‘তবু যদি কখনও দেবদাসের মত এমন হতভাগা, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে, যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।’ (শরত্চন্দ্র ১৪০২: ৫৬৮)
বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব পাওয়া ‘দেবদাস’ উপন্যাসের সমাপ্তি এভাবেই টানেন শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। মাঝারি মানের পাঠকও জানেন এই কাহিনীর করুণ পরিণতি। এর নায়ক, তালসোনাপুরের জমিদারপুত্র দেবদাসের আবাল্য প্রেম প্রতিবেশী পার্বতীর সঙ্গে। কিন্তু বর্ণ ও বিত্তে পার্বতীরা অপেক্ষাকৃত কমজোরি হওয়ায় বিয়েতে রাজি হয় না দেবদাসের জমিদার পরিবার। পার্বতী সাহস করে চলে এসেছিল দেবদাসের কাছে। কিন্তু সে সময় ভীরু দেবদাস কোনো সিদ্ধান্ত তো নিতে পারেইনি, উপরন্তু জমিদার বাবার ওপর রাগ করে কলকাতা চলে যায়, আর পার্বতীকে চিঠি লিখে বসে, মা-বাবাকে কষ্ট দিয়ে সে পার্বতীকে বিয়ে করতে পারবে না। ওদিকে, দেবদাস ও তার পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে পার্বতীর অভিভাবকরা বিয়ে ঠিক করে হাতিপোতা এলাকার বিপত্নীক এক জমিদারের সঙ্গে।
পার্বতীর বিয়ে হয়ে গেলে দিনদুনিয়ার ওপর থেকে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে দেবদাস। সে মাজনুনে পরিণত হয়। নিজেকে সে নেশার জগতে ডুবিয়ে রাখতে চায়, যেন পার্বতীকে ভুলে থাকা যায়। বাঈজিবাড়িতে মদের নেশা তাকে গ্রাস করে, অন্যদিকে দেবদাসের প্রেমে পড়ে বাঈজি চন্দ্রমুখী। দেবদাসও শেষ পর্যন্ত চন্দ্রমুখীর প্রেমের কাছে হার মানে, কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারে না তার ছোটবেলার প্রেম পারু, অর্থাৎ পার্বতীকে। অতিরিক্ত মদ্যপান তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। উপন্যাসের শেষে ভয়ানক অসুস্থ শরীর নিয়ে পার্বতীর স্বামীর প্রাসাদের সামনে এসে মারা যায় দেবদাস। তাই নানা বিশেষণে শরত্চন্দ্র আখ্যায়িত করেছে তাকে: হতভাগা, অসংযমী ও পাপিষ্ঠ।
ত্রিভুজ প্রেমের এই কাহিনী শরত্চন্দ্র লেখেন ১৯০১ সালে। এরপর এটি প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে। বাঙালি পাঠক বিশ শতকী সামন্ত যুগীয় এই বিয়োগান্তক প্রেমের উপাখ্যান পড়ে অশ্রুজলে ভেসেছে। পুরুষতান্ত্রিক ও ভীষণ রকমের রক্ষণশীল উপন্যাস হওয়ার পরও নারীরাও এ উপন্যাসকে সমানভাবে গ্রহণ করেছে। এ উপন্যাসের সাফল্য দেখে স্বভাবতই চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন প্রযোজক ও পরিচালকরা। তবে দেবদাসের সৃষ্টিকর্তা শরত্চন্দ্রের খুব একটা ইচ্ছা ছিল না কাঁচা বয়সে লেখা এই উপন্যাস নিয়ে কোনো ছবি তৈরি হোক। “তাঁর কাছে ছবি করার অনুমতি নিতে গেলে তিনি রেগে গিয়ে নীতিন বসুকে বলেছিলেন: ‘তোরা কি আমার অন্য ভালো লেখা পেলি না? যত সব মুখ্যুদের দল জুটেছে।’ (সুব্রত ২০০৪: ৩৬) নীতিন ছিলেন নিউ থিয়েটার্সের চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক।
পরে ছবিটি যখন নিউ থিয়েটার্স থেকে প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়ার পরিচালনায় মুক্তি পায় ও দর্শকদের মাঝে সাড়া জাগায়, তখন কিন্তু শরত্চন্দ্রের মত পাল্টে যায়। বড়ুয়া বাংলা, হিন্দি ও অসমিয়া—তিন ভাষাতেই ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। বাংলা সংস্করণে দেবদাস তিনি নিজেই, আর হিন্দি সংস্করণে দেবদাসের ভূমিকায় অভিনয় করেন কেএল সায়গল। বাংলা দেবদাসে অভিনয় করে বড়ুয়া বাঙালির মন জয় করে নিয়েছিলেন। এটা দেখে শরত্চন্দ্র স্বয়ং তাকে ডেকে বলেন, ‘আমি দেবদাস লিখেছিলাম হয়তো তোমাকে ভেবেই। আজ মনে হচ্ছে আমার গল্পটা লেখা সার্থক হল।’ (পিনাকী ২০০৮: ৬৭)
ছবি মুক্তির পর বড়ুয়াকে লোকজন দেবদাস বলেই ডাকতে শুরু করে। এমনকি যখন উনি মারা যান, তখন সাধারণের মুখে মুখে ফিরেছে দেবদাস মারা গেছে। (ওই) বড়ুয়ার দেবদাস সৃষ্টির আগে কোনো ছবি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এতটা সাড়া জাগাতে পারেনি বাণিজ্যিকভাবে ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে। (সোমা ২০১৭: ১০৮) এ ঘটনার কারণে তো অবশ্যই, মানুষের মনের ভেতর আত্মঘাতী প্রেমের বসবাস আছে বলে যুগে যুগে বারবার নতুন করে তৈরি হয়েছে ‘দেবদাস’।
সেই ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাংলা, হিন্দি, তেলেগু ইত্যাদি ভাষায় ‘দেবদাস’ নির্মিত হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশী ‘দেবদাস’-এর দেখা পায় মানুষ। সুযোগটি করে দেন চাষী নজরুল ইসলাম। এর মধ্য দিয়ে ‘দেবদাস’ তৈরির মিছিলে নাম লেখান তিনি। এ ছবিতে দেবদাসের চরিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ। চাষী নজরুলের সঙ্গে বুলবুলের প্রথম পরিচয় হয় এই ছবির মাধ্যমেই। ততদিনে অবশ্য বুলবুল আলমগীর কবিরের একাধিক ছবি করে বিখ্যাত। (বুলবুল ২০০৪: ৬৩) পার্বতী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কবরী, চন্দ্রমুখী চরিত্রে আনোয়ারা আর চুনিলালের চরিত্রে রহমান।
ছবিটির প্রশংসা করেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র সমালোচক নির্মল কুমার ঘোষ (এন কে জি)। তিনি অভিনয়ের প্রশংসার পাশাপাশি পরিচালককেও ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘It is a beautiful embodiment on celluloid of an eternal tragic hero and heroine who carry with them all the self-destroying pride and prejudices of romanticism. Thanks to its maker they melt into two pathetic figures of idzllic love.’ (নির্মাল ২০০৪: ১০০)
আশ্চর্যের বিষয়, নির্মল কুমার ভারতের বাঙালি হয়েও এই সমালোচনায় ঢাকার ছেলে বিমল রায়ের দেবদাস (১৯৫৫) ছবির কথা উল্লেখ করেননি। বিমল রায় ১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’ ছবিতে চিত্রগ্রাহকের কাজ করেছিলেন। পরে তিনি নিজেই অনেক বড় পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং দিলীপ কুমার-সুচিত্র সেনা বৈজয়ন্তীমালাকে নিয়ে ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন। প্রমথেশের কথা উল্লেখ না করলেও নৈতিক অবস্থান থেকে নির্মল কুমারের এই প্রশংসাপত্রে বিমল রায়ের ‘দেবদাস’-এর কথা থাকা উচিত ছিল। কারণ চাষী নজরুলের ‘দেবদাস’ হুবহু বিমল রায়ের ছবির নকল। বরং কিছুটা খারাপ নকল। দৃশ্যমালা সাজানো অর্থাৎ মন্তাজ ও দৃশ্যসজ্জা অর্থাৎ মিজোঁসেন দুই দিকে তো বটেই, সংলাপের দিক থেকেও যথেষ্ট দুর্বল ছিল ১৯৮২ সালের এই বাংলাদেশী দেবদাস।
বিমল রায়ের ‘দেবদাস’ যেখানে দৃশ্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহে গল্প বলে যাচ্ছে, অতি উঁচু দরের অভিনয় আর শচীন দেব বর্মণের করা সংগীতের মূর্ছনা নিয়ে, তখন বাংলাদেশের প্রথম ‘দেবদাস’ অভিনয়ে ও সংগীতে কিছুটা পার পেলেও সংলাপ, ক্যামেরা, সম্পাদনায় মাঝারি মানকে অতিক্রম করতে পারেনি। ছবির শেষ দৃশ্যটি যদি আমলে নিই, যেখানে পার্বতী দেবদাসের মৃত্যু সংবাদ শুনে দৌড়ে প্রাসাদের বাইরে যাচ্ছে, সেখানে বিমল রায়ের শট ডিভিশন, নৈঃশব্দ্যের ব্যবহার, আবহ সংগীত, তার ওপর সুচিত্রা সেনের অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে অন্য উচ্চতা তৈরি করে। আমার মতে, ‘দেবদাস’-এর ইতিহাসে বিমল রায়ের এই ‘দেবদাস’ই সেরা, এরপর আমলে নিতে হবে সঞ্জয়লীলা বানসালির শাহরুখ-মাধুরী-ঐশ্বরিয়ার ‘দেবদাস’ (২০০২)।
অন্যপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ‘দেবদাস’-এর শেষের দৃশ্যে কবরীর অভিনয় ভালো হলেও আবহ সংগীতের জবরদস্তি, ক্যামেরার বারবার জুম আউট দৃশ্যটিকে অনেক বেশি ভারাক্রান্ত করে তোলে। বিমল রায়ের ছবিতে পার্বতী যখন দেবদাসের মৃত্যু সংবাদ শোনে, তখন সব শব্দ থেমে যায়, শুধু দেবদাস নামটি প্রতিধ্বনি তোলে পার্বতীর কানে। এরপর যেন মনে হয়, হূিপণ্ডের ধুকধুক শব্দটিই শুধু ভেসে আসছে। তার সঙ্গে বেহালা আর বাঁশি দিয়ে যা করা হলো, তাতে দর্শকের পক্ষে আবেগ ধরে রাখা কঠিন।
বাংলাদেশের প্রথম ‘দেবদাস’-এর দুটি দৃশ্যের গুণগান করতে চাই। সময়ের স্থিতিস্থাপকতাকে যেভাবে চাষী নজরুল পর্দায় উপস্থাপন করেছেন, তা বেশ নান্দনিক হয়েছে। বিমল রায় দেখিয়েছিলেন, পার্বতী ঘাটে জল আনতে গেছে, ক্যামেরা প্যান করে জলে গেল, ফিরে এল, পার্বতী বড় হয়ে গেল। ভালো মেটাফোর। সাহিত্যে জলের গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সময়ের বয়ে যাওয়ার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে আছে বহুদিন থেকেই। এক্ষেত্রে চাষী নজরুল ইসলাম করলেন কী, সময়কে নিয়ে তিনি উল্লম্ফন দিলেন দেবদাসের কলকাতার মেসবাড়িতে। সেখানে টেবিলের ওপর বইয়ের পর বই রাখা হলো, আর সময় প্রবাহিত হলো। বড় হয়ে গেল দেবদাস। সময়কে নিয়ে আরো একবার খেলেছেন চাষী নজরুল। চন্দ্রমুখী ঘোড়ার গাড়িতে করে দেবদাসকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সময় অতিবাহিত হচ্ছে, সেখানে তিনি ব্যবহার করেছেন গাড়ির চাকা। এটাও ভালো রূপক।
চাষী নজরুল ইসলাম ১৯৮২ সালে শুধু নয়, আরো একবার দেবদাস নির্মাণ করেন, ২০১৩ সালে। সেখানে অভিনয় করেন শাকিব খান, অপু বিশ্বাস ও মৌসুমী। বলতে দ্বিধা নেই, এ সংস্করণটি প্রথমটির চেয়েও খারাপ হয়েছে। দৃশ্যের সামান্য এদিক-সেদিক পরিবর্তন করা হলেও এটি প্রথম নকলটির নকল, মানে এর মান আরো নিম্নগামী হয়েছে। লক্ষ করলেই দেখা যাবে, এই রঙিন ‘দেবদাস’-এ পরিচালক ক্যামেরা স্থির করে রেখেছেন, চরিত্ররা সংলাপ বলেই যাচ্ছে, ক্যামেরা কাছে যাচ্ছে না, ক্লোজে গিয়ে চরিত্রদের মুখমণ্ডল দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে না দর্শকদের। আর সংগীত ও গানের অবস্থা ভীষণ রকম শোচনীয়। মৌসুমী কিছুটা অভিনয়ের চেষ্টা করলেও শাকিব খান বৃথাই শাহরুখ খানকে নকলের চেষ্টা করেছেন, আর অপু বিশ্বাস যেন কাঠের পুতুল হয়েই ছিলেন। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে, যেখানে অপুর আগে যমুনা, সুচিত্রা, কবরী, পরে ঐশ্বরিয়ার মতো বিখ্যাত সব অভিনেত্রী অভিনয় করে গেছেন, সেখানে তার আরো প্রস্তুতির দরকার ছিল।
শাকিব খানের বেলায়ও একই কথা খাটে। শুধু অন্ধ অনুকরণ করে দেবদাসের মতো অতিপরিচিত চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ানো যায় না। শাহরুখ খানের পরিশ্রম ছিল এই ‘দেবদাস’-এর পেছনে। শাকিব খানের কোনো পরিশ্রম চোখে পড়ে না এ ছবিতে। হিন্দি ‘অশোকা’ (২০০১) ছবির ব্যর্থতার পর শাহরুখ খানের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ হয়ে ধরা দেয় বানসালির ‘দেবদাস’। সেজন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন, সেটার ফলও পান। শাহরুখ অ্যালকোহল পান করেন না, কিন্তু এ ছবির জন্য তিনি নিয়মিত পান করেছেন, তা-ই শুধু নয়, আগের অভিনেতাদের অভিনয় দেখে নিজেকে ভাঙার চেষ্টা করেছেন। তিনি এতটাই চরিত্রের ভেতর ঢুকে গিয়েছিলেন যে ছবি শেষ হওয়ার পরও দেবদাসের ঘোর থেকে বেরোতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। (শাহরুখ ২০০২: ৩৬) অথচ বাংলাদেশের শাকিব খানের অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, তিনি দুঃখকে ছুঁতেই পারেননি, শুধু সংলাপ ছুড়ে গেছেন।
চাষী নজরুলের দুটি দেবদাসই মূলত বিমল রায়ের দেবদাসের ভাঙাচোরা অনুকরণ। অবশ্য কথাটি আংশিক স্বীকারও করেছেন পরিচালক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, “আমার আগে যারা ‘দেবদাস’-এর চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছেন, তাদের ওপর মাতব্বরি করি নি।” (চাষী ২০০১: ১১৫)
‘মাতব্বরি’ কর্মটি যদি আমলে নিই, তাহলে আসলে প্রথম মাতব্বরি করেছেন প্রমথেশ বড়ুয়া। তিনি শেষের দৃশ্যে পার্বতীর মুখের ওপর মূল ফটক বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি যোগ করেছিলেন, যা উপন্যাসে ছিল না। ফটক বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি পছন্দ করেছিলেন খোদ ঔপন্যাসিক। ১৯৩৫ সালের এই ‘দেবদাস’-এ অভিনয় করা পার্বতী ও প্রমথেশ বড়ুয়ার স্ত্রী যমুনা বড়ুয়া সাক্ষ্য দিয়ে বলছেন, “বড়ুয়াই গোটা দৃশ্যটি ভেবেছিলেন। উপন্যাসে এটি ছিলো না। যখন শরত্বাবু দৃশ্যটি দেখলেন, তিনি এতো উচ্ছ্বসিত হলেন যে পরিচালককে ডেকে বললেন, উপন্যাসের বেলায় তিনিও বড়ুয়ার মতো করে শেষ করার কথা ভাবতে পারেননি।” (সোমা ২০১৭: ১০৮)
পরিবর্তিত শেষ দৃশ্যটি নিয়ে চলচ্চিত্র পণ্ডিত সোমা চট্টোপাধ্যায় বলছেন, এই বন্ধ হয়ে যাওয়া ফটক শুদ্ধ ফটক নয়, এটি আসলে সামাজিক বিধিনিষেধ বা ট্যাবুর একটি রূপক, যে ট্যাবু স্ত্রীকে স্বামীর ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করার অনুমোদন দেয় না। এখনকার মতো এই ট্যাবু বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও বেশ শক্তিশালী ছিল। (ওই) পরিচালক নিজে যেমন ছবিতে ট্যাবু ভাঙেননি, শুধু রূপক যোগ করেছেন মাত্র, লেখকও সেই নিষেধ ভাঙার সাহস করেননি। মানে পার্বতী কোথাও, উপন্যাস বা চলচ্চিত্রে, দেবদাসের জন্য স্বামীর ঘর ত্যাগ করেনি। শরত্বাবুর অন্য কাজেও একই সামাজিক নিয়ম রক্ষার প্রচেষ্টা চোখে পড়ে।
তৎকালের প্রচলিত সমাজচিন্তা থেকে বেরোতে পারেননি বলেই শরত্চন্দ্র দেবদাসকে হতভাগা, অসংযমী ও পাপিষ্ঠ বলে উল্লেখ করেছেন। একজন নারীর প্রেম না পাওয়া ও একা একা মরে যাওয়ায় দেবদাস হতভাগা হয়ে গেল। কষ্টকে ভুলতে দেদার মদ গেলায় অসংযমী, আর বাঈজিবাড়ি গমনে দেবদাসকে লেখক পাপিষ্ঠ বলে দেগে দিয়েছেন। ভুলে গেলে চলবে না, এসব কথা কোনো চরিত্র বলছে না, বলছেন স্বয়ং ঔপন্যাসিক। তার নৈতিকতার মানদণ্ডকে তাই রক্ষণশীল বলেই মেনে নিতে হয়। রক্ষণশীলতা তখন যেমন ছিল, এখনো যে তাতে খুব প্রগতির হাওয়া লেগেছে তা নয়। সমাজকে প্রতিফলিত করে বলেই ‘দেবদাস’ আজ অবধি নতুন আঙ্গিকে বড় পর্দায় হাজির হচ্ছে প্রত্যেক দশকে।
কেন ‘দেবদাস’ এতটা আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল, এখনো কেন সেটা অব্যাহত আছে, এ প্রশ্নের নিষ্পত্তি আশা করি কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে করা যাবে। প্রথম পর্যবেক্ষণটি আমি ধার করছি সোমা চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকেই। তিনি দেবদাসকে বলছেন স্থানচ্যুত গরিব, ইংরেজিতে ‘ডিসপ্লেসড আউটসাইডার’। অর্থাৎ গ্রামের সামন্ত শ্রেণীর এক যুবক শহরে এসে নতুন বাবু হয়েছে। শহর তাকে শিক্ষার জন্য রেখেছে বটে, গ্রাম তাকে টানে। গ্রামে সে বাল্যপ্রেম হারায়, শহরে সে সেই ব্যথার উপশম খোঁজে, কিন্তু আরো বড় ধরনের গহ্বরে পড়ে যায় সে শহরে। এখান থেকে পালাতে আবারো সে গ্রামে যেতে চায়, কিন্তু সে এটাও জানে, শহরের এই মদ-মেয়েতে আসক্ত বাবুকে গ্রাম আর গ্রহণ করতে চায় না, এমনকি মৃত্যুর সময়ও তাই সে বড় নিঃসঙ্গ। সব জায়গা থেকেই দেবদাসের চ্যুতি ঘটে, সব জায়গাতেই সে হয়ে যায় ‘পর’। এই যে আত্মঘাতী, একাকী এবং সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, প্রেমের জন্য, এর ভেতর একটি কষ্টবিলাসী রোমান্টিকতা আছে। বাঙালি কেন, গোটা ভারতবাসীই তাই দেবদাসকে বুকে টেনে নিয়েছে, এখনো নেয়।
এই জায়গায় আমি এক কাঠি জুড়ে দিয়ে বলতে চাই, বানসালির ‘দেবদাস’ যে বিলেতের অক্সফোর্ড থেকে ফিরে আসে, সেটা আসলে এই সময়ের চিত্রকেই ধারণ করে। এখনকার যুবকরা অনুন্নত দেশ ছেড়ে উন্নত বিদেশেই যেতে চায় এবং সেখানে গিয়ে সে এক ধরনের সংকটে পড়ে, অধুনায় এর নাম হয়েছে ডায়াস্পোরা। বানসালি ‘ডায়াস্পোরা’ নিয়ে নাড়াচাড়া না করলেও, ওই ধারণাটির সঙ্গে স্থানচ্যুতি, চ্যুত স্থানের প্রতি টান এবং কোথাও একাত্ম হতে না পারার ব্যাপারগুলো জড়িত এবং যেহেতু উপন্যাসেই বিষয়টির উপাদান লুকিয়ে আছে, সেহেতু চলচ্চিত্রেও সেসব চলে আসে চোরাস্রোতের মতো। আধুনিক এই সংকট গোপনে ভিন্ন আঙ্গিকে আছে বলে ‘দেবদাস’ এখনো প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
আরেকটি কারণে চলচ্চিত্র হিসেবে ‘দেবদাস’-কে মানুষ ভালোবেসেছে, সেটা হলো দীর্ঘদিনের যে চলচ্চিত্র সংস্কৃতি, সেটাকে ভেঙে দিয়েছিল এই ছবি। ‘দেবদাস’-এর আগে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া মানুষগুলো ‘অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ ধরনের ছবি দেখেই অভ্যস্ত ছিল। অর্থাৎ একটি সুখী সমাপ্তিই ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য। আর এর বাইরে বেরও হতে চাইতেন না প্রযোজক-পরিচালকেরা। ভারতের চলচ্চিত্র পণ্ডিত পিকে নায়ার বলছেন, “দেবদাসই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় ছবি, যা ট্র্যাজেডি দেখানো যাবে না এমন ট্যাবুকে ভেঙে দিয়েছে। ১৯৩৫ সালে পিসি বড়ুয়ার দেবদাস (বাংলা ও হিন্দি) এতটা সাফল্য অর্জন করে যে এরপর ‘ট্র্যাজেডি’ বক্সঅফিস সাফল্যের প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।” (পিকে ২০০২: ১৫৮)
শোনা যায়, ১৯২৮ সালে নরেশ মিত্র একটি নির্বাক ‘দেবদাস’ও বানিয়েছিলেন। তো সেই বোবা যুগ থেকে বানসালির নাচে-গানে ভরপুর দেবদাস পর্যন্ত, ভারতে বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালয়ালম ও অসমিয়া ভাষায় সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রের সংখ্যা এক ডজনেরও বেশি। কলকাতায় তিনবার দেবদাস নির্মিত হয়েছে। প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’-এর কথা তো আগেই বলেছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-উত্তম কুমার-সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়-সুপ্রিয়া দেবীকে নিয়ে দ্বিতীয় ‘দেবদাস’ (১৯৭৯) বানান দিলীপ রায়। তৃতীয় দেবদাস (২০০২) নির্মাণ করেন শক্তি সামন্ত, সেখানে অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-অর্পিতা পাল-ইন্দ্রাণী হালদার। এছাড়াও হিন্দি ভাষায় ধর্মেন্দ্রকে নিয়ে একটি দেবদাস তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন গীতিকার ও পরিচালক গুলজার, কিন্তু সেটি আর পরিণতি পায়নি।
‘দেবদাস’ স্বনামেই যে শুধু রুপালি দুনিয়ায় হাজির থেকেছে তা কিন্তু নয়, এ কাহিনীর দ্বারা অনুপ্রাণিত ত্রিভুজ প্রেম ভারত ও বাংলাদেশের বহু চলচ্চিত্রেই এসেছে ঘুরেফিরে। উল্টো ত্রিভুজ প্রেম অর্থাৎ দুই পুরুষ-এক নারী এমন কাহিনী নিয়েও ছবি নির্মাণ করেছেন নির্মাতারা। ছবির মূল চরিত্রের মদে আসক্ত হওয়া, রূপজীবীর কাছে যাওয়া ইত্যাদি তো আকছারই উপমহাদেশের ছবিতে দেখানো হয়েছে। দেবদাস-লক্ষণ এখন চলচ্চিত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে সেটিকে আর আলাদা করে ‘দেবদাস’-এর উপাদান বলে চেনাই যায় না।
ভারত ও বাংলাদেশে শুধু নয়, পাকিস্তানেও উর্দুতে ‘দেবদাস’ নির্মিত হয়েছে। ১৯৬৫ সালে একবার নির্মাণ করেন খাজা সরফরাজ। তার টাইটেল কার্ডে দেবদাস উর্দুর পাশাপাশি বাংলায়ও লেখা ছিল। আর দ্বিতীয়টি তৈরি হয় ২০১০ সালে, ইকবাল কাশ্মীরির বানানো এই ‘দেবদাস’ আবার বানসালির ছবির দুর্বল নকল। ইকবালের দেবদাসও বানসালির দেবদাসের মতো বিলেত ফেরত।
সরাসরি উপন্যাস থেকে না নিয়ে ছায়া অবলম্বনেও অনেক ‘দেবদাস’ নির্মিত হয়েছে, আধুনিকায়ন হয়েছে। যেমন অনুরাগ কাশ্যপের ‘দেব.ডি’ (২০০৯), রিক বসুর ‘দেবী’ (২০১৭), সুধীর মিশ্রের ‘দাস দেব’ (২০১৮) ইত্যাদি। চলচ্চিত্র ছাড়াও টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজে দেবদাস এখনো সমান দাপটে ঘুরে-ফিরে আসছে। বোঝা যাচ্ছে, মানুষ প্রেমের জন্য এখনো মরতে প্রস্তুত।
দোহাই
১. সুব্রত রুদ্র, ২০০৪, প্রমথেশ বড়ুয়ার জীবনচরিত, কলকাতা: অরুণা প্রকাশনী।
পিনাকী চক্রবর্তী, ২০০৮, চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিউ থিয়েটার্স, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স
২. সোমা এ. চ্যাটার্জি, ২০১৭, দ্য সিনেমা অব বিমল রয়: অ্যান ‘আউটসাইডার’ উইদিন’, নয়াদিল্লি: সেইজ
৩. বুলবুল আহমেদ, ২০০৪, আমার দেখা একজন সার্থক মানুষ চাষী নজরুল ইসলাম, কাজী হাসান সম্পাদিত ‘জীবনশিল্পী: চাষী নজরুল ইসলাম’, ঢাকা: সোনারং কমিউনিকেশন্স
৪. নির্মল কুমার ঘোষ, ১৯৮৩, আ টেনডার ভার্সন অব ‘দেবদাস’, ভারতের ‘স্ক্রিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত, কাজী হাসান সম্পাদিত ‘জীবনশিল্পী: চাষী নজরুল ইসলাম’, ২০০৪, ঢাকা: সোনারং কমিউনিকেশন্স
৫. চাষী নজরুল ইসলাম, ২০০১, ‘অন্যদিন’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারটি নেন মোমিন রহমান, কাজী হাসান সম্পাদিত ‘জীবনশিল্পী: চাষী নজরুল ইসলাম’, ২০০৪, ঢাকা: সোনারং কমিউনিকেশন্স
৬. শাহরুখ খান, ২০০২, দেবদাস: দি ইটারনাল সাগা অব লাভ, রাহুল সিংহল সম্পাদিত ও সংকলিত, নয়াদিল্লি: পেন্টাগন পেপারব্যাকস
৭. পিকে নায়ার, ২০০২, ‘সিনেমায়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত, রেশমি দোরাইসোয়ামি ও লতিকা পাদগাওনকার সম্পাদিত ‘এশিয়ান ফিল্ম জার্নিস: সিলেকশন ফ্রম সিনেমায়াস’ বইতে সংকলিত, ২০১০, নয়াদিল্লি: উইজডম ট্রি ও নেটপ্যাক