আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসর

দুই দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি।

গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর আর জাতীয় দলের হয়ে না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এ ফুটবলার।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেয়া এক বার্তায় অবসরের ঘোষণা দেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। এর মধ্য দিয়ে আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসির ২১ বছরের পথচলা শেষ হলো।

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে গেলেও এখনই পেশাদার ফুটবল ছাড়ছেন না মেসি। মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন বার্সেলোনার এ কিংবদন্তি।

মেসি লিখেছেন, ‘ফাইনালের পর কিছুটা সময় পেরিয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে আমি সবাইকে জানাতে চাই, জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি।’ সিদ্ধান্তটি যে তার জন্য সহজ ছিল না, সেটিও স্পষ্ট করেছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এ ফুটবলার। তিনি লিখেছেন, ‘সিদ্ধান্তটি আমাকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনো মনের গভীরে কষ্ট দেয়। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি, সময় এসে গেছে।’

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় লিওনেল স্কালোনির দল। ম্যাচে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখায় একপর্যায়ে ১০ জনের দলে পরিণত হয়েছিল আর্জেন্টিনা।

স্পেনকে হারাতে পারলে ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের সাফল্যের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ত আর্জেন্টিনা। মেসিরও সুযোগ ছিল ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে স্মরণীয় করে রাখার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রানার্সআপ হয়েই বিদায় নিতে হয় তাকে।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলে ১২৫ গোল করেছেন মেসি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন শুধু পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তবে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোল—দুই রেকর্ডই মেসির দখলে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয়েছিল মেসির।

১৮ বছর বয়সী মেসির সেই অভিষেক অবশ্য সুখকর ছিল না। বদলি হিসেবে মাঠে নামার ১ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সেই হতাশার শুরু পেরিয়ে পরবর্তী দুই দশকে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি।

জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের জন্য মেসিকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে ফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ওই আসরে প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন তিনি।

এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারে আর্জেন্টিনা। ২০১৬ সালের ফাইনালে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার পর আবেগাপ্লুত মেসি একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত বদলে জাতীয় দলে ফেরেন তিনি।

দীর্ঘ শিরোপাখরা কাটে ২০২১ সালে। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে সেটিই ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। পরের বছর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমার শিরোপা জেতে তার দল।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। সাত গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে তিনটি গোল করানো মেসি দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বল জেতেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুবার প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হওয়ার প্রথম কীর্তিও গড়েন তিনি।

এরপর ২০২৪ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ফলে মেসির নেতৃত্বে চার বছরের মধ্যে বিশ্বকাপসহ চারটি আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে দলটি।

২০২৬ বিশ্বকাপেও বয়সকে পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। প্রতিযোগিতায় মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান তিনি। তবে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে তাকে পেছনে ফেলায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

আরও