হাইড্রেশন ব্রেক নাকি বিজ্ঞাপন বিরতি

শুধুই ৩ মিনিটের বিরতি নাকি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপনী ফন্দি?

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের এ বিরতিতে সরাসরি বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের মূল্য দুই থেকে তিন লাখ ডলার, আর বড় ম্যাচে তা সাড়ে সাত লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। শুধু এ বিরতি থেকেই মার্কিন বাজারে ২৫ কোটি ডলারের বেশি আয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে

ফুটবল মানেই ৯০ মিনিটের দমকা হাওয়া। মাঠের গতি আর গ্যালারির উন্মাদনা যেখানে এক মুহূর্তের জন্যও থামে না। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সে ধারাবাহিক উত্তেজনার মাঝেই হঠাৎ খেলা থেমে যাচ্ছে ৩ মিনিটের জন্য। কাগজে-কলমে এর নাম ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। তবে মাঠের ভেতরে ও বাইরে অনেকের প্রশ্ন, এটি কি সত্যিই খেলোয়াড়দের জন্য, নাকি মাঝখানে বিজ্ঞাপন দেখানোর নতুন কৌশল?

ফিফা বলছে, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে ম্যাচ চলাকালীন বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের পানি পানের বিরতি নিয়ম চালু করা হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার দাবি, তীব্র গরমে ফুটবলারদের শরীর ঠিক রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে সমালোচকদের চোখ এড়াচ্ছে না আসল ঘটনা। অনেকেই বলছেন, ফুটবলারদের সুরক্ষার আড়ালে এটি আসলে কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপনী বাণিজ্য।

কেন বিতর্ক?

ফুটবলের সৌন্দর্যই হচ্ছে তার একটানা গতিতে। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ আর মুহূর্তে বদলে যাওয়া ছন্দই দর্শকদের ধরে রাখে। কিন্তু সেই প্রবাহের মাঝখানে আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, প্রতি অর্ধেকের ২২তম মিনিটে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে খেলা থামিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামেও এ নিয়ম বাধ্যতামূলক। আর খেলা থামার সাথে সাথেই টেলিভিশন পর্দায় ভেসে উঠছে একের পর এক বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন। মাঠের চেনা ছন্দ এভাবে বারবার ভেঙে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ গ্যালারির দর্শক থেকে শুরু করে খোদ ফুটবলাররাও।

‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে এক্সে হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) ডেভিড মস্করোপ নামের এক ব্যবহারকারীর অসন্তোষ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘যদি আমাদের বিজ্ঞাপন দেখতে বাধ্য করা হয়, তবে এটি কোনো পানি পানের বিরতি নয়; এটি আসলে বিজ্ঞাপন বিরতি।’

অনেকেেই আবার অভিযোগ করেছেন, ফুটবল যেন ধীরে ধীরে আমেরিকান বাস্কেটবল বা রাগবির মতো চার কোয়ার্টারের খেলায় রূপ নিচ্ছে।

ফুটবলার ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডাইক এ নিয়মকে অনেকটা কটাক্ষের সুরেই ‘ইন্টারেস্টিং’ বলেছেন। তার মতে, অতিরিক্ত গরম থাকলে বিরতি দেয়া ঠিক আছে। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচ আলাদাভাবে বিবেচনা না করে সব ম্যাচে খেলা থামানো একদমই অযৌক্তিক।

কানাডার আলিস্টেয়ার জনস্টন রসিকতা করে বলেছেন, পানির বিরতি এখন যেন ‘বাণিজ্যিক বিরতিতে’ পরিণত হয়েছে। এ ডিফেন্ডারের মতে, পানি পানের বিরতি এখন মূলত বিজ্ঞাপনের বিরতিতে রূপ নিয়েছে, যা ফিফার পকেট ভারী করছে।

সাবেক স্প্যানিশ তারকা হুয়ান মাতা মনে করেন, এ বিরতি ম্যাচের গতিকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ এভারটন ফক্সও ফিফার এই যুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। নিউইয়র্ক বা মিয়ামির মতো প্রচণ্ড গরমের শহরে এ ধরণের বিরতির যৌক্তিকতা থাকলেও ডালাস, হিউস্টন কিংবা ভ্যাঙ্কুভারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও ছাদ বন্ধ করা স্টেডিয়ামে এর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ফলে পুরো বিষয়টি যে কেবলই একটি বাণিজ্যিক ফন্দি, তা সহজেই অনুমেয়।

পর্দার আড়ালের কোটি ডলারের বাণিজ্য

বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ অর্থনীতি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের এ বিরতিতে সরাসরি বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের মূল্য দুই থেকে তিন লাখ ডলার, আর বড় ম্যাচে তা সাড়ে সাত লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। শুধু এ বিরতি থেকেই মার্কিন বাজারে ২৫ কোটি ডলারের বেশি আয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচে তো বিজ্ঞাপন শেষ হওয়ার আগেই খেলা শুরু হয়ে যায়। এতে দর্শকদের লাইভ খেলা শুরুর প্রথম ১০ সেকেন্ড মিস করতে হয়। এ ঘটনা দর্শকদের চরম ক্ষুব্ধ করে।

দর্শকদের প্রতিবাদ ও হাস্যরস

স্টেডিয়ামের দর্শক ও টিভির দর্শকেরা খেলা থামলেই সমস্বরে ভুয়োধ্বনি দিচ্ছেন। ডালাসে ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচেও এমন ক্ষোভ দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও চলছে তুমুল ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিরতির সময়ে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা কাপ-পিরিচে করে চা খাচ্ছেন, মার্কিন ফুটবলাররা হটডগ ও বিয়ার নিয়ে বার্বিকিউ পার্টি করছেন আর জাপানি খেলোয়াড়েরা খাচ্ছেন সুশি।

বিবিসি, আলজাজিরা ও ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে

আরও