একটা ফুটবল ম্যাচ কখনো একটি দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও ২৭ বছর কারাগারে কাটানো একজন মানুষ ঠিক সেটাই বিশ্বাস করতেন। আর সেই বিশ্বাসই একদিন বদলে দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস। এটিই নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ফুটবলের অবিশ্বাস্য গল্প।
১৯৬৪ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছোট দ্বীপ রবেন আইল্যান্ড। চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া, বন্দুকধারী প্রহরী। সেখানকার একটি ছোট সেলে বন্দি আছেন একজন মানুষ। রাষ্ট্র তাকে ভয় পায়, তাই তার কণ্ঠ নীরব করে রাখতে চায়। তার নাম নেলসন ম্যান্ডেলা।
সেই সেলের ভেতর বসে হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে একদিন তার নাম জড়িয়ে যাবে ফুটবলের ইতিহাসের সঙ্গে। কিন্তু ম্যান্ডেলা শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি বুঝেছিলেন এমন একটি সত্য, যা পৃথিবীর অনেক শাসক, সেনাপতি কিংবা রাষ্ট্রনায়কও বোঝেননি। তিনি বুঝেছিলেন, একটি খেলা মানুষের হৃদয়কে যত দ্রুত এক করতে পারে, রাজনীতি তা পারে না।
রবেন আইল্যান্ডের বন্দিদের জীবন ছিল নির্মম। দিনের পর দিন পাথর ভাঙা, অপমান, নির্যাতন — সবকিছুই ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই কঠোর বাস্তবতার মাঝেও বন্দিরা একটি জিনিসকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন-ফুটবল।
বন্দিরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল লিগ। নাম ছিল ‘মাকানা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’। এটি কোনো সাধারণ বিনোদনের আয়োজন ছিল না। সেখানে ছিল দল, লিগ টেবিল, রেফারি, শৃঙ্খলা কমিটি, নির্বাচিত কর্মকর্তা, এমনকি লিখিত সংবিধানও। বন্দিরা ফুটবল খেলতেন, আবার ফুটবল পরিচালনাও করতেন। অনেক ইতিহাসবিদ পরে বলেছিলেন, সেটি ছিল এক ধরনের “গণতন্ত্রের বিশ্ববিদ্যালয়”। কারণ সেই কারাগারের ভেতরেই অনেকে শিখেছিলেন নেতৃত্ব, সংগঠন, আলোচনা, নিয়মতান্ত্রিকতা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাঠ।
ম্যান্ডেলা নিজে বয়স ও কারাগারের বিধিনিষেধের কারণে সেই লিগে খেলতে পারেননি। কিন্তু তিনি খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন ফুটবলের গুরুত্ব। বছর গড়িয়ে যায়। ১৯৯০ সালে, দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবাস শেষে নেলসন ম্যান্ডেলা মুক্তি পান। তখন দক্ষিণ আফ্রিকা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অতীতের বিভাজন আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা মুখোমুখি হয়ে আছে। সেই বর্ণবাদী শাসনামলে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে প্রায় নির্বাসিত ছিল। বিশ্ব ফুটবলের মূলধারা থেকেও দেশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। নতুন দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিশ্বের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে ম্যান্ডেলা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নৈতিক ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বেই দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্প্রদায়ের পূর্ণ সদস্য হিসেবে ফিরে আসে এবং বিশ্ব ফুটবলে নতুনভাবে নিজেদের জায়গা করে নিতে শুরু করে।
বিশ্বজুড়ে ম্যান্ডেলার সঙ্গে রাগবির সম্পর্ক বেশি আলোচিত হয়। ১৯৯৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপের গল্প আজ কিংবদন্তি। কিন্তু বাস্তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। টাউনশিপগুলোয়, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে, শহরের প্রান্তিক এলাকায় ফুটবল ছিল মানুষের ভাষা। ম্যান্ডেলা সেটি বুঝতেন।
তিনি ফুটবল প্রশাসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতেন। এরপর আসে ১৯৯৬ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকা আয়োজন করে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস। দেশটির জাতীয় দল বাফানা বাফানা তখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে নবাগত শক্তি। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ম্যান্ডেলা দলটির পাশে দাঁড়ান। তিনি বুঝেছিলেন, এটি নিছক একটি ফুটবল দল নয়; এটি নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতীক। দক্ষিণ আফ্রিকার ২০১০ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রচারণায় ম্যান্ডেলা হয়ে ওঠেন সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং নৈতিক নেতৃত্ব দক্ষিণ আফ্রিকার বিডকে অসাধারণ শক্তি দেয়।
এটি শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজনের স্বীকৃতি নয়, এটি ছিল মর্যাদার স্বীকৃতি। যে মহাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের প্রান্তে রাখা হয়েছিল, সে মহাদেশ এবার বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়াতে যাচ্ছে। ২০১০ সালের জুনে যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী বাঁশি বাজল, তখন লাখ লাখ মানুষের মনে একটি নাম ঘুরছিল—নেলসন ম্যান্ডেলা।
তখন তার বয়স ৯১ বছর। শারীরিকভাবে তিনি আর আগের মতো শক্তিশালী নন। তবুও বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি অল্প সময়ের জন্য স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন। সেই মুহূর্তে হাজার হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানায়। গর্জে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। দৃশ্যটি ছিল প্রতীকী অর্থপূর্ণ।
একসময় যে মানুষটিকে একটি ছোট কারাগারের সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেই মানুষটি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে দেখছেন আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর।
ম্যান্ডেলা প্রায়ই বলতেন, ‘Sport has the power to change the world’. কথাটি পৃথিবীতে এত বেশি উদ্ধৃত হয়েছে যে অনেক সময় এর গভীরতা হারিয়ে যায়। কিন্তু তার কাছে এটি কোনো স্লোগান ছিল না। তিনি সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে খেলাধুলা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, বিভাজন কমাতে পারে এবং এমন মানুষের মধ্যেও সংযোগ তৈরি করতে পারে, যারা অন্যথায় কখনো একে অপরের সঙ্গে কথা বলত না। এ কারণেই তাঁর ফুটবল-দর্শন ছিল অনন্য।
আজ যখন আমরা ফুটবলকে দেখি গোল, ট্রফি, রেকর্ড আর তারকাখ্যাতির চোখে, তখন ম্যান্ডেলার গল্প আমাদের অন্য কিছু মনে করিয়ে দেয়। ফুটবল বর্ণবাদ শেষ করেনি। ফুটবল ম্যান্ডেলাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেনি। ফুটবল দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানও লিখেনি। কিন্তু ফুটবল মানুষকে একটি যৌথ ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সাহায্য করেছিল। আর কখনো কখনো ইতিহাস বদলানোর জন্য সেটুকুই যথেষ্ট।
এ কারণেই নেলসন ম্যান্ডেলা ফুটবলের ইতিহাসে একজন মহান ফুটবলার নন, কোনো কোচ নন, কোনো কর্মকর্তা নন, তবু তিনি ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের একজন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, একটি বল শুধু মাঠে গড়ায় না; কখনো কখনো তা একটি জাতির ভাগ্যকেও এগিয়ে নিয়ে যায়।