২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নিঃসরণের অর্ধেকের জন্য দায়ী ছিল মাত্র ৩২টি জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানি। সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় এসব কোম্পানি জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় নেয়া উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছেন সমালোচকরা। তবে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে কোম্পানিগুলোর অবদান পরিমাপের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের অর্ধেক ঘটিয়েছিল ৩৬টি কোম্পানি। ২০২৪ সালে সে সংখ্যা নেমে এসেছে ৩২-এ। এ ৩২ কোম্পানির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি দূষণ ঘটিয়েছে সৌদি আরামকো। আর বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে দূষণে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে এক্সনমোবিল।
বৃহৎ নিঃসরণকারীদের নিয়ে ‘কার্বন মেজরস’ শিরোনামে নিয়মিতভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান ইনফ্লুয়েন্সম্যাপ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ২০ নিঃরণকারী জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী কোম্পানির মধ্যে ১৭টিই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। বিষয়টিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার দিকটির ইঙ্গিতবাহী হিসেবে দেখছেন প্রতিবেদন প্রস্তুতকারীরা।
যেসব দেশ এ ১৭ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেগুলো গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে প্রস্তাবিত জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধের (ফেজআউট) পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, রাশিয়া, চীন, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত। বিপরীতে ওই ফেজআউট পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল ৮০টির বেশি দেশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরামকোর কারণে ২০২৪ সালে ১৭০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়েছে, যার বড় অংশই এসেছে রফতানিকৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল থেকে। সেক্ষেত্রে আরামকোকে যদি এককভাবে একটি দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাহলে এটি হতো বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম কার্বন দূষণকারী দেশ, যার অবস্থান হতো রাশিয়ার ঠিক পরেই। অন্যদিকে এক্সনমোবিলের জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনের ফলে নিঃসরণ হয়েছে ৬১ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড। এ কোম্পানিকে আলাদা একটি দেশ হিসেবে বিবেচনা করা গেলে এটি হতো বিশ্বের নবম বৃহত্তম দূষণকারী দেশ, যার অবস্থান দক্ষিণ কোরিয়ারও আগে।
কভিড–১৯ মহামারির সময় একবার সাময়িকভাবে কমলেও, এরপর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো অব্যাহত থাকায় প্রতি বছরই কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বেধে রাখার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এ নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমানো অপরিহার্য ছিল, যা এখন কার্যত অসম্ভব বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাত্রা যতটা সম্ভব সীমিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ উষ্ণতা সামান্য বাড়লেও জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর এর প্রভাব আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে।
থিংকট্যাংক ইনফ্লুয়েন্সম্যাপের বিশেষজ্ঞ এমেট কনেয়ার প্রতিবেদন প্রস্তুতকারীদের দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বৈশ্বিক নিঃসরণের বিষয়টি ক্রমেই কম সংখ্যক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অথচ মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন বাড়ছেই।’
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের একীভূতকরণের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর উত্তোলন সক্ষমতা বৃদ্ধির ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে টেক্সাসভিত্তিক পাইওনিয়ার ন্যাচারাল রিসোর্সেসকে অধিগ্রহণ করে নিয়েছে এক্সনমোবিল। আর নিউইয়র্কভিত্তিক হেস করপোরেশনকে অধিগ্রহণ করেছে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন।
ফসিল ফুয়েল নন–প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার জেপোরাহ বারম্যান বলেন, ‘প্রতিবেদনের তথ্য আবারো একটি কঠিন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত একদল জীবাশ্ম জ্বালানি করপোরেশন শুধু বৈশ্বিক নিঃসরণে আধিপত্যই করছে না, তারা সক্রিয়ভাবে জলবায়ু উদ্যোগকে নস্যাৎ করছে এবং এ বিষয়ে সরকারগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দুর্বল করছে।’
জাতিসংঘের সাবেক জলবায়ু প্রধান ক্রিস্টিয়ানা ফিগুয়েরেস বলেন, ‘কার্বন মেজরসের সর্বশেষ তথ্য বলছে যে বড় নিঃরণকারীরা ইতিহাসের ভুল পক্ষে রয়েছে। যদিও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ হচ্ছে, তবু কার্বন মেজররা পুরোনো ও দূষণকারী পণ্যকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তবে এ সমস্যার বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান ও জবাবদিহির পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে একত্রিত করার হাতিয়ার হলো এ সংক্রান্ত তথ্য।’
এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সৌদি আরামকো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। সাড়া দেয়নি এক্সনমোবিলও।
কার্বন মেজরস ডাটাবেজের ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে কয়েক ডজন প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কার্বন নিঃসরণের সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরা হয়। এছাড়া এ তথ্যের সাহায্যেই চরম তাপপ্রবাহজনিত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির দায় পৃথক পৃথক জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির ওপর আরোপ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ডাটাবেজটির তথ্য আইনি মামলা পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।