দরগা বা মাজার ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কমতি নেই। নেকি লাভের প্রত্যাশায় মুসলমানদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বী দর্শনার্থীরাও সেখানে আসেন। সাধ্যমতো মানত করেন, সদকা দেন, কেউবা আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু যে পীর বা দরবেশের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাদের এ আসা, তার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কতটুকুই বা জানতে পারেন তারা? দর্শনার্থীদের দান গ্রহণের জন্য দানবাক্স যেমন সবার চোখে পড়ার মতো স্থানে রাখা হয়, তেমনি মাজারে শায়িত ব্যক্তির জীবন, সাধনা ও ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ ততটা দৃশ্যমান নয়। অনেক ক্ষেত্রে মাজারের সংস্কার ও সংরক্ষণেও রয়েছে অবহেলার অভিযোগ।
বংশপরম্পরায় দরগার দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ এর ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারেন না। অথচ এসব দরগার কয়েকটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত। তার পরও সেগুলোর ইতিহাস সংরক্ষণ, পরিচিতি তুলে ধরা কিংবা দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব চোখে পড়ে।
জনশ্রুতি রয়েছে, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় শাহ ইসমাঈল গাজীর (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত চারটি দরগা রয়েছে। এসব দরগা ঘুরে দেখলে ভক্তি ও বিশ্বাসের পাশাপাশি ইতিহাস সংরক্ষণের ঘাটতিও সামনে আসে।
রংপুর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে পীরগঞ্জ উপজেলার বড়দরগা ইউনিয়নে অবস্থিত শাহ ইসমাঈল গাজীর দরগাটি স্থানীয়ভাবে ‘বড়দরগা’ নামে পরিচিত। ১২ বছর ধরে দরগাটির দেখাশোনা করছেন খাদেম মো. মোখলেছার রহমান। তার পরিবার বংশপরম্পরায় এ দায়িত্ব পালন করে আসছে। মোখলেছার রহমান জানান, তার দাদা খেতাব উদ্দীন বেগের আগে তার দাদার বাবা নয়া মিয়া বেগ দরগাটির পরিচর্যা করতেন। পরে তার বাবা আজিজুল্লাহ বেগ দায়িত্ব পালন করেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি সে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে খাদেমের পাশাপাশি দরগা পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড়দরগাটি এরই মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত হয়েছে।
তবে দরগা প্রাঙ্গণে গিয়ে শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানার মতো কোনো তথ্যফলক, সাইনবোর্ড কিংবা ব্যানার চোখে পড়ে না। ফলে দর্শনার্থীদের পক্ষে এ দরবেশের জীবন, তার সময়কাল কিংবা ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন। দরগার খাদেম ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোখলেছার রহমানের কাছে শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবনী জানতে চাইলে তিনি দু-একটি তথ্যের বেশি জানাতে পারেননি। তার দাবি ইসমাঈল গাজীর দেহ এ দরগাতেই শায়িত রয়েছে।
দরগার ইতিহাস সম্পর্কে সীমিত তথ্য জানা থাকলেও স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে এর গুরুত্ব কম নয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী মমতাজ মিয়ার কথায়, এখানে যিনি শায়িত আছেন, তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল বলে মানুষ বিশ্বাস করে। তার ধারণা, এ দরগায় মানত করলে অনেকেই উপকার পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। সে বিশ্বাস থেকেই প্রতিদিন এখানে মানুষের আগমন ঘটে।
মমতাজ মিয়ার মতে, দরগাটির যথাযথ সংস্কার ও পরিবেশের উন্নয়ন করা হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় মানুষ যেমন উপকৃত হবে, তেমনি দর্শনার্থীরাও আরো ভালো পরিবেশে তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন। একই ধরনের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন পীরগঞ্জের ২০ মাইল ডাসারপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় আরো অনেকে।
দরগায় যাওয়ার সিঁড়ি
পীরগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে চতরা এলাকায় রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত কাঁটাদুয়ার দরগা। দরগার দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত আছেন সৈয়দ হাসান হাবিব লিটু। তার বাবা সৈয়দ আব্দুল মাবুদ মিয়ার মৃত্যুর পর থেকে ভাই সৈয়দ আসাদুজ্জামান লিটন দরগার খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার অনুপস্থিতিতে দেখাশোনার দায়িত্ব সামলান সৈয়দ হাসান হাবিব লিটু। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত হলেও দরগা নেই কোনো পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড বা শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবনী। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেও তার ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
আলাপের এক পর্যায়ে ভ্যানে করে কয়েকজন দর্শনার্থী দরগা আসেন। তাদের এখানে আসার কারণ জানতে চাইলে চালক লাভলু জানান, পাশের এলাকায় বেড়াতে এসে মাজারটির কথা শুনেছেন তারা। তাই দোয়া করতে এসেছেন। তবে এটি কার মাজার, সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। লাভলুর কথায় তাকে শুধু বলা হয়েছিল, এখানে একটি মাজার আছে, তাদের সেখানে নিয়ে যেতে।
চতরা বিজ্ঞান ও কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রব প্রধানের ভাষ্যানুযায়ী, শাহ ইসমাঈল গাজী (রহ.) ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ঘোড়াঘাটের হিন্দু প্রশাসক ভান্দুসী রায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন। অভিযোগ করা হয়, তিনি কামরূপের রাজার সঙ্গে মিলে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দমনে সৈন্য পাঠানো হয় এবং কথিত আছে, ১৪৭৪ সালের অক্টোবরে কাঁটাদুয়ারে তার শিরচ্ছেদ করা হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও কাটাকাটির ঘটনা থেকেই স্থানটির নাম হয়েছে কাঁটাদুয়ার।
অধ্যক্ষ আব্দুর রব প্রধান আরো জানান, শাহ ইসমাঈল গাজীর মৃত্যুর পর সুলতান রুকনুদ্দীন বরবক শাহ ও তার স্ত্রী স্বপ্নে তার অন্যায়ভাবে শিরচ্ছেদের বিষয়টি জানতে পারেন। এতে অনুতপ্ত হয়ে তারা সৈন্য, হাতি-ঘোড়াসহ চতরা, কাঁটাদুয়ার, বড়বিলা ও বড়দরগা এলাকায় আসেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এ সময় শাহ ইসমাঈল গাজীর মাজারের জন্য তারা খাজনামুক্ত জমি দান করেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রংপুর বিভাগের ফিল্ড অফিসার মো. আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল বলেন, ‘রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার অবস্থিত বড়দরগা এবং কাঁটাদুয়ার দুটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত।’ শাহ ইসমাঈল গাজী (রহ) চারটি দরগা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইতিহাস না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়। তবে জনশ্রুতি আছে পীরগঞ্জ সীমান্তে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এবং হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয় ও দিনাজপুর শহরের মাঝামাঝি আরো দুটি দরগা থাকার কথা শোনা যায়। গেজেটভুক্ত পুরাকৃতি ভবনগুলো দেখার দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের। এগুলো কীভাবে পরিচালনা হবে তা নির্ধারণ করবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।’ গেজেটভুক্ত দরগা দুটিতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্যসমৃদ্ধ কোনো সাইনবোর্ড না থাকার বিষয় জানতে চাইলে তিনি তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড আছে বলে দাবি করেন।
উল্লেখ্য, শাহ ইসমাঈল গাজী (রহ.) বারবক শাহের আমলের (১৪৫৯-৭৪ খ্রি.) একজন দরবেশ যোদ্ধা। একটি ফারসি পাণ্ডুলিপি ও বাংলার বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত লোককাহিনীগুলোর মাধ্যমে শাহ ইসমাঈল গাজীর আধ্যাত্মিক গৌরবময় কীর্তি জানা যায়। রিসালাত-উস-শুহাদা নামক এ ফারসি পাণ্ডুলিপি ১০৪২ হিজরি/১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে পীর মুহম্মদ সত্তরী রচনা করেন। এতে বাংলায় শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবনী ও কার্যাবলির বিবরণ রয়েছে। শাহ ইসমাঈল গাজী ছিলেন রসুল (স.)-এর বংশধর এবং তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি বড় হন এবং শিক্ষক ও ধর্মপ্রচারক হন। জীবনের এক পর্যায়ে এসে তিনি শহীদ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। তার কয়েকজন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং শেষ পর্যন্ত লখনৌতে পৌঁছেন। তখন প্রতি বছর বাংলার রাজধানী বন্যায় প্লাবিত হতো। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় বের করার জন্য তার সব প্রকৌশলী ও কারিগরকে নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শাহ ইসমাঈল গাজী সুলতানকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী ছুটিয়া-পুটিয়া নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেন এবং শহরটিকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করেন। দরবেশ তখন সুলতানের অনুগ্রহ লাভ করেন এবং সুলতান দরবেশকে বিভিন্ন সীমান্তে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ করেন। এভাবে দরবেশের জিহাদে অংশগ্রহণ ও শাহাদাত লাভের উদ্দেশ্য সফল হয়।
শাহ ইসমাঈল গাজীকে প্রথমে বাংলার দক্ষিণ সীমান্তে ওড়িশার রাজা গজপতির আগ্রাসী পরিকল্পনার মোকাবেলা করার জন্য নিযুক্ত করা হয়। তিনি গজপতিকে পরাজিত করে তার কাছ থেকে সীমান্ত ফাঁড়ি মান্দারণ দখল করে নেন। সফল এ সেনানায়ককে এরপর কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। কামেশ্বর পরাজিত হয়ে সুলতানকে করদানে বাধ্য হন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই ঘোড়াঘাট সীমান্ত ফাঁড়ির সেনাপতি ভাণ্ডাসী রায় ইসমাঈলের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ইসমাঈল গাজী কামরূপের রাজার সহযোগিতায় নিজের জন্য একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছেন এ মর্মে সুলতানের কাছে মিথ্যা অভিযোগ প্রেরণ করেন। রাগান্বিত হয়ে সুলতান দরবেশের শিরশ্ছেদের আদেশ দান করেন।
এসএম পিয়াল: বণিক বার্তা প্রতিনিধি, রংপুর