নির্ধারিত সময়ে একমাত্র এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দেয়াল সমকক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বটে, কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের নিকো উইলিয়ামসের বাড়িয়ে দেয়া হেডে ফেরান তোরেসের বাঁ পায়ের সেই মাপা শটটি যখন জালে জড়াল, তখনই লেখা হয়ে গেল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরল স্পেন। যেখানে মেসিদের স্বপ্নভঙ্গের বিপরীতে লেখা হলো স্প্যানিশ ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের নতুন মহাকাব্য। রদ্রি-ইয়ামালরা যখন সোনালি ট্রফিটা শূন্যে উঁচিয়ে ধরলেন, সেই আলোকচ্ছটাতেই যেন ডানা মেলল স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন সাম্রাজ্য।
মাঝমাঠে স্পেনের আধিপত্যের প্রধান কারিগর রদ্রি জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, বল পুনরুদ্ধার ও আক্রমণের ভিত গড়ে দিয়ে স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। আর স্পেনের গোলপোস্টে দুর্দান্ত নির্ভরতার পুরস্কার হিসেবে গোল্ডেন গ্লাভস পেয়েছেন উনাই সিমন।
পুরো ম্যাচে লিওনেল মেসিদের এমনভাবে বোতলবন্দি করে রেখেছিল স্প্যানিশরা যে উনাই সিমনকে পরীক্ষায় ফেলার মতো একটি শটও নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ ছিলেন বিচ্ছিন্ন, আর অন্য প্রান্তে লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, দানি ওলমো, পেদ্রি ও তোরেসের গতিশীল ফুটবলে বারবার ভেঙে পড়েছে আলবিসেলেস্তেদের প্রতিরোধ। ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের হেডে নামানো বল বাঁ পায়ের জোরালো শটে জালে পাঠান তোরেস। যে গোল শুধু ফাইনালের ফল নির্ধারণ করেনি, দিয়েছে স্পেনের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতিও। এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডে ১০ জনে নেমে যাওয়া আর্জেন্টিনা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দাপট, নিয়ন্ত্রণ আর সৌন্দর্যের ফুটবলে আর্জেন্টিনাকে নিঃশেষ করে দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের মুকুট পরল স্পেন।
ম্যাচের প্রথমার্ধে মাঠের লড়াইয়ে স্পষ্ট এগিয়ে ছিল স্পেন। বলের দখল, পাসের গতি, প্রেসিং ও আক্রমণ তৈরিতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা আর্জেন্টিনাকে প্রায় পুরো সময় নিজেদের অর্ধে আটকে রেখেছিল। প্রথম ৪৯ মিনিটে একটি শটও নিতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল। গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথমার্ধে শট নিতে না পারা দ্বিতীয় দল আর্জেন্টিনা; এর আগে ২০২২ সালের ফাইনালে একই পরিস্থিতিতে পড়েছিল ফ্রান্স।
শুরুর পাঁচ মিনিটেই আর্জেন্টিনার রক্ষণে সতর্কবার্তা পাঠান লামিনে ইয়ামাল। ডান প্রান্ত দিয়ে ঢুকে তার শট লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ে লেগে গতি হারালে বল ধরে নেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। এর পরও ইয়ামালের গতি ও বল নিয়ন্ত্রণে বারবার বিপাকে পড়েছেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। ১৬ মিনিটে তার নিচু ক্রস ঠেকিয়ে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। ইয়ামাল বল পেলেই একাধিক খেলোয়াড় তাকে ঘিরে ধরেছে, প্রয়োজনে ফাউল করেও থামিয়েছে আর্জেন্টিনা।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণে লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ষষ্ঠ মিনিটে একটি থ্রু বল ধরে মেসির আগে বেরিয়ে এসে বল ক্লিয়ার করেন উনাই সিমন। এরপর আর স্পেনের গোলমুখে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ৩৪ মিনিটে বাম প্রান্তে ফ্রি কিক পেয়েও মেসি সরাসরি বক্সে বল না তুলে ছোট পাস খেলেন; স্পেন দ্রুত বলের দখল ফিরিয়ে নেয়।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে স্পেনের চাপ আরো বাড়ে। ৩৯ মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের শট ঠেকিয়ে দেন এমি মার্টিনেজ। পরের মিনিটেই স্প্যানিশ প্রতি-আক্রমণ থামাতে গিয়ে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো।
আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বিরতির ঠিক আগে। ৪৪ মিনিটে ঊরুর সমস্যায় মাঠে বসে পড়েন লিসান্দ্রো। নিজেই বদলির ইঙ্গিত দিলে তাকে তুলে নিকোলাস ওটামেন্দিকে নামান স্কালোনি। হতাশ লিসান্দ্রো চোখেমুখে যন্ত্রণা নিয়েই মাঠ ছাড়েন। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা রক্ষণে টিকে থেকেছে, কিন্তু আক্রমণে কার্যত অস্তিত্বহীন ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধেও বদলায়নি ম্যাচের চিত্র। স্পেন বলের দখল ও আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে একের পর এক সুযোগ তৈরি করেছে, আর আর্জেন্টিনা প্রায় পুরো সময় নিজেদের রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত থেকেছে। দ্বিতীয়ার্ধে মাঝমাঠে নিকো গঞ্জালেসের জায়গায় লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামান লিওনেল স্কালোনি। কিন্তু পরিবর্তনেও আর্জেন্টিনার খেলার গতি কিংবা আক্রমণাত্মক ধারায় কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো মাঠে নামার ছয় মিনিটের মধ্যেই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস। দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছুটা ধাক্কাধাক্কিও হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম মিনিটেই বায়েনার শট ঠেকান এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৫৫ মিনিটে লামিনে ইয়ামাল, ফাবিয়ান রুইস ও মিকেল ওয়ারজাবালের দৃষ্টিনন্দন সমন্বয়ে গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল স্পেন। তবে শেষ মুহূর্তে ওয়ারজাবালের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন নিকোলাস ওটামেন্দি।
পরের মিনিটে দানি ওলমোর কাটব্যাক থেকে মার্ক কুকুরেয়াকে শট নিতে দেননি গঞ্জালো মন্তিয়েল। ঝাঁপিয়ে পড়ে বল কর্নারের বাইরে পাঠান তিনি। ওই গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপের দুই মিনিট পরই মন্তিয়েলকে তুলে নাহুয়েল মোলিনাকে মাঠে নামান স্কালোনি।
৬১ মিনিটে প্রথম পরিবর্তন করেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ওয়ারজাবাল ও ফাবিয়ান রুইসের বদলে পেদ্রি ও ফেরান তোরেসকে নামান তিনি। বদলি খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে স্পেনের আক্রমণ আরো গতিশীল হয়ে ওঠে। ৬৪ মিনিটে ওলমোর দূরপাল্লার শট এমির সামনে পড়ে আচমকা লাফ নিলে তিনি প্রথম চেষ্টায় বল ধরে রাখতে পারেননি। কর্নারের বিনিময়ে বিপদ এড়ান আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।
ইয়ামালও দুই প্রান্ত বদলে আর্জেন্টিনার রক্ষণে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন। ৬৭ মিনিটে তার ক্রস থেকে ফেরান তোরেসের হেড সরাসরি এমির হাতে যায়। দলকে আক্রমণে ফেরাতে ৭০ মিনিটে আরো দুটি পরিবর্তন করেন স্কালোনি। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও রদ্রিগো দে পলকে তুলে জিউলিয়ানো সিমিওনে ও ফাকুন্দো মেদিনাকে নামান তিনি।
৭৮ মিনিটে পেদ্রির শট সহজে ধরলেও পরক্ষণেই পাও কুবারসির দূরপাল্লার শট ঠেকাতে এমিকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। ৮০ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের ভাসানো ক্রস থেকে আয়মেরিক লাপোর্তের হেডও ঠেকিয়ে দেন তিনি। মেদিনার চাপে লাপোর্তে ভালোভাবে হেড নিতে না পারায় কাজটি কিছুটা সহজ হয় আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের।
স্পেনের টানা চাপের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে আর্জেন্টিনার। ৮২ মিনিটে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। এর কিছুক্ষণ পরই আর্জেন্টিনার বিপদ আরো বাড়ে। কুবারসির ওপর বেপরোয়া ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে।
যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলে প্রায় ৩০ গজ দূরে ফ্রি কিক পায় স্পেন। ইয়ামালের শট গোলরক্ষকের দিকেই ছিল, পর্যাপ্ত শক্তিও ছিল না। বল ধরে নির্ধারিত সময়ে আর্জেন্টিনাকে হার থেকে বাঁচান এমি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ে ১০৬ মিনিটে অবশেষে আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ ভেঙে গোল পায় স্পেন। বক্সে আসা গভীর ক্রস পেছনের পোস্ট থেকে হেড করে বিপজ্জনক জায়গায় নামিয়ে দেন নিকো উইলিয়ামস। আলগা বল পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে জালে পাঠান ফেরান তোরেস। স্পেনকে এগিয়ে দিয়ে দেশটির ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম লিখে ফেললেন তিনি।
২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার ১১৬ মিনিটের গোলে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। ষোলো বছর পর আরেক ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে তাদের নায়ক হলেন তোরেস। বাকি সময়ে ১০ জনের আর্জেন্টিনা সমতায় ফেরার মতো কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজতেই স্প্যানিশ উল্লাসে রাঙা হয়ে ওঠে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম। আর মাঠের অন্য প্রান্তে নেমে আসে বিষাদ—দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ছোঁয়ার স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন মেসি। বিশ্বমঞ্চে তার সম্ভাব্য শেষ ম্যাচটি শেষ হয় ট্রফির বদলে পরাজয়ের দীর্ঘ ছায়ায়।