এই ফ্রান্সকে কোনো ছকে বাঁধা যায় না

কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসের মুহূর্তটি রোমান্টিক ফুটবলপ্রেমীদের মনে হয়তো এক লহমার জন্য এক অলৌকিক রূপকথার জন্ম হচ্ছিল।

বোস্টনের দক্ষিণ-পশ্চিমের সেই তপ্ত দুপুরে ইয়াসিন বুনুর বামদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল রুখে দেয়ার দৃশ্যটি মরক্কোকে নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই রোমান্টিকতা আসলে মরীচিকা ছিল, যা আধুনিক ফুটবলের নির্মম বাস্তবতার সামনে টিকতে পারেনি।

এ ফরাসি দলটিকে আসলে কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা যায় না। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের রূপ বদলাতে পারে এবং সামান্যতম দুর্বলতা খুঁজে পেলেও প্রতিপক্ষকে গ্রাস করে নিতে পারে। তাদের কোনো নির্দিষ্ট কৌশল নেই, কোনো একক পরিচয় নেই, কোনো পূর্বনির্ধারিত ছকও নেই। তারা কখনো বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে শ্বাসরুদ্ধ করে, কখনো বিদ্যুৎগতির ট্রানজিশনে মুহূর্তে ম্যাচ শেষ করে দেয়। কখনো মিডফিল্ডে ধৈর্যের দাবা খেলে, আবার কখনো আক্রমণে এমন ঝড় তোলে, যেন প্রতিপক্ষের পুরো পরিকল্পনাই অর্থহীন হয়ে যায়।

কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সেই পরিচিত ২-০ ব্যবধানের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ব্লুজরা আরো একবার প্রমাণ করল যে তাদের আটকানোর মতো ব্যাকরণ এখনো তৈরি হয়নি। দিদিয়ের দেশমের দল যখন মাঠে নামে, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস ও গাম্ভীর্য প্রতিপক্ষকে ম্যাচ শুরুর আগেই মানসিকভাবে পরাস্ত করে ফেলে। মরক্কোর মতো আক্রমণাত্মক, প্রতিভাবান ও আত্মবিশ্বাসী দলও ম্যাচের শুরু থেকে যেভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল, তাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় ফরাসিদের তৈরি করা ভীতি ঠিক কতটা তীব্র। টুর্নামেন্টজুড়ে বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালে এসে যেন নিজের ছায়া হয়ে গেল। মোহাম্মদ ওয়াহবি তার দলকে নামালেন ৪-৫-১ ছকে, ব্রাহিম দিয়াজকে একা ফেলে রেখে সামনে, বাকি সবাই প্রতিরক্ষার দেয়াল তুলল। এ অতি সাবধানী কৌশল অবলম্বন করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদেরই ফাঁদে ফেলেছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই ফ্রান্স এমনভাবে খেলেছে, যেন ফলাফল নিয়ে তাদের কোনো উদ্বেগই নেই। প্রথম কয়েক মিনিটেই এমবাপ্পে ও উপামেকানোর সুযোগ তৈরি হয়। এর পরও তারা অস্থির হয়নি। বল নিজেদের কাছে রেখেছে, ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছে, মরক্কোকে দৌড় করিয়েছে।

মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনেকের বিশ্বাস ছিল, ২০২২ সালের ইতিহাস এবার বদলে যেতে পারে। গ্রুপ পর্বে তাদের সাহসী, আক্রমণাত্মক ফুটবল মুগ্ধ করেছিল সবাইকে। আয়ুব বুয়াদ্দি, ব্রাহিম দিয়াজ কিংবা অন্য তরুণরা এমন ফুটবল খেলেছিলেন, যা দেখে মনে হয়েছিল তারা কাউকেই ভয় পান না। অথচ তারা ফ্রান্সকে আক্রমণের জন্য জায়গা দিয়েছে, মিডফিল্ডে সময় দিয়েছে, বল ঘোরানোর স্বাধীনতা দিয়েছে। যেন লালগালিচা বিছিয়ে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য। ফলাফল? পুরো ম্যাচে মরক্কোর লক্ষ্যভেদী প্রথম শট আসে ৮২ মিনিটে। প্রতিপক্ষের বক্সে তাদের মাত্র পাঁচটি স্পর্শ। কোনো বড় সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে ফ্রান্সের বক্সে প্রবেশের সংখ্যা ২৫। পরিসংখ্যানই বলে দেয় ম্যাচ কতটা একপেশে ছিল।

অথচ ২৮ মিনিটে এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করেন। অন্য অনেক দলের ক্ষেত্রে এমন মুহূর্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত। কিন্তু ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় হতাশার কোনো চিহ্নই দেখা যায়নি। যেন কিছুই ঘটেনি। তারা একই ছন্দে খেলেছে, একই ধৈর্যে আক্রমণ গড়েছে। এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পেনাল্টি মিস করার পর তিনি লুকিয়ে যাননি। বরং আরো বেশি বল চেয়েছেন, আরো বেশি ড্রিবল করেছেন, আরো বেশি রান নিয়েছেন।

অবশেষে ৬০ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত। দেজিরে দুয়ের পাস পেয়ে বক্সের প্রান্ত থেকে বাঁকানো শটে বুনুকে পরাস্ত করেন এমবাপ্পে। ছয় মিনিট পর আবারো এমবাপ্পে। এবার গোলদাতা নন, নির্মাতা। তার দৌড়ে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় ওসমান দেম্বেলে গোল করে ম্যাচ শেষ করে দেন। আট গোল নিয়ে তিনি এখন লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে গোল্ডেন বুটের শীর্ষে। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ২০-এ। মাত্র ২৭ বছর বয়সে যে পরিসংখ্যান, তা ফুটবল ইতিহাসেই বিরল।

কিন্তু শুধু এমবাপ্পেকে দেখলে ভুল হবে। এ ফ্রান্সের আসল শক্তি হলো—একজনকে থামালেও আরেকজন উঠে আসে। মাইকেল অলিসে এ বিশ্বকাপে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাকে কেবল উইঙ্গার বলা অন্যায় হবে। কখনো তিনি প্লেমেকার, কখনো ইনসাইড ফরওয়ার্ড, কখনো আবার মিডফিল্ডের অতিরিক্ত খেলোয়াড়। জিনেদিন জিদানের মতো নয়, কিন্তু আধুনিক ফুটবলের এক নতুন সংস্করণ যেন। দেম্বেলে পাঁচ গোল করেছেন। রাবিও ও মানু কোনোনে মিডফিল্ডে মরক্কোকে কার্যত নিশ্বাস নেয়ার সুযোগ দেননি। উপামেকানো ও স্যালিবা এমনভাবে রক্ষণ সামলেছেন যে পুরো নকআউট পর্বে ফ্রান্স এখনো গোল হজম করেনি।

মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবিও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, ফ্রান্সই ছিল শক্তিশালী দল। তাদের ছিল বেশি সুযোগ, বেশি সতেজতা, বেশি ধারণা। কিন্তু তার কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরেকটি সত্য, ফ্রান্স প্রতিপক্ষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে অন্য দল নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবলটাই খেলতে পারে না।

প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এ দল এখনো তাদের সর্বোচ্চ বিধ্বংসী ফুটবল খেলেছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত নয়। ফ্রান্সকে প্রেস করলে তারা পেছনের ফাঁকা জায়গায় আঘাত করে। নিচু ব্লকে নামলে ধৈর্য ধরে বল ঘুরিয়ে সুযোগ বের করে। মাঝমাঠে লড়াই করলে শারীরিক শক্তিতে হারাবে। আবার ম্যাচ যদি মুহূর্তের জাদু দাবি করে, সেখানে এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা অলিসে আছেনই। এ কারণেই এ ফ্রান্সকে কোনো ছকে ফেলা যায় না।

ম্যাচের শেষ দিকে এমবাপ্পের গোড়ালির চোট এবং মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়া ফরাসি শিবিরের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ। ১৪ জুলাই প্যারিসের বাস্তিল দিবসে ডালাসের মাঠে ফ্রান্স যখন সেমিফাইনাল খেলতে নামবে, তখন পুরো বিশ্বের নজর থাকবে এমবাপ্পের ফিটনেসের ওপর। তবে এমবাপ্পে থাকুন বা না থাকুন—এ ফরাসি দলটিকে কোনো একক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে বিচার করা ভুল হবে।

বিশ্বকাপে এখনো আর্জেন্টিনা, স্পেন, বেলজিয়ামের মতো দল রয়েছে। কিন্তু এ মুহূর্তে বাস্তবতা হলো শিরোপার পথটা অন্যদের জন্য ফ্রান্সকে হারানোর পথ। কারণ এ দল কেবল জিতছে না, প্রতিপক্ষের বিশ্বাসও ভেঙে দিচ্ছে। ফুটবলে রোমান্টিকতা সুন্দর। অঘটনের গল্পও মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু কখনো কখনো বাস্তবতা এতটাই শক্তিশালী যে কল্পনার জায়গাই থাকে না। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফ্রান্স ঠিক তেমনই এক বাস্তবতা।

আরও