চার মাস্কেটিয়ারে আরো ভয়ংকর ফ্রান্স

আলেক্সাদ্র দুমার অমর সৃষ্টি ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’-এর পাতা থেকে যেন উঠে এসেছে একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, যাদের সম্মিলিত আক্রমণে প্রকম্পিত হচ্ছে আধুনিক ফুটবলের সবুজ গালিচা।

তবে ফরাসি ব্রিগেডে মাস্কেটিয়ার তিনজন নন, চারজন। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলা। দেম্বেলে তার ক্ষিপ্রতা দিয়ে ডান প্রান্ত চিরে ফেলছেন, বারকোলা তারুণ্যের উদ্দামতা নিয়ে বাঁ প্রান্তে ত্রাস ছড়াচ্ছেন, ওলিসে মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন, আর এমবাপ্পে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এ ধ্বংসযজ্ঞের।

এ চার জাদুকর যেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বিভীষিকাময় ক্যানভাসে পরিণত করেছেন, যেখানে তারা আঁকছেন ধ্বংস আর সৌন্দর্যের অনবদ্য যুগলবন্দি। নিউ জার্সিতে সেই চার মাস্কেটিয়ারের সামনে টিকতে পারেনি সুইডেনও। এমবাপ্পের জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ৩-০ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলো পেরিয়ে ফ্রান্স আরো জোরালোভাবে জানিয়ে দিল শিরোপার পথে তাদের থামানো কতটা কঠিন।

নিউ জার্সির বিকালটা ছিল দমবন্ধ করা গরমে মোড়া। তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি, মাঠের উত্তাপ ছিল আরো বেশি। এমন আবহাওয়ায় সাধারণত দলগুলো ছন্দ কমিয়ে দেয়, শক্তি বাঁচিয়ে খেলে। কিন্তু ফ্রান্স যেন অন্য এক পদার্থবিদ্যার নিয়মে চলে। তারা মুহূর্তেই এমন গতি তোলে যে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের মতো টেলিভিশন ক্যামেরাও তাদের অনুসরণ করতে হিমশিম খায়।

ফরাসি আক্রমণভাগ যেন এক মায়াবী ছন্দে, এক অলৌকিক স্থিরতায় মাঠের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছিল। এ চারজনের সমন্বয় এতই নিখুঁত আর এতই ভয়ংকর যে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মনে হয় যেন অদৃশ্য গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলেছেন। নরওয়ের কোচ স্টেল সোলবাকেন যেমনটি বলেছেন, ‘এ টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের সামনের চারজনের আক্রমণভাগ অন্য যেকোনো দলের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।’

এ চার মাস্কেটিয়ারের মধ্যে মাইকেল ওলিসে নীরব ঘাতক, ঐন্দ্রজালিক মাস্টারমাইন্ড। মাঠের বাইরে তিনি হয়তো এক লাজুক, অন্তর্মুখী তরুণ, কিন্তু বল পায়ে যেন পাস দেন না ছোড়েন বিষাক্ত তীর, যা নিখুঁত নিশানায় বিদ্ধ করেছে সুইডিশ রক্ষণকে। প্রথমার্ধে তার একটি বাইসাইকেল কিক যখন পোস্টে লেগে ফিরে আসে, তখন পুরো স্টেডিয়াম যেন এক অসীম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ বিশ্বকাপে এরই মধ্যে পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন কিংবদন্তি পেলের ১৯৭০ বিশ্বকাপের রেকর্ডকে। আর মাত্র কয়েকটি অ্যাসিস্ট তাকে নিয়ে যেতে পারে মেসি ও মাতার এক মৌসুমে করা সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের চূড়ায়।

সুইডেনের ম্যাচের প্রথম গোল আসে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে। ছোট কর্নার থেকে দেম্বেলের পাস, এক ঝটকায় দুই ডিফেন্ডারকে সরিয়ে ডান পায়ের বাঁকানো শট। জ্যাকব জেটারস্ট্রম শুধু বলের শব্দ শুনলেন, থামাতে পারলেন না। বল জালে জড়াতেই এমবাপ্পে ছুটলেন সাইডলাইনের দিকে। সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন দিদিয়ের দেশমকে, যিনি কয়েক দিন আগেই মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে দলে ফিরেছেন।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ওলিসের শিল্প। মাঝমাঠ থেকে এমন এক থ্রু পাস, যা গুস্তাফ লাগেরবিয়েলকের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে সোজা পৌঁছে গেল বারকোলার দৌড়ের সামনে। সময় নষ্ট না করে বল জালে পাঠালেন প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের উইঙ্গার। স্কোরলাইন ২-০। ফ্রান্সের চার আক্রমণভাগ ক্রমাগত জায়গা বদলাচ্ছিল। কখনো এমবাপ্পে মাঝখানে, কখনো বাম দিকে, কখনো দেম্বেলে ভেতরে ঢুকছেন, কখনো ওলিসে নিচে নেমে খেলছেন। কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান ছিল না, ছিল শুধু গতিশীলতা।

৭৪ মিনিটে আবারো ওলিসে। এবার তার মাপা থ্রু বলের পেছনে ছুটে গিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেন এমবাপ্পে। নিজের দ্বিতীয় গোল, টুর্নামেন্টে ষষ্ঠ। বিশ্বকাপে তার মোট গোল দাঁড়াল ১৮, ইতিহাসের তালিকায় লিওনেল মেসির মাত্র এক গোল পেছনে। চলতি বিশ্বকাপে ৬ গোল নিয়ে মেসির সঙ্গে শীর্ষে।

ফ্রান্সের এ দুর্দান্ত আক্রমণভাগের রূপকার দিদিয়ের দেশম। একসময়ের রক্ষণাত্মক, হিসেবি ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের প্রবক্তা দেশম এ বিশ্বকাপে তার দলকে যেন এক মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে দিয়েছেন। ৪-২-৩-১ ফরমেশনে দলটি শুধু জয় নয়, প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য খেলে। দেশম তার দলের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন এ চার মাস্কেটিয়ারের হাতে। এ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে ১৩ গোল করে ফেলেছে ফ্রান্স। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে ১৪ গোল করে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ফ্রান্স এবার যেন আরো বেশি ক্ষুধার্ত, আরো বেশি ভয়ংকর।

আরও