টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত, এবার কি বিশ্বকাপ জয়ের পালা মরক্কোর

হিউস্টনে মরক্কো মাত্র পাঁচটি শট নিয়েই জয় তুলে নেয়। বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসে কোনো জয়ী দলের এত কম শট নেয়ার নজির আর নেই। প্রথমার্ধে শটের চেয়ে হলুদ কার্ডই ছিল বেশি, এটিও বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম

ইতিহাস গড়ার পথে রয়েছে মরক্কো, বিশ্বকাপে দলটির অপরাজিত থাকা যেন এ কথা বলছে। কানাডার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় ৩-০ গোলে জয় পেয়েছে দলটি। ওই ম্যাচে যতটা না ছিল খেলার সৌন্দর্য, তার চেয়ে বেশি দৃঢ়তা ও বাস্তবতার প্রদর্শন।

হিউস্টনে মরক্কো মাত্র পাঁচটি শট নিয়েই জয় তুলে নেয়। বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসে কোনো জয়ী দলের এত কম শট নেয়ার নজির আর নেই। প্রথমার্ধে শটের চেয়ে হলুদ কার্ডই ছিল বেশি, এটিও বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম।

তবু জয়ই শেষ কথা। কারণ বড় দলের পরিচয়ই হলো, খারাপ খেলেও জিততে জানা। আর সেই কারণেই মরক্কোকে এখন শুধু বড় দল নয়, বিশ্বকাপের প্রকৃত শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

চলতি বিশ্বকাপে মরক্কো এখনো অপরাজিত। শুধু তাই নয়, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৪ ম্যাচ হারেনি দলটি। যদিও এই রেকর্ডে একটি বিতর্কিত ম্যাচ রয়েছে। চলতি বছরের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে সেনেগালের বিপক্ষে আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে মরক্কোকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল।

সবশেষে তারা হেরেছিল ২০২৫ সালের আগস্টে, কেনিয়ার কাছে আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপে। এরপর আর কোনো ম্যাচে পরাজয়ের মুখ দেখেনি।

কানাডার সঙ্গে ম্যাচের শুরুতে অবশ্য চাপেই ছিল মরক্কো। জনাথন ডেভিড ও টানি ওলুওয়াসেইয়ের দুটি সুযোগ দারুণভাবে ঠেকান গোলরক্ষক বোনো। টানা দ্বিতীয় ম্যাচের মতো প্রথম ১৫ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সেও ঢুকতে পারেনি মরক্কো।

কিন্তু এর পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় তারা। কানাডার কোচ জেসি মার্শ পরে বলেন, ‘মরক্কো কিছুটা নড়বড়ে হয়েছিল, কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েনি।’

ছবি: রয়টার্স

দুই দলেরই বর্তমান প্রজন্মকে 'সোনালি প্রজন্ম' বলা হচ্ছে। তবে এই লড়াইয়ে উজ্জ্বল ছিল মরক্কোই। বেঞ্চে বসে থাকা ইনজুরিতে আক্রান্ত আলফোনসো ডেভিস অসহায়ভাবে দেখেছেন— কীভাবে মরক্কো স্টিফেন ইউস্তাকিওর পাসিং ও জনাথন ডেভিডের আক্রমণ পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে।

অধিনায়ক আক্রাফ হাকিমি দুই প্রান্তেই ছিলেন দুর্দান্ত। আর সৃজনশীল মিডফিল্ডার ব্রাহিম দিয়াজ করেন দুটি অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপে তার মোট অ্যাসিস্ট এখন চারটি, যা কোনো আফ্রিকান ফুটবলারের সর্বোচ্চ।

মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, ‘প্রথমার্ধ ছিল খুবই কঠিন। বিরতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা নিজেদের খেলার ধরন বদলাইনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বকাপে কঠিন সময় আসবেই। তখন মানসিকভাবে শক্ত থাকা জরুরি এবং মনে রাখতে হবে আমরা কার জন্য খেলছি।’

এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে মরক্কো। ২০২২ ও ২০২৬—দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে তাদের নকআউটে জয় এখন চারটি, যা অন্য সব আফ্রিকান দেশের সম্মিলিত জয়ের সমান।

আর একটি জয় পেলেই কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার কীর্তির পুনরাবৃত্তি করবে মরক্কো। যদিও অনেকের মতে, মরক্কো এখনও সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি। সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।

বিশ্লেষক ক্রিস সাটন বলেন, ‘প্রথমার্ধে মরক্কো মোটেও সেরা খেলতে পারেনি। ফ্রান্সের মতো দলের বিপক্ষে এমন শুরু করলে কঠিন মূল্য দিতে হবে। তবে ম্যাচ যত এগিয়েছে, তারা তত শক্তিশালী হয়েছে। পাল্টা আক্রমণে তারা ভয়ংকর।’

মরক্কোর এইসাফল্য অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এর ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০০৯ সালে ফুটবল একাডেমি এবং ২০১৯ সালে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে দেশটির ফুটবল।

এ অবকাঠামোর পাশাপাশি বিদেশে বেড়ে ওঠা মরক্কো বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে টানার কৌশলও সফল হয়েছে। স্পেনে জন্ম নেয়া হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজ তারই উদাহরণ।

ওয়াহবির ভাষায়, ‘আজ আর কেউ আমাদের বিস্ময় বলে না। সবাই মরক্কোকে বিশ্বকাপের প্রকৃত দাবিদার হিসেবে দেখে। এটা শুধু শুরু। আমরা এখানেই থেমে যেতে চাই না।’

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল রূপকথার মতো, যেখানে বিস্ময় ছিল সবচেয়ে বড় গল্প। কিন্তু ২০২৬ সালের মরক্কোকে ঘিরে গল্পটি আর বিস্ময়ের নয়—এটি এখন সঠিক পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস এবং শিরোপার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা এক পরিণত দলের গল্প।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও