পাহাড়-টিলা আর চা বাগান পরিবেষ্টিত নৈসর্গিক সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় ব্যাট হাতে ফুল ফোটালেন তাওহীদ হৃদয়। ২৪২ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে রেকর্ড বুকটা নতুন করে লিখলেন মাঝারি উচ্চতা আর ছিপছিপে গড়নের এ ক্রিকেটার। এটা বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেয়ার পথে গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড। হৃদয়ের এ রেকর্ড গড়া ডাবল সেঞ্চুরিতে ভর করেই সিলেট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রান টপকে লিড নিতে সমর্থ হয় স্বাগতিকরা।
তৃতীয় দিন অবিশ্বাস্যভাবে হৃদয়ই ম্যাচের মোড়টা ঘুরিয়ে দেন। ৩ উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে গতকাল তৃতীয় দিন শুরু করা বাংলাদেশ প্রথম সেশনেই হারিয়ে ফেলে আরো ৪ উইকেট। ৭ উইকেটে ২০৫ রান তুলে লাঞ্চে যায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল। সফরকারীরা তখন ১৫০ রানের লিড নেয়ার আশায়। হৃদয়ের নামের পাশে ততক্ষণে ১০০ রান। ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটিকে তিনি রূপ দেন সেঞ্চুরিতে। কিন্তু দায়িত্বটা সেখানেই শেষ করলেন না। দলকে ছাই-ভস্ম থেকে টেনে তুললেন অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় এক লড়াইয়ে।
এ লড়াইয়ে তিনি সহযোদ্ধা হিসেবে পান বোলার তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদকে, যারা দুজনই পুরোদস্তুর ব্যাটার হয়ে উঠলেন দলের প্রয়োজনে। অষ্টম উইকেটে তাইজুলকে নিয়ে ১৬৭ বলে ১১৭ ও নবম উইকেটে তাসকিনকে নিয়ে ১২১ বলে ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। তাইজুলের সঙ্গে জুটিতে ৯২ ও তাসকিনের সঙ্গে জুটিতে তার ব্যাট থেকে আসে ৬৯ রান!
ফিল্ডিংয়ে চোট পাওয়ায় ওপেনার সাদমান ইসলাম ব্যাটিংই করতে পারেননি। ফলে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ খেলেছে একজন ব্যাটার কম নিয়ে। নবম ব্যাটার হিসেবে দলীয় ৩৮৬ রানে তাসকিন আউট হয়ে গেলে সেখানেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস, হৃদয়ের লড়াইও। ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন ডানহাতি এ ব্যাটার। তার অনন্যসাধারণ দক্ষতা, ধৈর্য আর সৃষ্টিশীলতায় টেস্ট ক্রিকেটে স্মরণীয় একটি দিন পার করতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। ভরাডুবির শঙ্কা তাড়িয়ে তিনি টাইগারদের এনে দেন ৩০ রানের লিড।
মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের পর চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন হৃদয়। সেই সঙ্গে মুশফিকের ২১৯ রানের রেকর্ড ভেঙে হৃদয়ই এখন দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংস খেলার গৌরবের অধিকারী।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ দলের মিডল অর্ডারের অন্যতম আস্থার নাম হয়ে ওঠা হৃদয়ের টেস্ট অভিষেক হয়েছে এ বছরই। দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘এ’ দলের হয়ে ৩৫০ রান করে তিনি টেস্ট দলে ডাক পান। জুনে হারারে টেস্টে অভিষেকের পর ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে খেলেছেন মিরপুর টেস্টে। ঢাকায় দুই ইনিংস মিলিয়ে করেন ৪২ রান। এবার তৃতীয় টেস্টে এসে জীবনের সেরা ইনিংসটা খেললেন ২৫ বছর বয়সী এ ব্যাটার।
মিরপুর টেস্টে ১৪ উইকেট শিকার করে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান ও রোস্টন চেজ। সিলেটে গতকাল বাংলাদেশের পতন হওয়া চারটি উইকেটই নেন এ দুজন। তখন পর্যন্ত কর্তৃত্বটা ওয়ারিক্যানদের হাতেই ছিল। এরপর হৃদয়, তাইজুল ও তাসকিনের ধনুর্ভঙ্গ পণের কাছে হার মানেন তারা।
দলের ৩০১ রানের সময় হৃদয় ও তাইজুলের ১১৭ রানের দুর্দান্ত জুটি ভাঙেন ওয়ারিক্যান। তার বলে তাইজুলকে স্টাম্পিং করেন উইকেটকিপার আমির জাঙ্গু। ৫৬ বলে ৩ বাউন্ডারিতে ২২ রান করেন তাইজুল। এরপর তাসকিনকে নিয়ে যোগ করেন আরো ৮৫ রান।
টেল-এন্ডারদের নিয়ে খণ্ড খণ্ড লড়াইয়ে নিজেও একের পর এক রেকর্ড গড়েন হৃদয়। ৩৫৯ বলে ৬৭.৪০ স্ট্রাইক রেটে ২৪২ রান করেন হৃদয়। ইনিংসটা সাজিয়েছেন ১১টি ছক্কা ও ২২টি চারের সাহায্যে। টেস্টে দেশের হয়ে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ডটা এখন তারই দখলে। এছাড়া বিশ্বে যুগ্মভাবে দুইয়ে তিনি। আরো ছয়জনের আছে এক ইনিংসে ১১টি করে ছক্কা মারার রেকর্ড। তার চেয়ে বেশি ছক্কা (১২টি) মারার রেকর্ড আছে দুজনের।
এর আগে প্রথম ইনিংসে ৩৫৬ রান তুলে অলআউট হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৯০ রানে ৬ উইকেট নেন বাংলাদেশের পেস বোলার হাসান মাহমুদ। দ্বিতীয় দিনের নায়ক ছিলেন হাসান। তৃতীয় দিন সবটুকু আলোই কেড়ে নেন হৃদয়।