উন্নয়নের সঙ্গে উপরি পাওনা ‘বিষণ্নতা’!

ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে—তথ্যসূত্র বিআইডিএস। চমকে ওঠার মতো তথ্য বটে! চারপাশে উন্নয়নের আয়োজন। বড় বড় ভবন উঠছে। বড় কলেবরে চলছে উন্নয়ন প্রকল্প। সংস্কার উন্নয়ন জারি রয়েছে সড়কে। মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ছে। কাজের সন্ধানে হাজারো মানুষ আসছে ঢাকার পানে। তাদের ঠাঁই দিতে ছোট তিলোত্তমা লম্বা-চওড়া উভয় পরিধিতে বাড়ছে। চলমান উন্নয়ন মহাসমারোহে কেন এ বিষণ্নতা?

ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেতথ্যসূত্র বিআইডিএস। চমকে ওঠার মতো তথ্য বটে! চারপাশে উন্নয়নের আয়োজন। বড় বড় ভবন উঠছে। বড় কলেবরে চলছে উন্নয়ন প্রকল্প। সংস্কার উন্নয়ন জারি রয়েছে সড়কে। মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ছে। কাজের সন্ধানে হাজারো মানুষ আসছে ঢাকার পানে। তাদের ঠাঁই দিতে ছোট তিলোত্তমা লম্বা-চওড়া উভয় পরিধিতে বাড়ছে। চলমান উন্নয়ন মহাসমারোহে কেন বিষণ্নতা?

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি ভিডিও দেখছিলাম। তাতে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য প্রবৃদ্ধি অর্জনের নেপথ্য গল্প। কীভাবে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধিতে শতাংশের বৃত্ত ছাড়িয়ে আরো বড় অর্জনের লক্ষ্যে ছুটছে, দেশটির সফলতার মূলমন্ত্র কী, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিধর দেশ ভারত থেকেও কীভাবে দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে বাংলাদেশ। তাতে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। শুধু তা- নয়, এক দশকে দেশটির মাথাপিছু আয় তিন গুণ বেড়েছে। পোশাক রফতানিতে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। খাতটিতে প্রতি বছর ১৬ শতাংশ রফতানি বাড়ছে। পোশাক খাত, প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি দেশের অন্যতম মূলধন একঝাঁক তরুণ জনগোষ্ঠী। তারাই প্রবৃদ্ধির গতিকে বেগবান করছে। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে অস্টম। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার বয়স ২৫-এর নিচে। যারা খুব দ্রুত সক্ষম হচ্ছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে। বাংলাদেশের রয়েছে ছয় লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সার। অনলাইন ব্যাংকিংয়ে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছেএভাবে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ।

আমরা জানি, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আর্কষণ করতে ১০০টি বিশেষায়িত ইকোনমিক জোনের কাজ চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হতে পারে দশমিক ১৩ শতাংশ। তথ্যমতে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছে।

মুদ্রার উল্টো পিঠের সত্য হলো ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আয়বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। ঢাকার ১০ শতাংশ ধনী মানুষের আয় গোটা শহরের বাসিন্দাদের মোট আয়ের ৪৪ শতাংশ। তাছাড়া সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের আয় মোট আয়ের শতাংশের কম। এখনো তিনবেলা খেতে পায় না ঢাকার সাড়ে শতাংশ মানুষ। দেশের অন্য অঞ্চলেও চিত্রের দেখা মেলে। স্বাভাবিকভাবেই ধনী-গরিবের আয়ের প্রকট বৈষম্য প্রভাব ফেলছে রাজধানীবাসীর শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থতার ওপর; রাজধানীর বাসিন্দারা আক্রান্ত হচ্ছে বিষণ্নতায়।

ছোট পরিসর, ঘেরা প্রান্তর, স্কুলের পর বাসায় ফিরে কোনো একটি প্রযুক্তিযন্ত্রের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর ভাগ করে নেয়া। বড়দের জন্যও বাড়তি কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘরকন্না-গৃহস্থালি সামলে অফিস সেরে তাদেরও খানিক অবসর বলতে মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। শহরে সাধারণের জীবন বাঁধা ছকে। তাই এখানে বিষণ্নতার অসুখ ঢুকে পড়েছে।

ঢাকায় অর্থ উপার্জনের সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও শহরের দরিদ্র লোকের মিছিল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কিন্তু শহরে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ স্রোতের মতো আসছেই। ঢাকার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ মানুষের নিজস্ব বসবাসের জায়গা আছে। সিটি করপোরেশন শহরের ন্যূনতম নাগরিক সেবা দিতে পারছে না, কাজ করছে না ট্রাফিক ব্যবস্থা। রয়েছে নিত্যপণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বাসা বাড়া, বাস ভাড়া, বিদ্যুত্-গ্যাস সবকিছুর দাম বাড়ছে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। উন্নয়ন যন্ত্রণা হিসেবে ক্রমেই দূষণের মাত্রা বাড়ছে। বন্ধ করা যাচ্ছে না বায়ুদূষণের উত্স। সম্ভব হচ্ছে না নাগরিক সুবিধা সেবা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা।


স্বাস্থ্যগত সমাস্য বাড়ছে। তা থেকে পরিত্রাণের জন্য শহরের মানুষ নিয়মিতভাবে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হচ্ছে। চিকিত্সকের পরামর্শ নেয়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ওষুধ কেনা বাবদ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে। তথ্যমতে, শহরের অধিবাসীদের মোট মাসিক আয়ের শতাংশ খরচ হচ্ছে চিকিত্সা খাতে।

ঢাকাকে বাঁচাতে সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওই সচিত্র প্রতিবেদনে কিন্তু সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কেও তুলে ধরা হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় প্রথম দিকেই রয়েছি আমরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, সবকিছু মিলিয়ে নীরব যে অভিবাসন চলছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, আমাদের ভাবতে হবে সে বিষয়গুলো নিয়েও।

বাস্তুচ্যুত, সহায়সম্বলহীন মানুষগুলো ঢাকায় এসে খুঁজে পাচ্ছে না ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন। নারীদের মধ্যে বেশির ভাগই বাসাবাড়িতে না হয় পোশাক কারখানায় কাজ খুঁজে নিচ্ছেন, পুরুষরা নির্মাণ শ্রমিক বা দিনমজুরের কাজ পাচ্ছেন।

বাসস্থান সমস্যা, যানজট, বায়ুদূষণ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, বাজে রাস্তাঘাটএসব সমস্যা অসুবিধা সত্ত্বেও কাজের সুযোগের পাশাপাশি ঢাকাতেই শিক্ষা স্বাস্থ্যসেবা বেশি। কিন্তু তা নিম্নবিত্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ত্তের বাইরে থাকছে।

রোজকার যুদ্ধ জয় করতে গিয়ে কিংবা যুদ্ধ জয়ের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে যখন মেধা, সততা আর অদম্যতার বারবার পরাজয় ঘটে, তখন বিষণ্নতা ভর করে। রাস্তায় নেমে নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে ভুগতে কোনো না কোনো কিশোরী জানলার কপাট আটকে অবসাদগ্রস্ততার সঙ্গে আপস করতে পারে। তরুণ তার নিরাপত্তাহীনতার বোধে আক্রান্ত হয়ে হতোদ্যম হতে পারে। অভিভাবকরা মনোবল হারিয়ে ফেলতে পারেন।

মনোবিদ বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যানুসারে, বিষণ্নতার কারণ কখনো শারীরিক অন্তর্গত কখনোবা বাহ্যিক পরিবেশ। সংকোচ না রেখেই বলা যায়, ঢাকার মানুষের বিষণ্নতার অন্যতম কারণ বাহ্যিক পরিবেশ। শহরের শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, সাধারণের দিনের শুরুই হয় যানজটে আটকা পড়ে। কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ে। পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা, সন্তানদের সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষাএসব কিছু নিশ্চিত করতে যে মানসিক চাপ নিতে হয়, তাতে ভুক্তভোগী ব্যক্তির অবসাদগ্রস্ত কিংবা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

শহরে মানুষ যেসব কারণে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছে, যদিও তার সহজ রাতারাতি সমাধান মেলে না। তবে নগরের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিতের মাধ্যমে তাদের জীবনকে সহজ করা যেতে পারে। যানজট সমস্যার সমাধান করতে হবে। খোলা পরিসর, বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন, উত্সব ইত্যাদির মাধ্যমে নগরবাসীর মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দুর্নীতি দূর, হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই সেবার মান বাড়ানো যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী কার্যকর করার বিকল্প নেই। দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

উন্নয়নের ভোগান্তি কথাটার সঙ্গে আমরা পরিচিত। এর মানে কোথাও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হলে সেখানে জনসাধারণকে কিছুটা যন্ত্রণা পোহাতে হয়। হাত-মাথা ঢেকে, নাকে-মুখে মাস্ক পরে উন্নয়নের দূষণের বিরুদ্ধে আমরা লড়ে যাচ্ছি। কিন্তু লড়াইটা কতদিনের তা জানা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন যন্ত্রণা যে শহরের অবসাদগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে তুলবে না তার নিশ্চয়তা কী?

তাছাড়া যখন পরিসংখ্যান প্রকাশ হয় যে ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত বিষণ্নতায়, তখন সার্বিক অর্থেই নতুন করে চলমান উন্নয়ন ভোগান্তির সংজ্ঞা খুঁজতে বসা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

আরও