খান জাহান আলী আউলিয়া না সভ্যতার নির্মাতা

১৪৪২ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহী বংশের নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে (১৪৪২-৬০ খ্রি.) খুলনা অঞ্চলে (যশোর-খুলনা) আবির্ভাব ঘটে খান জাহান আলীর।  তিনি একাধারে যোদ্ধা ও দরবেশ। যতীন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাঙালীর ধর্ম ও সমাজ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘খান জাহান আলি বাংলার এক গাজি। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি যশোহর ও খুলনা জয় করেন। তিনি যোদ্ধা হলেও বাগেরহাট অঞ্চলে সাধকের জীবন যাপন করতেন। তাঁর বহু শিষ্য ছিল। বহু হিন্দুকে তিনি ইসলামে দীক্ষিত করেন। তাঁর প্রধান মুরীদ শেখ মুহাম্মদ তাহির, পীর আলি নামে পরিচিত। তিনি আগে ব্রাহ্মণ ছিলেন।’

খান জাহান আলী ‘খাঞ্জালি পীর’ নামেও পরিচিত। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গ্রন্থ বাঙ্গালার ইতিহাস গ্রন্থে আছে, ‘নাসির্-উদ্দীন্ মহ্মুদ শাহের রাজ্যকাল সম্বন্ধে গোলাম হোসেনের উক্তি গ্রহণ করিলে স্বীকার করিতে হয় যে, তিনি অন্ততঃ ৮৩৭ হিজরায় অর্থাত্ শমস্-উদ্দীন্ আহ্মদ্ শাহের জীবদ্দশায় স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন এবং কিয়ত্কাল তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বীস্বরূপ গৌড়রাজ্যের অধিকার লইয়া বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তাঁহার রাজ্যের শেষভাগে খাঁ জহান্ নামক এক ব্যক্তি দক্ষিণবঙ্গের বনময় প্রদেশ জয় করিয়াছিলেন। খুলনা জেলার বাগেরহাটে তাঁহার সমাধি আছে। জিলহিজ্জা মাসে সপ্তদশ দিবসে বৃহস্পতিবারে ৮৬৩ হিজরায় (২৪ অক্টোবর ১৪৫৯ খ্রীষ্টাব্দে) খাঁ জহানের দেহ সমাহিত হইয়াছিল।’

কথিত আছে, তিনি সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সনদের মাধ্যমে সুন্দরবনের ভূমি পুনরুদ্ধার করে সেখানে জনবসতি স্থাপন করেন। ড. এমএ রহিম লিখেছেন, ‘তিনি বঙ্গদেশে মুসলিম শাসন সম্প্রসারণ ও ইসলাম বিস্তারের ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন। জনপ্রবাদে তাঁকে আধুনিক খুলনা জেলার দুর্গম অঞ্চলগুলো জয়ের এবং ঐ এলাকাসমূহে আবাদি গড়ে তোলার কৃতিত্ব দান করে। এই অঞ্চলসমূহ আয়ত্তাধীনে আনয়ন করার পর, তিনি লোকদের মধ্যে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন।’

ঐতিহাসিক বিবরণী থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, খান জাহান আলী প্রাথমিক সময়ে সেভাবে পীর বা দরবেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেননি। শুরুতে তিনি সুন্দরবনঘেঁষে একটি সভ্যতার পত্তন করেছিলেন। বিরাটসংখ্যক মানুষকে নেতৃত্ব দিয়ে দুর্গম এক ভূখণ্ডে কৃষিসমাজের সূচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে রাস্তা নির্মাণ ও দীঘি খনন করান। তিনি হয়ে ওঠেন এ অঞ্চলের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণবঙ্গের একটি বৃহত্ অঞ্চল অর্থাত্ খুলনা-যশোরে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে গিয়েছিলেন বারবাজারে (বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলায়)। প্রচলিত আছে যে, হযরত শাহজালালের (রা.) সময়কালে ১২ জন ফকির এই স্থানের ভৈরবতীরে আস্তানা করেন। সেই থেকে এই স্থানের নাম বারবাজার। আগে এই স্থানের নাম ছিল খুব সম্ভবত ছাপাই নগর বা চাম্পাই নগর। যশোর শহর থেকে এ স্থানের দূরত্ব মাইল দশেক। এই ১২ জন দরবেশের একজন ছিলেন খান জাহান আলী। সতীশচন্দ্র মিত্র অবশ্য মনে করেন, খান জাহান আলীর আগেই ১২ জন দরবেশ এ স্থানে এসেছিলেন এবং তারাই বারবাজার নামকরণ করেছিলেন। বারবাজারে কিছুদিন অবস্থানের পর তিনি ভৈরব নদের তীরে মুড়লীতে একটি কেন্দ্র স্থাপন করেন। ক্রমেই স্থানটি জমজমাট হয়ে ওঠে এবং মুড়লী-কসবা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এখানে গরিব শাহ ও বাহরাম শাহকে রেখে যান। এ দুজন সন্ত এখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার করতে থাকেন। বহু মানুষ তাদের কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও তাঁরা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এরপর খান জাহান আলী একসময় খুলনার দিকে চলে যান এবং বাগেরহাটে তাঁর মূল কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার গ্রন্থে লিখেছেন,

“উনিশ শতকের একটি বয়ানে খুলনায় বাগেরহাটের অভিভাবক সন্ত হিসেবে খান জাহান আলীর (মৃ. ১৪৫৯ খ্রি.) উল্লেখ পাওয়া যায়। সুন্দরবনের গা-ঘেঁষে ছিল এই সন্তের কর্মকাণ্ড। সমাধির খোদাইতে তাঁর নাম লেখা হয়েছে ‘উলুঘ খান-ই আজম খান জাহান’। এ থেকে মনে হয় তিনি তুর্কি (উলুঘ) দেশ থেকে এসেছিলেন এবং বাংলা সালতানাতের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা (খান-ই আজম) ছিলেন। জঙ্গল পরিষ্কার করে ধানের আবাদ করা, স্থানীয়দের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা, অনেক মসজিদ ও রাস্তা নির্মাণের কৃতিত্ব জড়িয়ে আছে তাঁর নামের সঙ্গে। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সংগ্রহ করা স্থানীয় এক লোকগাথায় আছে, ‘খান জাহান আলী এ অঞ্চলে এসেছিলেন সুন্দরবনের জঙ্গলে আচ্ছাদিত জমি পুনরুদ্ধার ও চাষাবাদ করতে। তিনি সম্রাট অথবা গৌড়ের রাজার কাছ থেকে এ জমির জায়গীর পেয়েছিলেন। এবং সে অধিকারে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর কাচারির (দরবার) বিবরণী থেকে তাঁর এই অবস্থান ও বিরাট কর্মযজ্ঞের বিষয়টি বোঝা যায়। তিনি যে কর্মসম্পাদন করেছেন, সেজন্য শ্রমিকদের একটি বিরাট ফৌজ দরকার। এছাড়া এটাও জানা যায় যে, তিনি আবাদি জমির খাজনাও গ্রহণ করতেন। ...অনেকটা সময় তিনি বিরাট জমিদার হিসেবে কাটানোর পর জাগতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে ফকিরের জীবন যাপন শুরু করেন’।”

প্রায় সব বিশিষ্ট ইতিহাসবিদই একমত যে, খান জাহান আলী শুরুতে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর পীরের ভূমিকাটি শুরুর দিকে প্রধান হয়ে ওঠেনি। খান জাহান আলীর আগমনে খুলনা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস বদলে যায়। তাঁর উদ্যোগে এ অঞ্চলে অনেক অট্টালিকা ও জলাশয় তৈরি হয়। অর্থাত্ খান জাহান আলী যে একজন দক্ষ প্রশাসক ও নেতা ছিলেন, তা এসব উদ্যোগ থেকে প্রতীয়মান হয়। রিচার্ড ইটনের মূল্যায়ন, ‘এটা পরিষ্কার যে খান জাহান একজন দক্ষ নেতা ছিলেন। ঘন জঙ্গলপূর্ণ একটি এলাকাকে ধান চাষের জমিতে পরিণত করতে  উন্নত সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিপুল লোকবলের প্রয়োজন। লোনা পানিকে দূরে রাখতে নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ করতে হয়েছে। বন পরিষ্কার করতে হয়েছে। পানি সরবরাহ ও সংরক্ষণের জন্য পুকুর খনন করতে হয়েছে। শ্রমিকদের আবাস নির্মাণ করতে হয়েছে। এসব কাজ শেষ করার পরে দ্রুত ধান চাষ শুরু করতে হয়েছে, নতুবা ফের জঙ্গল গজিয়ে যেত। এসব কাজ ছিল অত্যন্ত দুরূহ, কারণ ছিল জ্বর এবং বাঘের আক্রমণের ভয়। খান জাহান তাঁর কর্মী বাহিনীকে বিস্ময়কর সব স্থাপত্য নির্মাণে নিয়োজিত করছিলেন। জরিপে দেখা গেছে, বাগেরহাটকে কেন্দ্র করে ৫০টির বেশি স্থাপনা তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্থানীয় মৌখিক ইতিহাসে বলা হয়, খান জাহান ৩৬০টি মসজিদ এবং অনেকগুলো বড় দীঘি খনন করিয়েছিলেন। যশোর শহর থেকে ১০ মাইল উত্তরে বারবাজারে ১২৬টি দীঘি খননের কৃতিত্ব দেয়া হয় তাঁকে। বাগেরহাট অঞ্চলে অনেক সড়ক নির্মাণের কৃতিত্বও তাঁর। খান জাহানের নির্মাণ করা মাস্টারপিসটি হচ্ছে ষাটগম্বুজ মসজিদ। এ মসজিদে ৬৭টি গম্বুজ আছে। এটি আজো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ। অর্থাত্ খান জাহান কেবল বন সাফ করে কৃষির পত্তনকারী হিসেবে নন বরং একজন সভ্যতা নির্মাণকারী হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’    

রিচার্ড ইটন যুক্তিসঙ্গতভাবেই একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন যে, খান জাহান আলী যে কীর্তি সম্পাদন করেছিলেন, তাতে তাঁর বিপুল কর্মী বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে তিনি একজন যোদ্ধা বা প্রশাসকরূপেই প্রথম খুলনা অঞ্চলে এসেছিলেন। সে হিসাবে তাঁর সঙ্গে কিছু সেনাও থাকার কথা। এ সমন্বয় কীভাবে হয়েছিল, তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সতীশচন্দ্র মিত্র রচিত যশোহর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে, ‘খাঁ জাহান আলি একজন অদ্ভুতকর্মা পুরুষ ছিলেন। লোকমুখে অনেক অদ্ভুত কার্য তাঁহার উপর আরোপিত হইয়াছে। প্রবাদের গালভরা ভাষায় অনেক কথা বলা হয়, তাহাতে গল্পও জমে বেশ; কিন্তু তাহার ষোলআনা বিশ্বাস করিয়া লওয়া যায় না। তবে ষোলআনা না ধরিলেও তাহাতে কতক সত্য থাকে, তাহার উপর আস্থা স্থাপন করাও দুর্বুদ্ধিতা নহে। লোকে বলে খাঁ জাহানের ষাটহাজার সৈন্য ছিল, উহাদের অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্রের মত একখানি বাজে অস্ত্র ছিল কোদাল। যুদ্ধবিগ্রহ সব সময়ে চলিত না, আবশ্যকও হইত না, লোকে পাঠানসৈন্য দেখিলে বশ্যতা স্বীকার করিত। বিশেষত লোকে খাঁ জাহানের জন-হিতৈষণায় মোহিত হইয়া তাঁহাকে ভক্তি করিত। সুতরাং সৈন্যদিগকে অনেক সময় নিষ্কর্মা থাকিতে হইত; খাঁ জাহান তাহাদিগের হস্তে কোদাল দিয়া কর্ম দিয়াছিলেন। আজকাল ইংরাজ গভর্ণমেন্ট শান্তিময় রাজ্যে নিষ্কর্মা সৈন্যদিগকে ফুটবল কিনিয়া দিয়া কর্মঠ রাখিতেছেন, খাঁ জাহানের আমলে তাহা ছিল না। যুদ্ধ বাধিলে সৈন্যেরা যুদ্ধ করিত, নতুবা কোদাল কেহ কাড়িয়া লইত না, অবাধে রাস্তা নির্মাণ ও পুষ্করণী খনন করিতে করিতে দেশময় পুণ্যকীর্তি রাখিয়া সৈন্যদল অগ্রসর হইত। এই প্রণালী একটি শিক্ষার বিষয়; এমনভাবে দেশের ও দশের স্থায়ী উপকারের উপায় আর নাই। উত্তরকালে রাজা সীতারাম রায়ও এই প্রণালী অবলম্বন করিয়াছিলেন। এই উভয়ের জলদান-পুণ্যে যশোহর-খুলনার অনেক স্থানে জল-দুর্ভিক্ষ নাই। বহুসংখ্যক কোড়াদার, বেলদার, বা খননকারী সৈন্য হস্তগত থাকায়, অনেক স্থানে অতি অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তা বা পুষ্করণী হইত। ...তিনি বহুলোকের অধিনায়ক বলিয়া এই সকল কার্য যে স্বল্পায়াসে, অতি সামান্য সময়ে সম্পন্ন করিতেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।’

তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল খলিফাতাবাদ, যা বর্তমান বাগেরহাট জেলা। বাগেরহাটে খান জাহান আলীর যে খানকা গড়ে উঠেছিল, সেখানে প্রায় ৩০০ মসজিদ গড়ে ওঠে। ষাটগম্বুজ মসজিদ খান জাহান আলীর সবচেয়ে বিখ্যাত কীর্তি। মসজিদটি নামাজ আদায়ের পাশাপাশি খান জাহানের দরবার হিসেবেও ব্যবহার হতো। মসজিদটি ব্রিটিশ আমলে লর্ড কার্জনের এনসিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্টের অধীনে সংস্কার করা হয়েছিল। এ অঞ্চলে মিঠা পানির অভাব ছিল বলে খান জাহান আলী অনেক পুকুর, দীঘি খনন করিয়েছিলেন। ৩৬০ সংখ্যাটি খান জাহান আলীর কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, তাঁর ৩৬০ জন বিশ্বস্ত শিষ্য ছিলেন, তিনি ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ এবং ৩৬০টি পুকুর খনন করিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, তখন বছর গণনা হতো ৩৬০ দিনে এবং এই সংখ্যাটি তাত্পর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হতো। তাই হয়তো এ রকম কিংবদন্তি গড়ে উঠেছে।

বাগেরহাটে খান জাহান আলীর স্থাপত্যকীর্তিকে অনেকে বাংলায় মুসলিম যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকর্ম বলে বিবেচনা করেন। কালের গর্ভে খান জাহানের নির্মিত অনেক স্থাপনা হারিয়ে গেছে। শুধু ধ্বংসাবশেষ দেখে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডামের প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক ফান লোহুইজেন মনে করেন, ‘সাবেক খলিফাতাবাদ শহরটিতে ৫০টির বেশি প্রাচীন স্থাপনা ও পুকুরের অস্তিত্ব আছে, যেগুলোর বেশির ভাগই চিহ্নিত করা হয়নি এবং একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে।’

খান জাহান আলীর নির্মিত স্থাপনাকে দুভাগে ভাগ করা যায়— এক. ধর্মীয়, দুই. সাধারণ। তাঁর স্থাপনায় বাংলার স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার হলেও নকশার ক্ষেত্রে দিল্লির সুলতানদের তত্কালীন স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাংলায় মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে খান জাহানের কীর্তি প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের ১ এপ্রিল প্রকাশিত কলকাতা গেজেটে। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। আঠারো শতকের শেষদিকে মুর্শিদাবাদের নবাব বাহু বেগম নামের একজন নারীকে জায়গির প্রদান করেন, যার মধ্যে ছিল বাগেরহাটও। ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে বাহু বেগম মারা যাওয়ার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জায়গিরের পরিবর্তে বার্ষিক খাজনার ব্যবস্থা নেয়। এর পর এ অঞ্চল গুরুত্ব হারায় এবং জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চল ছিল জংলা নিম্নভূমি। সে সময় ব্রিটিশ সরকার বাগেরহাটের শাসক হিসেবে একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে। স্থানীয় ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহী একজন ম্যাজিস্ট্রেট রেজিওনাল্ড স্টার্নডেল বাগেরহাটের স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন এবং বেশকিছু জলরঙের চিত্রও আঁকেন। তাঁর বর্ণনায় ছিল যে, খান জাহান আলীর সমাধি ঠিকঠাক থাকলেও আশপাশের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে।

খান জাহান আলী কি স্বাধীন প্রশাসক ছিলেন নাকি সুলতানের অধীন? তিনি বাংলার সুলতান মাহমুদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেননি। সে হিসাবে বলা যায়, তিনি ছিলেন একজন স্বাধীন শাসক। কিন্তু তিনি কোনো রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করেননি এবং তাঁর নামে কোনো মুদ্রার প্রচলন করেননি। উল্টো তর্কও আছে। অনেকে মনে করেন, খান জাহান আলী স্বাধীন শাসক ছিলেন না বলেই নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন করেননি।

খান জাহান আলীর পরিবার প্রসঙ্গে তেমন কোনো তথ্য নেই। এর সঙ্গে তিনি কোথা থেকে বাংলায় এসেছিলেন, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তিনি বাংলার স্থানীয় কেউ নন। খলিফাতাবাদ নামকরণে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রচলিত আছে যে, তিনি বর্তমান ভারতের জৌনপুর থেকে বাংলায় এসেছিলেন। সতীশচন্দ্র মিত্র লেখেন, “যশোহর-খুলনার ‘খাঞ্জালি পীর’ বা খাঁ জাহান আলি এবং জৌনপুর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা খাজা জাহান অভিন্ন ব্যক্তি বলিয়া মনে করি।” প্রচলিত প্রবাদ আছে যে, তিনি দিল্লীশ্বর মামুদ শাহের শাসনকালে জায়গির পেয়ে বাংলায় আসেন। মিত্র আরো উল্লেখ করেন যে, ‘ঢাকার একটি মসজিদের দ্বারদেশে একখানি শিলালিপি হইতে জানা যায়, উক্ত মসজিদ যিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন তিনি একজন খাঁ, মামুদ শাহের রাজত্বকালে তাঁহার উপাধি ছিল খান জাহান; উক্ত মসজিদের নির্মাণ তারিখ ১৪৫৯ অব্দের ১৩ই জুন। ব্লাকম্যান সাহের অনুমান করেন যে, এই খাজা জাহান ও বাগেরহাটের খাঁ জাহান এক ব্যক্তি। উক্ত লিপি হইতে দেখা যাইতেছে, যে খাঁ মামুদ শাহের রাজত্বকালে খাজা জাহান উপাধিধারী ছিলেন, তিনিই ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার মসজিদ নির্মাণ করিয়াছেন। সুতরাং তুর্কি শাসক খাজা জাহান ও খাঁন জাহান আলি এক ব্যক্তি।’ খান জাহান আলীর কর্মকাণ্ডে দেখা যায়, তিনি একজন বিজেতা, প্রশাসক, নির্মাতা ছিলেন। তবে তাঁকে এ অঞ্চলে তেমন কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি। তাঁর চরিত্র এবং মহত্ ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে স্থানীয়রা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। অনেকে তাঁর কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, আবার অনেকে ভিন্ন ধর্মের হয়েও তাঁকে ভক্তি করেছেন।

কোনো দলিল কিংবা প্রচলিত বিবরণীতে খান জাহান আলীর কোনো সন্তানের বিবরণ পাওয়া যায় না। এর কারণ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি নপুংসক ছিলেন। অন্যদিকে তাঁর দুই স্ত্রী থাকার কথা প্রচলিত আছে— সোনাবিবি ও রূপাবিবি। কথিত আছে— এই দুই স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়, তখন একজন বিষ খেয়ে বাড়ির পাশের পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্যজনও মারা যান, তাকে ঘোড়াদীঘির পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে সমাহিত করা হয়। এ সমাধিস্থান বিবিজানের মসজিদ বলে পরিচিত।  ইতিহাসবিদরা অনেকেই এই দুজন নারীকে খান জাহান আলীর স্ত্রী নয় বরং পরিচারিকা বলে আখ্যায়িত করেছেন। সতীশচন্দ্র এর পেছনে কারণও ব্যাখ্যা করেছেন— ‘তাঁহার যেরূপ প্রবল পরাক্রম এবং রাজকীয় প্রতিপত্তি ছিল, তাহাতে তিনি সাধারণ পাঠান রাজার মত ইচ্ছা করিলে বহু স্ত্রী গ্রহণ করিতে পারিতেন; কিন্তু সেরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। পাঠান আমলের বহু অত্যাচারের কথা শুনা গিয়াছে কিন্তু খাঁ জাহান আলি বা তাঁহার অনুচর-সম্প্রদায় কখনও কোন স্ত্রীলোকের উপর অত্যাচার করিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইন্দ্রিয়বিজয় যদি দেবতার চিহ্ন হয়, তবে খাঁ জাহান ও তাঁহার আউলিয়াদিগকে পীর বলিতে কোন সম্প্রদায়ের আপত্তি হইতে পারে না। এই সকল প্রসঙ্গ হইতে অনুমান হয়, সোনাবিবি, রূপাবিবি তাঁহার বিবাহিতা বা রক্ষিতা স্ত্রী ছিলেন না। হয়ত তাঁহার দুইটি পরিচারিকার এইরূপ নাম ছিল। তাঁহার বিবাহিতা কোন স্ত্রী থাকিলে তাঁহার সমাধি খাঁ জাহানের সমাধির পার্শ্বেই দেখা যাইত, শহরের এক কোণে অতি হীনাবস্থায় একটি এক গুম্বজ মসজিদ দেখা যাইত না।” 

বাগেরহাটস্থ শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর খান জাহান আলী মৃত্যুবরণ করেন।

 

তথ্যসূত্র

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস

সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর খুলনার ইতিহাস

রিচার্ড ইটন, দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার

যতীন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাঙালীর ধর্ম ও সমাজ

খান জাহান আলী: আ প্রলিফিক বিল্ডার (প্রবন্ধ), অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান

আরও