রাতের অন্ধকারে শত্রুর রাজধানীতে ঢুকে পড়েছেন এক সেনানায়ক। রাজপ্রাসাদের কঠোর পাহারা এড়িয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন রাজা ও রানির শয়নকক্ষে। চাইলে দুজনকেই হত্যা করতে পারতেন। অথচ তা না করে তাদের চুল একসঙ্গে বেঁধে বুকের ওপর রেখে গেছেন ধারালো তলোয়ার। পরপর তিনরাত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। শেষ পর্যন্ত আতঙ্কিত রাজা নিজেই হাজির হয়েছেন সেই সেনানায়কের শিবিরে—কর ও উপঢৌকন নিয়ে, আনুগত্য স্বীকার করতে।
মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে শাহ ইসমাঈল গাজীকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনীর একটি এমনই নাটকীয় অধ্যায় কামরূপ অভিযান। এখানে যুদ্ধের বিবরণ যেমন আছে, তেমনি আছে অলৌকিকতার দাবি, ধর্মীয় অনুপ্রেরণা, রাজকীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তবে এসব বিবরণকে কেবল বিজয়ীর বীরত্বগাথা হিসেবে পড়লে ইতিহাসের জটিলতা অধরাই থেকে যায়। কারণ ইসমাঈলের উত্থানের এ কাহিনী শেষ পর্যন্ত শুধু এক রাজ্যের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের নয়; বরং মধ্যযুগীয় বাংলায় শাসন, আনুগত্য ও ক্ষমতার সম্পর্কেরও আখ্যান।
ইসমাঈলের জীবনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ধর্মীয় বিশ্বাস। বর্ণিত আছে, আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তার মনে এমন গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে সাধারণ জীবন তার কাছে অর্থহীন হয়ে ওঠে। নিজের এ আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি শিক্ষক মাওলানা হুসামউদ্দিনকে জানান। শিক্ষকের সমর্থন পেয়ে বন্ধুদেরও একই লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। তাদের কাছে পার্থিব গৌরবের চেয়ে শহীদের মর্যাদা ছিল অধিক আকর্ষণীয়।
এ বিশ্বাসকে সঙ্গী করেই ইসমাঈল ও তার অনুসারীরা ঘর ছেড়ে দীর্ঘ অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। দুর্গম বন, মরুভূমি ও বিস্তীর্ণ পথ পেরিয়ে পারস্যের সীমান্ত অতিক্রম করে তারা পৌঁছেন হিন্দুস্তানে। শেষ পর্যন্ত তাদের গন্তব্য হয় বাংলার রাজধানী লখনৌতি। তখন সুলতান বারবকের শাসন চলছে। বিপুল সম্পদ, শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও বিস্তৃত কর্তৃত্বের জন্য পরিচিত এ শাসকের অধীনে ইসমাঈলের সামরিক জীবন নতুন মাত্রা পায়।
কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধে সুলতান বারবক শাহর একাধিক অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বারবার পরাজয়ের পর অভিযানের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয় শাহ ইসমাঈল গাজীর হাতে। আগের সেনানায়কদের ব্যর্থতার ভার নিয়ে তাকে এগোতে হয় এমন এক ভূখণ্ডের দিকে, যেখানে রাজকীয় বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা তখনো অধরাই রয়ে গেছে। কামরূপ জয় তাই তার জন্য কেবল আরেকটি সামরিক অভিযান ছিল না; ছিল সুলতানের আস্থা অর্জন এবং নিজের সামরিক সক্ষমতা প্রমাণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
কিন্তু এবার আর দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা নয়, স্বয়ং কামরূপরাজ সৈন্যবাহিনী নিয়ে সীমান্তের দিকে এগিয়ে এলেন। কামেশ্বরের অগ্রযাত্রার বিপরীতে ইসমাঈলও তার বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত হলেন। দুই পক্ষের সংঘর্ষ হলো লালামের সীমানার মধ্যে সন্তোষের ময়দানে। কিন্তু যুদ্ধ ক্ষেত্রে রাজকীয় বাহিনীর প্রতিকূল অবস্থান তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনল। প্রাণ হারালেন দুই পক্ষের বহু সৈন্য। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১২০ জন জ্ঞানী ব্যক্তি, যারা বীরত্বের পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রেই মৃত্যুবরণ করেন। আর সেখানেই তাদের সমাহিত করা হয়।
এ যুদ্ধে পরাজয়ের ব্যাপ্তি বোঝা যায় জীবিতদের হিসাব থেকে। বর্ণনা অনুযায়ী, ইসমাঈল ছাড়া বেঁচে ছিলেন তার ভাগ্নে মুহাম্মদ শাহ এবং মাত্র ১২ জন পাইক। বিশাল বাহিনী নিয়ে যে অভিযানের সূচনা, তা এসে ঠেকল হাতে গোনা কয়েকজনের টিকে থাকার লড়াইয়ে।
তবে পরাজয় ইসমাঈলের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামাতে পারেনি। ১২ জন পাইকের সহায়তায় নিকটবর্তী স্থানে নির্মিত হলো বারাপাইকা দুর্গ। সেখানে মুহাম্মদ শাহকে দায়িত্বে রেখে ইসমাঈল দুটি সৈন্যদল নিয়ে এগোলেন জলা মাকামের দিকে। জায়গাটি ছিল জলমগ্ন—সামরিক অবস্থান গড়ে তোলার জন্য সহজ কোনো ভূখণ্ড নয়। প্রচলিত বর্ণনায়, সেখানে পৌঁছে ইসমাঈল হাত তুলে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তিনি এমন এক ভূমি সৃষ্টি করেন, যেখানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করা সম্ভব। তখন একটি কণ্ঠস্বর তাকে নির্দেশ দেয়, ‘ঢাল ভর্তি মাটি নিক্ষেপ করো, তাহলে ভূখণ্ড সৃষ্টি হবে।’ বর্ণনা অনুসারে, সেই নির্দেশ মেনেই সেখানে ভূমি তৈরি হয়। ইসমাঈল তার সৈন্যদের ওই স্থানে মোতায়েন করেন।
এ বিবরণে অলৌকিকতার উপস্থিতি ইসমাঈলের ব্যক্তিত্বকে কেবল সেনানায়কের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখে না; তাকে ঘিরে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ধারণাও নির্মাণ করে। মধ্যযুগীয় জীবনী ও লোককথায় এমন অলৌকিক উপাদান প্রায়ই কোনো ব্যক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অংশ হয়ে ওঠে। তবে ঘটনাটিকে ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করা তথ্যের বদলে সংশ্লিষ্ট বর্ণনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত। যুদ্ধের বাস্তবতা আর ধর্মীয় বিশ্বাসের মিশেলে ঘটনাটি তার অভিযানসংক্রান্ত আখ্যানের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব হয়ে ওঠে।
কিন্তু জলমগ্ন ভূখণ্ডে অবস্থান নেয়াই ইসমাঈলের একমাত্র পরিকল্পনা ছিল না। এবার তিনি সরাসরি দূত মারফত কামেশ্বরকে আত্মসমর্পণের বার্তা পাঠালেন। চিঠিতে ইসমাঈল লিখলেন, ‘সুলতান বারবাক আপনার আত্মসমর্পণের আদেশ গ্রহণের জন্য আমাকে নিযুক্ত করেছেন। আপনাকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে আমার সামনে উপস্থিত হতে হবে, যাতে আমি আপনাকে সুলতানের কাছে নিয়ে যেতে পারি এবং আপনার জীবন রক্ষা, আপনার নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন ও আপনার পতাকা রক্ষার জন্য তার কাছে সুপারিশ করতে পারি। যদি আপনি এর অন্যথা করেন, তবে আপনাকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
দূত রাজার দরবারে পৌঁছে সেই চিঠি পেশ করলে ক্রোধে ফেটে পড়লেন কামেশ্বর। তিনি দূতকে হত্যা করলেন না—কারণ দূত হত্যা তার প্রথা ছিল না। কিন্তু জবাবে যে চিঠি লিখলেন, তা ছিল সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান।
‘আমি তোমার জীবন রক্ষা করছি, কারণ দূত হত্যা করা আমার প্রথা নয়; তবে শাহ ইসমাঈলকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলো। আমি তাকে সেখানেই আমার সঙ্গে দেখা করার আদেশ দিচ্ছি। তাকে বলো যে আমি সেই গজপতি নই যাকে সে জয় করেছে এবং যার রাজ্য সে বশীভূত করেছে।’
এখানেই থামলেন না কামেশ্বর। ইসমাঈলের আগের অভিযানের ভয়াবহ পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন তিনি। ‘ইসমাঈল যেন মনে রাখে তার প্রথম সেনাবাহিনীর কী হয়েছিল। যখন তার সব অনুগত সঙ্গীরা নিহত হয়েছে, তখন তার একার বাহিনী দিয়ে আর কী করা যাবে?’
কামেশ্বরের এ প্রত্যুত্তর দুই পক্ষের আসন্ন সংঘর্ষকে আরো উত্তজনাপূর্ণ করে তুলল। রাজা যেন আগের যুদ্ধের ফলকে সামনে রেখে নতুন সংঘর্ষের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন।
চ্যালেঞ্জের জবাবে ইসমাঈল যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। দুই বাহিনী মুখোমুখি হলেও রাত নেমে আসায় সেদিন সংঘর্ষ শুরু হয়নি। বর্ণিত কাহিনীতে, এ বিরতিকেই কাজে লাগান ইসমাঈল। ছদ্মবেশে নগরে প্রবেশ করে প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে তিনি পৌঁছে যান রাজপ্রাসাদের শয়নকক্ষে। সেখানে রাজা ও রানিকে হত্যা না করে তাদের চুল একসঙ্গে বেঁধে দেন এবং একটি তলোয়ার তাদের বুকের ওপর রেখে ফিরে আসেন শিবিরে।
পরদিন সকালে নিজেদের এ অবস্থায় দেখে রাজদম্পতি প্রথমে অতিপ্রাকৃত শক্তির উপস্থিতি অনুমান করেন। পরে উঠানে ঘোড়ার বিষ্ঠা ও খুরের চিহ্ন দেখে মানুষের প্রবেশের সম্ভাবনা তাদের মনে জাগে। কিন্তু প্রহরীদের কঠোর পাহারা সত্ত্বেও কীভাবে কেউ শয়নকক্ষে পৌঁছল, তার ব্যাখ্যা তারা খুঁজে পান না। পরপর তিনরাত একই ঘটনা ঘটার পর তাদের ধারণা হয়, এর পেছনে শাহ ইসমাঈল গাজীই রয়েছেন।
এ পর্বের নাটকীয়তা শুধু ছদ্মবেশে প্রাসাদে প্রবেশের কাহিনীতে নয়; বরং ভয়কে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের ধারণাতেও। যুদ্ধ ক্ষেত্রে যে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা কঠিন, তার মনোবল ভেঙে দেয়ার কৌশল হিসেবে ঘটনাটি উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও কাহিনীর সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, বর্ণনাটি ইসমাঈলের সামরিক ভাবমূর্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর ইসমাঈলের শিবিরে কামেশ্বরের দূত উপস্থিত হন। রাজা প্রাণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে সাক্ষাৎ করতে চান—এমন বার্তা নিয়ে আসেন তিনি। ইসমাঈল নিরাপত্তার আশ্বাস দিলে কামেশ্বর নিজেই কর ও মূল্যবান উপহার নিয়ে তার সামনে হাজির হন। বর্ণনা অনুযায়ী, রাজা ইসমাঈলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
আর আত্মসমর্পণের পুরস্কার হিসেবে কামেশ্বরকে ‘বড়া লরওয়াইয়া’ উপাধি দেন ইসমাঈল। এরপর সুলতান বারবকের কাছে বিজয়ের সংবাদ পাঠানো হয়। চিঠিতে কামরূপের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, রাজার আনুগত্য এবং সংগৃহীত কর ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের কথা জানানো হয়। সুলতান সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাঈলকে সম্মানসূচক পোশাক, ঘোড়া, তলোয়ার ও অলংকৃত কোমরবন্ধ উপহার দেন।
এ স্বীকৃতি ছিল সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক মর্যাদারও প্রতীক। অভিযানে অর্জিত কর্তৃত্বকে সুলতানের অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত করে ইসমাঈল নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। কিন্তু সামরিক বিজয় যে রাজনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না, পরবর্তী ঘটনাই তার ইঙ্গিত বহন করে।
কামরূপ অভিযানে তার সাফল্যকে ঘিরেই শুরু হয় দুরভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্র। ঘোড়াঘাটের সেনাপতি ভাণ্ডাসি রায়ের অভিযোগে তাকে সুলতানের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে সন্দেহ করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেই অভিযোগের পরিণতিতে সুলতান বারবক শাহ তার মৃত্যুদণ্ড দেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
এখানেই শাহ ইসমাঈল গাজীকে ঘিরে বীরত্বধর্মীয় বিশ্বাস ও অলৌকিকতার বয়ান এক নতুন মোড় নেয়। শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় তাকে সম্মান এনে দিয়েছিল; কিন্তু সেই সাফল্যই ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে তার সম্পর্ককে অনিশ্চিত করে তোলে। মধ্যযুগীয় বাংলার রাজনীতিতে তরবারির শক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আনুগত্যের হিসাব, দরবারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্ষমতাসীন শাসকের আস্থা। বিজয়ের ভেতরেই কীভাবে পরবর্তী বিপর্যয়ের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে শাহ ইসমাঈল গাজী তারও এক ঐতিহাসিক আখ্যান।
[১৮৭৪ সালে প্রকাশিত জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্মকর্তা ও নৃবিজ্ঞানী জিএইচ ডামান্টের বিবরণ অবলম্বনে।]
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা