বিশ্বকাপ ২০২৬

অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট সাপোর্টার হলো পিআইএফ

সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের ‘অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট সাপোর্টার’ হিসেবে যুক্ত হলো।

তারা কার্যক্রম পরিচালনা করবে উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায়। বৃহস্পতিবার এ চুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ক্রীড়ায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রাখল মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশটির এ সংস্থা।

ফিফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চুক্তিটি ফুটবলের প্রসারে দুই পক্ষের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। নতুন এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে এলিট টুর্নামেন্ট—সর্বত্র একত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হলো।

ফিফা জানায়, এ চুক্তির ফলে পিআইএফের কোম্পানি স্যাভি গেমস গ্রুপ ছাড়াও সৌদি আরবের জাতীয় ও বৈশ্বিক চ্যাম্পিয়ন এবং দেশটির ভবিষ্যৎ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক রাজধানী কিদিয়া সিটিও যুক্ত হলো বিশ্বকাপের সঙ্গে। টুর্নামেন্টের সময় পিআইএফ ও এর কোম্পানিগুলো অবিস্মরণীয় সব অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হবে দর্শকদের জন্য। তারা বিশ্বকাপের সঙ্গে দর্শকদের সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করবে।

ফিফার চিফ বিজনেস অফিসার রমি গাই এ চুক্তি নিয়ে বলেন, ‘ক্রীড়াকে বদলে দেয়া এবারের বিশ্বকাপে পিআইএফকে অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট সাপোর্টার হিসেবে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা একত্রে এ টুর্নামেন্টকে ঘিরে ইতিহাস গড়তে চাই এবং বিশ্বব্যাপী সমর্থকদের এক সুতোয় গাঁথতে চাই।’

চুক্তির ঘোষণায় সৌদি আরবের এ বিনিয়োগ তহবিল বলেছে, খেলা সবসময়ই তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল এবং বিশেষ করে ফুটবল সৌদি আরবের চলমান রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি মাসে পিআইএফ জানায়, এলআইভি গলফে ভবিষ্যতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে তারা সরে আসছে। এলআইভি গলফ ট্যুরের বড় মাপের প্রতিযোগিতা। এখানে যদি বিনিয়োগ করতে না চায় তবে অন্য খেলা থেকেও সরে আসতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গলফ, টেনিস, বক্সিংসহ অনেক খেলা কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে আসছে সৌদি আরব।

বিশ্বকাপের সঙ্গে সৌদি আরবের পিআইএফের চুক্তির আর্থিক মূল্যটা প্রকাশ করা হয়নি। এ চুক্তির মধ্য দিয়ে ফিফার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কটা আরো মজবুত হলো। কাতারে অনুষ্ঠিত গত বিশ্বকাপ আসরেও কমার্শিয়াল পার্টনার ছিল পিআইএফ। এছাড়া ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে সৌদি আরব। এদিক থেকেও ফুটবলের গভর্নিং বডির সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত।

বিশ্বকাপ সম্প্রচারের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে পিআইএফ। এ বিনিয়োগ তহবিলের মালিকানাধীন সূর্য স্পোর্টস অনলাইন স্ট্রিমার ডিএজেডএনে বিনিয়োগ করেছে। ডিএজেডএন বিশ্বকাপ ম্যাচ সম্প্রচারের স্বত্ব লাভ করেছে।

ফিফার হিসাব মতে, সংস্থাটির বার্ষিক আয়ের সিংহভাগই আসে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে, যা ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।

সৌদি আরব ক্রমেই ফুটবলের দিকে ঝুঁকছে। দেশটি এখন আর শুধুই তেলনির্ভর অর্থনীতির ওপর ভরসা করতে চায় না। ফলে নানাভাবে ফুটবলে বিনিয়োগ করে খেলাটিকে জনপ্রিয় করে তুলতে তৎপর। একাধিকবার বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার রেসে ছিল। অবশেষে ২০৩৪ সালের আয়োজক স্বত্ব পেয়েছে দেশটি। এট এমনিতে আসেনি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার, করিম বেনজেমা, সাদিও মানের মতো ফুটবলারকে সৌদি পেশাদার লিগে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে। রোনালদোর চুক্তিটা ঈর্ষণীয়। বছরে তিনি ২০ কোটি ডলারেরও বেশি পারিশ্রমিক নেন আল-নাসের ক্লাব থেকে। বাকিদেরও কোটি কোটি ডলার দিতে হয়। জানা গেছে, এ অর্থের বেশির ভাগ বহন করে সৌদি আরব সরকার তথা পিআইএফ।

বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার রেসে জিততেই এসব তারকাকে লিগের বিভিন্ন ক্লাবে সই করানো হয়। এর আগে ফুটবলের আরেক মহাতারকা লিওনেল মেসিকেও চুক্তির প্রস্তাব করেছিল সৌদি লিগের একটি দল। যদিও আর্জেন্টাইন সুপারস্টার এখানে না এসে নাম লেখান যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে।

শুধু তারকা খেলোয়াড় সই করানোতেই শেষ নয়, ইউরোপের ফুটবলেও বিনিয়োগ করছে সৌদি আরব। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল নিউক্যাসলের মালিকানা এখন সৌদি সরকারের। তাদের এত সব বিনিয়োগ ও পরিশ্রম সফল হয়েছে বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার মধ্য দিয়ে।

ফুটবলের বাইরে ফর্মুলা ওয়ান, বক্সিং, টেনিসে বিনিয়োগ করেছে সৌদি আরব। সমালোচকরা এটাকে বলছেন ‘স্পোর্টসওয়াশিং’। ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জামাল খাসোগিকে হত্যার অভিযোগ ওঠে সৌদি যুবরাজ প্রিন্স সালমানের বিরুদ্ধে। এছাড়া মানাবাধিকার লঙ্ঘনের আরো কিছু অভিযোগ রয়েছে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে। এসব আড়াল করতেই স্পোর্টসে কোটি কোটি ডলার ঢালছে সৌদি আরব।

২০২২ সালে এলআইভি গলফ ট্যুরের অভিষেকটা ছিল বিতর্কিত। ব্রাইসন দেচাম্বু, ফিল মিকেলসন, ব্রুকস কোয়েপকা ও ডাস্টিন জনসনের মতো তারকাকে পিজিএ থেকে সরিয়ে সৌদির এ ট্যুরে আকৃষ্ট করা হয়। চলতি বছর শেষে এলআইভি গলফের ব্যয় ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোপভিত্তিক শীর্ষ ফুটবলারদের অনেকেই সৌদি আরবের অর্থের মোহে পড়েন। তবে এখন সেই প্রবণতা কমে এসেছে। এর পরও ফুটবলকে সবচেয়ে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখছে পিআইএফ।

ফিফা বিশ্বকাপের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে পিআইএফের করপোরেট ব্র্যান্ডের প্রধান মোহাম্মদ আলসৈয়দ বলেন, ‘বিশ্ব ক্রীড়ায় পদচিহ্ন রেখে যাবে পিআইএফ, আর ফুটবল থাকছে পরিকল্পনার কেন্দ্রে। গতবারের মতো আবারো ফিফা বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত হলাম আমরা। কনকাকাফকে নিয়ে আমরা এমন কিছু করতে চাই যা ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখতে সমর্থ হবে।’

এছাড়া সৌদি আরবের জ্বালানি ও কেমিক্যাল খাতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি আরামকো আগে থেকেই ফিফার সঙ্গে জুটিবদ্ধ। তারা ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পার্টনার। এবার সাপোর্টার হিসেবে যুক্ত হলো পিআইএফ। ফিফা ডটকম ও ইএসপিএন

আরও