মেসি ম্যাজিকেই শুরু আর্জেিন্টনার বিশ্বকাপ

হে নূতন, দেখা দিক আর-বার

‘হে নূতন, দেখা দিক আর-বার’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বান যেন নতুন অর্থ খুঁজে পেল কানসাস সিটির রাতে।

ফুটবল বিশ্ব ভেবেছিল, লিওনেল মেসির গল্পে আর নতুন কীইবা বাকি আছে! বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, আটটি ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য গোল আর অগণিত রেকর্ডে পূর্ণ ক্যারিয়ারে কোনো অপূর্ণতা নেই। অথচ ৩৮ বছর বয়সে এসে মেসিকে আবিষ্কার করতে হলো নতুন রেকর্ডের অলিন্দে। বাংলাদেশ সময় গতকাল সকালে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক করে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ের নায়ক হওয়ার পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসে যোগ করলেন আরেকটি সোনালি অধ্যায়।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন’। প্রাপ্তির কানায় কানায় পূর্ণ মেসির ক্যারিয়ারেও এমন একবিন্দু রিক্ততা লুকিয়ে ছিল—বিশ্বকাপের মঞ্চে হ্যাটট্রিকের আক্ষেপ। অজস্র অর্জনের বর্ণিল ছটায় ভক্তরা হয়তো সেই শূন্যতার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। কিন্তু জাদুকর সেই অপূর্ণতাকেও পূর্ণতায় রূপ দিলেন। এ যেন কেবল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর গল্প নয়; মেসির ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘অসীমের চিরবিস্ময়’-এর আরেক প্রকাশ।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে রেকর্ড বইয়ের পাতায় কেবল মেসির একক স্বাক্ষর। হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গিয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের আসরে মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে বসেছেন। এটি ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক। আর ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে তা করে ভেঙে দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর রেকর্ড, হয়েছেন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন। গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার মোট অবদান এখন ২৪, যা পেলের ২১-কে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

শুষ্ক পরিসংখ্যানের এই পাহাড় ডিঙিয়ে যদি একটু গভীরে তাকানো যায়, তবে চোখে পড়বে আরো এক মোহনীয় রূপকথা। ২০০৬ সালের ১৬ জুন, বিশ্বকাপের বিশাল মঞ্চে এক লাজুক কিশোর নিজের আবির্ভাবের জানান দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে। এরপর গড়িয়েছে দুই দশকের দীর্ঘ সময়। কালের পরিক্রমায় ঠিক প্রায় একই দিনে, সেই চেনা মঞ্চেই তিনি আবির্ভূত হলেন দেশের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা হয়ে! মহাকালের বৃত্ত বোধহয় এভাবেই আপন নিয়মে পূর্ণতা পায়; কানসাস সিটির মায়াবী রাতে পূর্ণ হওয়া সেই বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কালের বরপুত্র—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য মোটেও সহজ ছিল না আর্জেন্টিনার জন্য। পঞ্চম মিনিটেই লাউতারো মার্তিনেজের পাস থেকে বল জালে জড়িয়েছিলেন মেসি, কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। কয়েক মিনিট পর উল্টো আলজেরিয়াই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। ইব্রাহিম মাজা দারুণ এক থ্রু পাসে ফারেস শাইবিকে খুঁজে নেন, আর তার নিখুঁত ফিনিশে বল জালে জড়ালেও ভিএআর জানিয়ে দেয় তিনিও অফসাইডে ছিলেন। প্রথম ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতেই রেখেছিল আলজেরিয়া। পরে ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও স্বীকার করেন, প্রতিপক্ষ প্রথমার্ধে দারুণ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং তাদের জন্য কাজটা সহজ ছিল না।

কিন্তু তারপরই শুরু হয় মেসির অধ্যায়। ৩৩ মিনিটে রদ্রিগো ডি পলের সূক্ষ্ম এক থ্রু পাস আলজেরিয়ার দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে গিয়ে পৌঁছায় মেসির কাছে। সামনে জায়গা পেতেই তিনি বাম পায়ের এক ভয়ংকর শট নেন প্রায় ২০ গজ দূর থেকে। লুকা জিদানের আঙুল ছুঁয়ে বল আশ্রয় নেয় জালের ওপরের কোণে।

গোল খাওয়ার পরও আলজেরিয়া হাল ছাড়েনি। বলের দখলে তারা প্রায় সমানতালে লড়াই করছিল। যদিও পরে খেই হারিয়ে ফেলে। ম্যাচের ৫৯ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট লুকা জিদান কেবল ঠেকাতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিপদসীমায় ওত পেতে থাকা মেসিকে আটকানোর উপায় ছিল না। রিবাউন্ডে ডান পায়ের সহজ ফিনিশে তিনি ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। গোলটির সূচনা অবশ্য তারই পাস থেকে। নিকো গনসালেসকে বাম প্রান্তে বল বাড়িয়ে আক্রমণ গড়েছিলেন তিনি, যা শেষ পর্যন্ত তার দ্বিতীয় গোলের ভিত্তি তৈরি করে।

আর তৃতীয়টি যেন সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য। ৭৭ মিনিটে বক্সের কিনারে বল পেয়ে তিন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে নিচের কোণে যে শটটি পাঠালেন, সেটি যেন সময়ের বুক চিরে ফিরে আসা কোনো পুরনো স্মৃতি। মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো বার্সেলোনা সন্ধ্যা হঠাৎ পথ ভুলে কানসাস সিটিতে এসে পড়েছে। তারপর গ্যালারিতে বিস্ফোরণ, হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে তার প্রথম।

ম্যাচ শেষে আলজেরিয়া কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচও মেসির শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হন। তার ভাষায়, ‘ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট। তিনি কোনো সাধারণ ফুটবলার নন। প্রথম দুই গোলের ক্ষেত্রে আমরা তাকে সুযোগ দিয়েছি, আর সে সেই সুযোগকে শাস্তিতে পরিণত করেছে।’ পরিসংখ্যানও তার কথার সাক্ষ্য দেয়। আর্জেন্টিনার ১০টি শটের মধ্যে সাতটিই ছিল মেসির।

মেসির ছাড়াও মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল ছিলেন আগের মতোই মেসির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। প্রথম গোলের জন্য তার নিখুঁত থ্রু পাসই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এনজো ফার্নান্দেজ নিজের স্বভাবসুলভ ছন্দে পাসিংয়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। উজ্জ্বল ছিলেন আর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারও। রক্ষণে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল। একাধিক ক্লিয়ারেন্স, ট্যাকল ও ইন্টারসেপশনে তিনি আলজেরিয়ার আক্রমণভাগকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও ফাকুন্দো মেদিনাও দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। পুরো ম্যাচে আলজেরিয়া সাতটি শট নিলেও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে খুব বেশি পরীক্ষা দিতে হয়নি। বদলি হিসেবে নেমে নিকো গনসালেসও ম্যাচে প্রাণ সঞ্চার করেন। তবে হতাশ করেছেন লাউতারো মার্তিনেজ। হুলিয়ান আলভারেজের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেয়েও তিনি আক্রমণে প্রত্যাশিত ধার দেখাতে পারেননি; সিদ্ধান্তহীনতা ও ফিনিশিংয়ের ঘাটতি তার পারফরম্যান্সকে ম্লান করে দেয়। থিয়াগো আলমাও ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলতে পারেননি।

ম্যাচে সবকিছুই আবর্তিত হয়েছে মেসিকে ঘিরে। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার হাতে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের কাতারে উঠে এসেও মেসি বললেন, ‘সত্যি কথা বলতে এই রেকর্ড আমাকে আকৃষ্ট করে না। ক্লোসার পাশে থাকতে পারা অবশ্যই সম্মানের। রোনালদো নাজারিও সেখানে আছে। এমবাপেও আছে, আজ সে দুই গোল করেছে। কিন্তু এগুলো শুধুই পরিসংখ্যান, এর বাইরে কিছু নয়। রোনালদো আমার দেখা অন্যতম সেরা ফুটবলার। তার সঙ্গে একই আলোচনায় আসতে পারাটাই আমার জন্য সম্মানের। সে আজ প্রথম অবস্থানে নেই, কিন্তু তাতে তার প্রতি আমার সম্মান এতটুকুও কমে না।’

এখানেই হয়তো মেসির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। তিনি যত আকাশ ছুঁয়েছেন, তত মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছেন। তাই মেসির বিস্ময় শুধু তার বাম পায়ে নয়, তার দৃষ্টিতেও; যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিশে যায় উত্তরাধিকারে, শ্রদ্ধা হয়ে ওঠে সৌন্দর্য। ক্যারিয়ারের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে বটে, কিন্তু অস্তরাগের এ আলোই যেন সবচেয়ে উজ্জ্বল। যখন সবাই সমাপ্তির পাণ্ডুলিপি খুঁজছে, তখনো তিনি লিখে চলেছেন নতুন অনুচ্ছেদ। তাই মেসিকে নিয়ে শেষ অধ্যায় লেখার সময় এখনো আসেনি। শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে!

আরও