স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে বঙ্গবন্ধু

এ যাত্রা অন্ধকার থেকে আলোর পথে, নিরাশা থেকে আশার উদ্দেশ্যে

ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বন্ধুরা, আমার জন্য এটি সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। বাংলাদেশে যাওয়ার পথে আমি আপনাদের দেশের ঐতিহাসিক শহর দিল্লিতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার দেশের মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ভারতের জনগণ ও ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এটুকু আমি করতেই পারি।

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পথে উড়াল দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লন্ডন হয়ে ভারতে যাত্রাবিরতি নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ৮ জানুয়ারি সকালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। পরের দিন ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে ১০ জানুয়ারি সকালে ভারতে পৌঁছান তিনি। সেখানে দেশটির রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তার গোটা মন্ত্রিসভা, সশস্ত্র বাহিনীর তিন বাহিনী ও অন্যরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এ দিকপালকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এসময় শেখ মুজিবুর রহমানকে ভারতে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি। তার অভ্যর্থনার জবাব দেন বঙ্গবন্ধুও। ভারতের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের এ নেতার প্রথম দেয়া সে বক্তব্যের অনুবাদ বণিক বার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:


ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বন্ধুরা
, আমার জন্য এটি সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। বাংলাদেশে যাওয়ার পথে আমি আপনাদের দেশের ঐতিহাসিক শহর দিল্লিতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার দেশের মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ভারতের জনগণ ও ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এটুকু আমি করতেই পারি। আপনাদের মহৎ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কেবল ভারতের নন, তিনি গোটা মানবজাতির নেতা। তার নেতৃত্বে আমাদের এ যাত্রাকে সফল করতে আপনারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ও সাহসিকতার সঙ্গে আত্মত্যাগ করেছেন।


এ যাত্রা অন্ধকার থেকে আলোর পথে, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতার পথে ও নিরাশা থেকে আশার উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ নয় মাস পর আমি স্বপ্নের সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি। এ নয় মাসে আমার দেশের জনগণ যেন শতাব্দীকাল অতিক্রম করেছে। যখন আমাকে তাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তারা কেঁদেছে। যখন আমি বন্দি ছিলাম তখন তারা যুদ্ধ করেছে এবং এখন যখন আমি তাদের কাছে ফিরে যাচ্ছি, তখন তারা বিজয়ী। আমি তাদের বিজয়ের লাখো হাসির আলোতে ফিরে যাচ্ছি। আমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরছি। সামনে থাকা অসীম কাজে যোগ দিতে আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যাচ্ছি। আমাদের বিজয়কে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে পরিণত করতে আমি ফিরে যাচ্ছি।


আমি অন্তরে কোনো বিদ্বেষ নিয়ে ফিরে যেতে চাই না। বরং এ সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরতে চাই যে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, নৃশংসতার বিরুদ্ধে বিবেকের, কাপুরুষতার বিরুদ্ধে সাহসের ও মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয় হয়েছে।

জয় বাংলা- জয় হিন্দ।

আরও