স্পেনের নিখুঁত ছক ভাঙতে পারবে বেলজিয়াম?

টানা ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত স্পেন। বিশ্বকাপের চার ম্যাচে একটিও গোল খায়নি। শেষ ষোলোতে বিদায় করেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে।

টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সংগঠিত দল হিসেবেই কোয়ার্টার ফাইনালে নামছে লা রোজা। আজ রাত ১টায় লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। শুরুতে হোঁচট খেলেও ধীরে ধীরে ছন্দ ফিরে পাওয়া, আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত রুডি গার্সিয়ার দল। সেনেগালের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, এরপর স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে স্পেনকে সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছে রেড ডেভিলরা। তাই কাগজে-কলমে স্পেন এগিয়ে থাকলেও ২০১৮ সালে ব্রাজিলকে বিদায় করা বেলজিয়াম বিশ্বাস করছে আরেকটি অঘটন ঘটিয়ে দিতে তারা প্রস্তুত।

স্পেন এ বিশ্বকাপে নিজেদের পরিচয় গড়েছে আক্রমণের ঝলক দিয়ে নয়, বরং খেলার নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচটি হয়তো নিরপেক্ষ দর্শকদের খুব বেশি আনন্দ দেয়নি। লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস কিংবা মিকেল ওয়ার্সাবালের মতো ফুটবলারদের নিয়ে সবাই যেখানে রোমাঞ্চকর এক লড়াইয়ের অপেক্ষায় ছিল, সেখানে ম্যাচটি পরিণত হয়েছিল কৌশলের দাবার ছকে। কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল তাতে মোটেও বিচলিত নয়। তাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপ জেতা। পর্তুগালের মতো প্রতিপক্ষকে ৯০ মিনিট ধরে ধৈর্যের পরীক্ষায় রেখে শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর গোলে জয় তুলে নেয়া সেই মানসিক শক্তিরই প্রমাণ।

স্পেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাদের রক্ষণভাগ। পুরো টুর্নামেন্টে এখনো কোনো দল তাদের জালে বল পাঠাতে পারেনি। তরুণ পাও কুবার্সি পরিণত ফুটবল খেলছেন। আয়মেরিক লাপোর্তে অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে যাচ্ছেন প্রতিটি ম্যাচে। দুই ফুলব্যাক মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পরো আক্রমণ-রক্ষণ দুই দিকেই সমান কার্যকর। বিশেষ করে কুকুরেয়া পুরো টুর্নামেন্টেই অন্যতম সেরা পারফরমার। আর টটেনহ্যামে সমালোচিত হওয়া পেদ্রো পরো স্পেনের জার্সিতে যেন নতুন জীবন খুঁজে পেয়েছেন। তাদের এ চারজনের সমন্বয়ই স্পেনকে এমন এক রক্ষণভাগ উপহার দিয়েছে, যা ভাঙা এখন পর্যন্ত কোনো দলের পক্ষেই সম্ভব হয়নি।

স্পেনকে নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। তারা বলের দখল ধরে রাখে, প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে ঠিকই, কিন্তু শেষ তৃতীয়াংশে আগের মতো ধার দেখা যাচ্ছে না। পর্তুগালের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ধরেই গোলের সুযোগ তৈরি করতে ভুগেছে তারা। লামিনে ইয়ামাল এখনো পুরোপুরি চোট কাটিয়ে আগের ধার ফিরে পাননি। মাঝেমধ্যে তার একক নৈপুণ্য ম্যাচের গতি বদলে দেয় ঠিকই, কিন্তু সারা ম্যাচে সেই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচ জিততে আক্রমণে আরো কার্যকর হওয়ার বিকল্প নেই।

স্পেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সম্ভবত তাদের বেঞ্চ। পর্তুগালের বিপক্ষে গোলদাতা মিকেল মেরিনো ও অ্যাসিস্ট করা ফেরান তোরেস বদলি হিসেবে নেমেছিলেন। এখানেই বড় দলগুলোর পার্থক্য তৈরি হয়। প্রথম একাদশ ভালো হওয়া যথেষ্ট নয়, ম্যাচের শেষ আধঘণ্টায় সমান মানের ফুটবলার নামানোর সামর্থ্যই বড় টুর্নামেন্টে ভাগ্য নির্ধারণ করে। স্পেন সেই দিক থেকে এগিয়ে। দে লা ফুয়েন্তের হাতে এমন বিকল্প রয়েছে, যারা ম্যাচের গতিপথ এক মুহূর্তে বদলে দিতে পারে।

অন্যদিকে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ যাত্রা যেন দুই ভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত। গ্রুপ পর্বে তারা নিজেদের ছায়া হয়ে ছিল। মিসর ও ইরানের বিপক্ষে কাঙ্ক্ষিত ফুটবল খেলতে পারেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বড় জয় আত্মবিশ্বাস ফেরালেও খুব বেশি মানুষ তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেনি। কিন্তু নকআউটে এসে দলটি যেন নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। সেনেগালের বিপক্ষে শেষ ৫ মিনিটে দুই গোল করে অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ নিয়ে গিয়ে নাটকীয় জয়, এরপর স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে তারা।

রুডি গার্সিয়ার অধীনে এ বেলজিয়াম আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী। তিনি নামের চেয়ে ফর্মকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কেভিন ডি ব্রুইনের মতো কিংবদন্তিকেও একাদশের বাইরে রেখে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে দ্বিধা করেননি। এখন অবশ্য বড় প্রশ্ন, স্পেনের বিপক্ষে কি অভিজ্ঞ ডি ব্রুইনেকে ফিরিয়ে আনা হবে? আমাদু ওনানার এসিএল ইনজুরির কারণে মাঝমাঠে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ইউরি তিলেমান্স দারুণ খেলছেন, কিন্তু স্পেনের মতো বল নিয়ন্ত্রণে দক্ষ দলের বিপক্ষে ডি ব্রুইনের অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা কি বেশি প্রয়োজন, নাকি তার সীমিত গতিশীলতা দলকে বিপদে ফেলবে সেই সিদ্ধান্তই হয়তো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

বেলজিয়ামের আরেকটি বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। চার্লস ডি কেটেলারে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। আর রোমেলু লুকাকু বেঞ্চ থেকে নেমে যেভাবে প্রভাব ফেলছেন, তা যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৯৩ গোল করা এ স্ট্রাইকার পুরোপুরি ফিট না থাকলেও ম্যাচের শেষ দিকে ক্লান্ত রক্ষণভাগের বিপক্ষে তার উপস্থিতি বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। স্পেনের এখনো পর্যন্ত নিখুঁত রক্ষণভাগের সামনে লুকাকুর শারীরিক শক্তি ও বক্সে উপস্থিতি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বেলজিয়ামের দুর্বলতাও স্পষ্ট। তারা এ বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে রক্ষণে ভুল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বড় জয় এলেও প্রতিপক্ষ একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল। স্পেনের মতো দলকে সেই সুযোগ দিলে শাস্তি পেতেই হবে। জিনে-থিয়েরি ডেবাস্ট ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরলেও এখনো পুরোপুরি ম্যাচ ফিট নন। তাকে শুরু থেকে নামানোর ঝুঁকি নেয়া কঠিন। ফলে রক্ষণভাগের পুরনো সমস্যাই থেকে যাচ্ছে।

গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অবশ্য বিশ্বাস হারাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন স্পেনে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন প্রতিপক্ষের শক্তি কোথায়। তার মতে, স্পেন বলের দখল ধরে রাখবে, বল হারালে সঙ্গে সঙ্গে প্রেস করবে। তাই বেলজিয়ামের সাফল্য নির্ভর করবে সেই প্রেস ভেঙে দ্রুত স্পেনের রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গায় আঘাত হানার ওপর। কোর্তোয়ার বিশ্বাস, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের হারানো কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বিশ্বকাপে চমক সবসময়ই থাকে, আর সেই চমক এবার বেলজিয়ামই হতে পারে। ইতিহাসও বেলজিয়ামকে সাহস জোগায়। ২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষেও তারা আন্ডারডগ ছিল। কিন্তু সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং নিখুঁত পরিকল্পনায় সেলেসাওদের হারিয়ে দিয়েছিল তারা।

পরিসংখ্যান এবং দলের শক্তিমত্তার বিচারে স্পেনই ফেভারিট। তাদের বেঞ্চের শক্তি এবং সুশৃঙ্খল ফুটবল বেলজিয়ামের জন্য পার হওয়া কঠিন হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে চার গোল করা বেলজিয়ামের আক্রমণভাগ যদি স্পেনের রক্ষণভাগের প্রথম পরীক্ষা নিতে পারে এবং কোর্তোয়া যদি গোলপোস্টের নিচে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারেন, তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের রাতটি রেড ডেভিলসদের রূপকথার রাতও হতে পারে। টুর্নামেন্টের শুরুর দিকের সমালোচনা কাটিয়ে বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত এসে এরই মধ্যে তাদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, স্পেনের অপরাজেয় রথ থামিয়ে রুডি গার্সিয়ার দল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখতে পারে কিনা, নাকি স্পেনের অলরাউন্ড ফুটবল বেলজিয়ামের স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটায়।

আরও