রেফারিদের প্রতি বিষোদ্গার, মিডিয়া বয়কট: একালের রিয়াল কি পথ হারাচ্ছে

এক সময় ‘সেনিওরিও’—সৌজন্য, সম্মান ও ভদ্রতার জন্য পরিচিত ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। খেলার মানসিকতা এমন ছিল যে, রেফারিকে দোষারোপ করাকে বার্সেলোনার 'কান্নাকাটি' হিসেবেই বিবেচনা করত মাদ্রিদ সমর্থিত পত্রিকা ও সমর্থকেরা। স্টিভ ম্যাকম্যানামদের সময় তো খেলোয়াড়দের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধিও ছিল। কিন্তু আজকের রিয়াল কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

রেফারিরা হয়তো কখনোই এতটা অবজ্ঞার শিকার হননি। কেউ তাদের দুর্নীতিপরায়ণ মনে করেন, কেউ মনে করেন তারা সম্পূর্ণ অপারদর্শী। ফুটবলের মাঠে, গ্যালারিতে, এমনকি টিভি স্টুডিওতেও এখন রেফারির মান নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক কোপা দেল রে ফাইনালের শেষ মুহূর্তে যেটা ঘটেছে, তা নজিরবিহীন—রিয়াল মাদ্রিদ ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার রেফারি রিকার্দো দে বুরহোস বেনগোয়েচিয়ার দিকে বরফের প্যাক ছুড়ে মারেন।

এক সময় ‘সেনিওরিও’—সৌজন্য, সম্মান ও ভদ্রতার জন্য পরিচিত ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। খেলার মানসিকতা এমন ছিল যে, রেফারিকে দোষারোপ করাকে বার্সেলোনার 'কান্নাকাটি' হিসেবেই বিবেচনা করত মাদ্রিদ সমর্থিত পত্রিকা ও সমর্থকেরা। স্টিভ ম্যাকম্যানামদের সময় তো খেলোয়াড়দের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধিও ছিল। কিন্তু আজকের রিয়াল কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? এই মৌসুমেই তারা বয়কট করেছে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান, কারণ আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়র পুরস্কার জিতছেন না। এরপর এসেছে রেফারিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে অনুপস্থিতি এবং এমনকি কোপা দেল রে ফাইনালে মাঠেই না নামার গুজব।

রিয়াল মাদ্রিদ টিভি তো প্রতিটি ম্যাচের আগেই নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট রেফারির ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ তুলে ধরে, এবারের রেফারি দে বুরহোস বেনগোয়েচিয়াও ছাড় পাননি। ম্যাচ-পূর্ব এক সাক্ষাৎকারে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। মাঠে খেলোয়াড়দের উত্তেজনা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, কিন্তু তার চেয়েও বিপজ্জনক হলো ক্লাবের উচ্চপর্যায়ে চালানো একের পর এক তুচ্ছ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ পদক্ষেপ, যা পুরো পরিবেশকেই বিষাক্ত করে তুলেছে।

রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। ছবি: মাদ্রিদ টিভি

এই পুরো নাটকের কেন্দ্রে আছেন ৭৮ বছর বয়সী রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ, যিনি গত দুই দশকে মাত্র তিন বছর বাদে বাকি সময়টাতে ক্লাব পরিচালনা করেছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে সাতটি শিরোপা, বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ক্লাবের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব—সবই আছে। কিন্তু তবু তিনি এখন সবাইকে নিজের শত্রু ভাবেন, মনে করেন পুরো ফুটবল বিশ্ব তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

মূলত এটি প্রাচীন এক থিমের আধুনিক রূপ: গোঁড়ামি, প্রোপাগান্ডা, মূলধারার সাংবাদিকতার দুর্বলতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান এবং অসহনশীল পক্ষপাতিত্ব যেভাবে ফুটবল সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। সুপার লিগ নাটকে আমরা দেখেছি, কীভাবে পেরেজের অদ্ভুত দাবিগুলো স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে অনায়াসেই প্রচারিত হয়েছে। তবে একসময় নির্ভরযোগ্যভাবে 'মাদ্রিদপন্থী' বলে পরিচিতি পাওয়া মার্কা ও এএস পর্যন্ত এখন রিয়ালের কর্মকাণ্ডে দ্বিধান্বিত। এএসের সাবেক সম্পাদক আলফ্রেদো রেলানো সম্প্রতি এল পাইসে পেরেজের সমালোচনা করে কলাম লিখেছেন।

বার্সেলোনার দুরবস্থাও এখন তেমন করে তোলা হচ্ছে না। উয়েফার নির্লিপ্ততা, অর্থায়ন অনিয়ম, বা নেতৃস্থানীয় রেফারিকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ—সবই যেন চাপা পড়ে গেছে। কারণ, বার্সেলোনা হলো পেরেজের শেষ ভরসা, সুপার লিগ প্রকল্পে একমাত্র সমর্থক।

পেরেজের বিরুদ্ধে আরো একবার একটি দুর্দান্ত দল নষ্ট করার অভিযোগ ওঠেছে। আগেও এমন অভিযোগ ওঠেছিল—২০০০-এর দশকে ক্লদ ম্যাকেলেলের বিক্রি আর তারকাদের প্রতি অতিমাত্রায় ঝোঁক দিয়ে। এবারো হয়তো সেই ভুলই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগা জয়ী দল ভেঙে পড়েছে টনি ক্রুসের বদলি না এনে এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের অন্তর্ভুক্তি। বাঁ দিক থেকে কাট-ইন করা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং একইভাবে খেলে সাফল্য পাওয়া রদ্রিগো দলে থাকার পরও অনুরূপ স্টাইলের এমবাপ্পেকে হয়তো দলে টানার পেছনে ‘বিগ সাইনিং’ বড় ভূমিকা না রেখেই পারে না!

সান্তিয়াগো বার্নাবেউয়ের আধুনিক সংস্কারও ব্যর্থ। ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ইউরো খরচ হয়েছে, কিন্তু প্রতিবেশীদের আপত্তিতে কনসার্ট করা যাচ্ছে না, ভিআইপি বক্স এখনো তৈরি হয়নি। টিভি সম্প্রচারে বাধা সৃষ্টি হয়েছে লা লিগার সঙ্গে বিবাদের কারণে। অথচ ম্যাচ-পরবর্তী মিডিয়া স্বত্ব কিনেছে যে চ্যানেলগুলো, তাদের ঢুকতেই দেয়া হয় না।

এই শূন্যস্থান পূরণ করছে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ নামের একদল অনুগত কনটেন্ট নির্মাতা, যারা শুধু প্রচার করে—প্রশ্ন তোলে না। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যে ক্ষমতার জবাবদিহি, তারা সেটা পালন করে না।

পেপ গার্দিওলার সর্বজয়ী বার্সেলোনার সময়ে রিয়াল ডাগআউটে হোসে মরিনহো। ছবি: ইপিএ

মাঠের পারফরম্যান্সের পতনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। অনেকেই এই পতনের শুরু হোসে মরিনহোর আমলে খুঁজে পান। তিনিই প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনকে যুদ্ধের মাঠ বানালেন। কিন্তু মরিনহো কোনো ভাইরাস নন, বরং এক প্রতিক্রিয়া। ২০১০ সালে বার্সেলোনার জয়ের জোয়ারে ক্লাব মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে তাকে নিয়োগ দিলেন পেরেজ। তাতে বার্সা জয়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু জায়গায় হারলেও মাদ্রিদও হারিয়েছে অনেক কিছু।

পেরেজ জানতেন তিনি কাকে আনছেন। এবং এখন যখন আবার হারতে শুরু করেছে মাদ্রিদ, পেরেজ আবার সেই পুরনো রাস্তায় হেঁটেছেন—একগুঁয়েমি, ক্ষোভ আর কল্পিত শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।

এই পরিস্থিতিকে আরো বিষাক্ত করেছে সামাজিক মাধ্যম। এখন মানুষ দল দেখে সত্য নির্ধারণ করে, যুক্তি দিয়ে নয়। ফলাফল—একটি উগ্র গোষ্ঠীভিত্তিক পরিবেশ, যেখানে রেফারিরা প্রতিনিয়ত চাপের মুখে আর খেলা হয়ে পড়ছে পরিচালনার প্রায় অযোগ্য।

ভিক্টোরিয়ানদের চোখে খেলাধুলা ছিল আত্মসংযম শেখার মাধ্যম। পরাজয়কে মেনে নেয়ার শিক্ষাও এর মধ্যে পড়ে। কিন্তু মাদ্রিদের এক প্রবীণ কর্তা এখনো এই সহজ পাঠটি শিখে উঠতে পারেননি।

সূত্র: গোল ডটকম, দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য অ্যাথলেটিক

আরও