দ্বিমুখী দুশ্চিন্তায় স্কালোনি

আর্জেন্টিনার ভঙ্গুর ডিফেন্স সুইসদের জমাট রক্ষণ

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ই শেষ কথা। কিন্তু সেই জয় যদি প্রতিবারই অলৌকিক প্রত্যাবর্তন, শেষ মুহূর্তের নাটক কিংবা লিওনেল মেসির জাদুর ওপর নির্ভর করে আসে, তাহলে কোচের ঘুম উড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

লিওনেল স্কালোনির অবস্থাও এখন ঠিক তেমন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে কষ্টার্জিত জয়, এরপর মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোল করে ইতিহাস গড়া। ফলাফল আর্জেন্টিনার পক্ষে হলেও পারফরম্যান্সে থেকে গেছে অসংখ্য প্রশ্ন। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে তাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ যেন নিজেরাই। একদিকে সুইসদের কঠিন, সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ; অন্যদিকে নিজেদের ভঙ্গুর ডিফেন্স। এ দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়েই সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ মেলাতে হবে স্কালোনিকে।

আর্জেন্টিনা এখনো টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল। কিন্তু শক্তিশালী হওয়া আর অপ্রতিরোধ্য হওয়া এক বিষয় নয়। মেসির পা এখনো জাদু বোনে, কিন্তু তার পেছনের দেয়ালটা যেন বালির, ঢেউ এলেই ধসে পড়ে। গত দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষ যতবার কার্যকর আক্রমণে উঠেছে, ততবারই আর্জেন্টিনার রক্ষণকে নড়বড়ে মনে হয়েছে। কেপ ভার্দে পাঁচটি শট নিয়ে দুটি গোল করেছে। মিসরও প্রায় তিনটি বিপজ্জনক আক্রমণেই গোলের মুখ খুলেছে। এর মধ্যে একটি অবশ্য অফসাইডে বাতিল হয়েছিল। এমন নয় যে প্রতিপক্ষ ম্যাচজুড়ে আধিপত্য করেছে। বরং বলের নিয়ন্ত্রণ, পাসের সংখ্যা, আক্রমণ সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে ট্রানজিশনে। বল হারানোর পর মাঝমাঠের প্রতিরোধ দুর্বল, ফুলব্যাকরা অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় পেছনে বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে, আর সেই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে প্রতিপক্ষ।

স্কালোনির দল বল নিয়ে দারুণ খেলতে পারে। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে বল নিয়ে আক্রমণ করাই সব নয়; বল হারানোর পর কত দ্রুত রক্ষণে ফেরা যায়, সেটাই বড় প্রশ্ন। সেখানেই পিছিয়ে পড়ছে আর্জেন্টিনা। জুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ সামনের সারিতে নিরলস প্রেসিং করলেও মেসি স্বাভাবিকভাবেই সেই কাজে অংশ নেন না। ৩৯ বছর বয়সী মেসির কাছ থেকে সেটি প্রত্যাশাও করা যায় না। ফলে প্রথম প্রেসিং লাইন ভেঙে গেলেই প্রতিপক্ষ সহজে মাঝমাঠ পেরিয়ে যাচ্ছে। রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা লিয়ান্দ্রো পারেদেস—তারা কেউই স্বভাবগত বলজয়ী মিডফিল্ডার নন। অবস্থানগতভাবে তারা জায়গা দখল করেন ঠিকই, কিন্তু প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামাতে প্রয়োজনীয় আগ্রাসন বা ডুয়াল জয়ের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না।

এতে সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে দুই সেন্টারব্যাক ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ওপর। লিসান্দ্রো বল নিয়ে খেলতে অসাধারণ। নিচ থেকে আক্রমণ গড়তে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেপ ভার্দের বিপক্ষে তিনি গোলও করেছেন, অ্যাসিস্টও দিয়েছেন। মিসরের বিপক্ষেও পেছন থেকে আক্রমণ শুরু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। কিন্তু একই সঙ্গে তিনিই আবার একাধিক গোলের সময় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে দায়ী থেকেছেন। ডিফেন্ডারের প্রথম কাজ প্রতিপক্ষকে থামানো, পরে বল নিয়ে খেলা। এ মৌলিক ভারসাম্যটাই যেন হারিয়ে ফেলছেন তিনি। রোমেরোও আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নন। ফলে দুই সেন্টারব্যাককে বারবার একা ফেলে দেয়ার কৌশল এখন আর্জেন্টিনার জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠছে।

ডান দিকেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। নাহুয়েল মোলিনা কিংবা গনসালো মন্তিয়েল—কেউই ধারাবাহিকভাবে আস্থা জাগাতে পারছেন না। আক্রমণে ওঠার পর তাদের পেছনের জায়গা কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষ বারবার বিপদ তৈরি করছে। বাম দিকে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও পুরো রক্ষণভাগকে একা ধরে রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। গোলবারের নিচেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এখনো কাতার বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকার সেই দুর্ভেদ্য রূপে নেই। আগের মতো অদম্য আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় স্কালোনির সামনে প্রশ্ন একই একাদশে আস্থা রাখবেন, নাকি পরিবর্তনের পথে হাঁটবেন? ইতিহাস বলছে, তিনি খুব কমই একই একাদশ পরপর নামান। আট বছরের কোচিংয়ে শতাধিক ম্যাচের মধ্যে মাত্র কয়েকবার একই দল খেলিয়েছেন। কিন্তু মিসরের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে দল যেভাবে ফিরে এসেছে, তা তাকে আবারো একই একাদশে আস্থা রাখার প্রলোভন দিচ্ছে। কারণ আক্রমণে সমস্যা নেই। সমস্যা রক্ষণে। আর সেটি অনেক সময় কৌশলগত সামান্য পরিবর্তনেই সমাধান করা সম্ভব।

সুইজারল্যান্ড আর্জেন্টিনার দুর্বলতাগুলো কাজে লাগানোর মতো যথেষ্ট সংগঠিত। মুরাত ইয়াকিনের দল শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে—এমন ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ, ধৈর্যশীল এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে ওঠে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জয় তাদের মানসিক দৃঢ়তারও প্রমাণ। ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলটি এখন বিশ্বাস করতে শিখেছে যে বড় দলকেও হারানো সম্ভব।

সুইস অধিনায়ক গ্রানিত জাকা অবশ্য মেসির প্রতি সম্মান লুকাননি। ২০১৪ সালের রাউন্ড অব সিক্সটিনে সাও পাওলোতে মেসির অসাধারণ পাস থেকে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অতিরিক্ত সময়ের গোল এখনো তার মনে আছে। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতলেও সুইজারল্যান্ড প্রমাণ করেছিল, তারা বড় দলকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখতে পারে। বারো বছর পর আবারো সেই দুই দলের দেখা।

ইয়াকিন এরই মধ্যে বলেছেন, আর্জেন্টিনা অজেয় নয়। কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে ম্যাচ তাকে সেই বিশ্বাস দিয়েছে। তার দল জানে, আর্জেন্টিনা বল দখলে রাখবে। তাই তাদের লক্ষ্য হবে অপেক্ষা করা, মাঝমাঠে ফাঁক তৈরি হওয়ার মুহূর্তে দ্রুত আক্রমণে ওঠা। বিশেষ করে জোহান মানজাম্বি যদি শেষ পর্যন্ত খেলতে পারেন, তাহলে সুইস আক্রমণে সৃজনশীলতার মাত্রা আরো বাড়বে। আর জাকার অভিজ্ঞতা তো আছেই।

রক্ষণে ম্যানুয়েল আকাঞ্জি ও তার সঙ্গীরা প্রতিপক্ষকে জায়গা না দেয়ার কৌশলে দক্ষ। গোলবারের নিচে গ্রেগর কোবেল এ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার সেভই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। নতুন বলে গ্রিপ বাড়াতে গ্লাভসে ভ্যাসলিন ব্যবহার থেকে শুরু করে টাইব্রেকারে কাগজের নোট না দেখে নিজের অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভরসা করা কোবেলের প্রস্তুতি নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনার ঝড় উঠেছে। মেসিদের সামনে তাই শুধু একটি রক্ষণ নয়, দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাসী এক গোলরক্ষকও অপেক্ষা করছেন।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা এখনো মেসি। মিসরের বিপক্ষে তার নেতৃত্ব আবারো প্রমাণ করেছে, বয়স তার প্রভাব কমাতে পারেনি। ম্যাচের গতি পড়া, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা এখনো তাকে আলাদা করে। কিন্তু স্কালোনিও জানেন, প্রতিবার মেসির কাছ থেকে অলৌকিক কিছু প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশ্বকাপ জিততে হলে দল হিসেবে আরো ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।

এ কারণেই শনিবারের ম্যাচটি স্কালোনির কৌশলগত পরীক্ষাও। তিনি কি ফুলব্যাকদের ওঠানামায় সংযম আনবেন? মাঝমাঠে একজন বেশি বলজয়ী খেলোয়াড়ের কথা ভাববেন? নাকি আগের মতোই আক্রমণাত্মক দর্শনে অটল থাকবেন?

আর্জেন্টিনা এখনো ফেভারিট। অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত দক্ষতা, বড় ম্যাচের মানসিকতা—সব দিক থেকেই তারা এগিয়ে। কিন্তু সুইজারল্যান্ড এমন এক দল, যারা প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় ধৈর্য ধরে বসে থাকতে জানে। আর বর্তমান আর্জেন্টিনা যদি আগের দুই ম্যাচের মতোই সহজে রক্ষণে ফাঁক দেয়, তাহলে সেই সুযোগ সুইসরা হাতছাড়া করবে না। স্কালোনির সামনে তাই সমীকরণটা সহজ নয়। একদিকে প্রতিপক্ষের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভাঙতে হবে, অন্যদিকে নিজের ভঙ্গুর রক্ষণকে শক্ত করতে হবে। আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার এ সূক্ষ্ম ভারসাম্যই হয়তো নির্ধারণ করবে, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ অভিযান আরো এক ধাপ এগোবে, নাকি ২০১৪ সালের অসমাপ্ত সুইস স্বপ্ন পূরণ হবে আগামীকাল সকাল ৭টায় কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে।

আরও