ্গার সিমিওনেকে পেছন থেকে এসে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন কুকুরেয়া।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল পায় স্পেন। ১০৬তম মিনিটে ডিপ ক্রস থেকে পাওয়া বল আর্জেন্টিনার বক্সের কাছ থেকে হেডের মাধ্যমে নিচে নামিয়ে দেন উইলিয়ামস। দৌড়ে এসে জোরালো শটে সেই বল জালে জড়ান টরেস।
ম্যাচের শেষাংশে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে আর্জেন্টিনা। তবে স্পেনের সাজানো ফুটবলের সামনে পাত্তা পায়নি তারা।