[শাহ গাজী কে হার জায়েশ মাকাম আস্ত - হুমায় মি কুনাদ দর শাহবাজী]
তিনি শাহ গাজী, সর্বত্র রয়েছে তার (আধ্যাত্মিক সম্মানের) আসন; রাজত্বের খেলায় বাজপাখির মতো আছে তার বিচরণ।
রিসালাতুশ শুহাদায় উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি সুফি শাহ ইসমাঈল গাজীর বীরত্ব ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে তুলে ধরে। তাকে নিয়ে রচিত এ জীবনচরিতের সবচেয়ে গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই যে এটি ইতিহাস, কিংবদন্তি ও সাহিত্যের সমন্বয়ে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। গ্রন্থে যেমন সুলতানি আমলের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবেশের চিত্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে ধর্মীয় আদর্শ, অলৌকিক বিশ্বাস এবং ফারসি কবিতামালার ব্যবহার। রিসালাতুশ শুহাদায় বর্ণিত এসব উপাদান মধ্যযুগীয় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনুসন্ধানের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। ফারসি কবিতার আবেগ ও সুফি ভাবনার প্রকাশ পাঠককে শুধু অতীত ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং সমকালীন মানুষের বিশ্বাস, কল্পনা ও স্মৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ ঘটায়।
ইতিহাস সবসময় রাজা-বাদশাহকেন্দ্রিক যুদ্ধজয় কিংবা সিংহাসনের উত্থান-পতনের গল্প বলে না। ইতিহাসের পাতায় কিছু মনীষীর জীবনও লুকিয়ে থাকে, যাদের ঘিরে গড়ে ওঠে জনপদের স্মৃতি, লোককথা ও কিংবদন্তি। মধ্যযুগের বাংলার সুফি-সাধক শাহ ইসমাঈল গাজী তেমনই এক আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। তাকে ঘিরে রচিত ফারসি গ্রন্থ রিসালাতুশ শুহাদা আমাদের মধ্যযুগের মানুষের মনস্তাত্মিক জগৎ ও সমকালে পীর-দরবেশদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান এবং বৃহত্তর পরিসরে ইসলাম বিস্তারে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে। তবে এ গ্রন্থের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এর লাইনে লাইনে লিখিত অতিলৌকিক কাহিনী সমৃদ্ধ বিবরণ। ফলে এর বর্ণনা সরাসরি প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করার আগে এর রচনাকাল, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন সমাজ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সুলতান বারবক শাহের শাসনকালের (১৪৫৯-৭৪ সা. অব্দ) বিবরণ নিয়ে রিসালাতুশ শুহাদা রচিত। পীর মুহাম্মদ শাত্তারী ইবনে আকীল মুহাম্মদ ফারখারী এ পুস্তকের লেখক, যিনি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার কান্তাদুয়ারে অবস্থিত হযরত ইসমাঈলের মাজারে মুতাওয়াল্লি ছিলেন। শাহ ইসমাঈল গাজীর মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে ১৬৩৩ সা. অব্দে (১০৪২ হিজরি) ফারসি ভাষায় তিনি এ পাণ্ডুলিপি রচনা করেন। লেখকের ভাষায়, ‘শিহাবউদ্দিন মোহাম্মদ শাহজাহান বাদশাহ গাজীর রাজত্বকালে এটি লেখার কাজ সম্পন্ন হয়। আল্লাহ তার রাজত্ব ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী করুন। যুগের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ এবং সময়ের শ্রেষ্ঠ লেখকবৃন্দ এ স্বল্পজ্ঞানী ব্যক্তির অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলি সংশোধন করে দিবেন এবং তার ত্রুটিগুলি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। মহান আল্লাহ মানুষের ত্রুটি গোপন করেন এবং তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করেন। এ পুস্তকের নাম রিসালাতুশ শুহাদা রাখা হলো। আল্লাহর অনুগ্রহে এ কর্ম সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হোক।’ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক উল্লেখ করেন, ১০৪২ হিজরির শাবান মাসের ২২ তারিখে শাহ ইসমাঈল গাজীর সমাধিস্থলে কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তি ও রওজার খাদেমরা এ সাধক ও যোদ্ধার জীবন এবং কর্ম নিয়ে আলোচনা করছিলেন। উপস্থিত সম্মানিত ব্যক্তিদের অনুরোধে লেখক সে আলোচনা সংকলনের উদ্যোগ নেন। ফলে শাহ ইসমাঈল গাজীর বাংলায় আগমনের সময়কাল পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ হলেও গ্রন্থটির রচনাকাল আরো পরে। তাই গ্রন্থটি কেবল একজন সাধকের জীবনবৃত্তান্ত নয়; এটি তার স্মৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠিত করারও একটি প্রয়াস এবং এ স্মৃতি ও লোকাকহিনী নির্মাণের পটভূমিতে রেখে গ্রন্থটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
লেখকের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সুফি-সাধকদের জীবনীকে তিনি আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তার ভাষায়, ‘আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত দরবেশদের জীবনী আলোচনা ও পুনরাবৃত্তি আত্মশুদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’ তার কাছে এসব জীবনকাহিনী নিছক অতীতের বিবরণ নয়, বরং মানুষের অন্তর্জগৎকে আলোকিত করার উপাদান। গ্রন্থটিতে দরবেশ ও যোদ্ধা শাহ ইসমাঈল গাজীর আরব থেকে বাংলায় আগমন, বাংলার সুলতানের সঙ্গে মতবিনিময় এবং জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ, যুদ্ধ ও রাজ্য বিজয় এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়।
বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে শাহ ইসমাঈল গাজীর একাধিক দরগাহের খবর জানা যায়। বাংলাদেশের রংপুর জেলার কান্তাদুয়ারে অবস্তিত সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মাজারের খাদেমের নিকট থেকে জিএইচ ড্যামান্ট ইসমাঈল গাজীর জীবনী-সংক্রান্ত পুস্তিকাটি সংগ্রহ করেন এবং ১৮৭৪ সা. অব্দে তিনি এর সংক্ষিপ্ত ইংরেজি অনুবাদ ও হস্তলিখিত ফারসি পাঠ কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশ করেন। ড্যামান্ট লিখেন, I found the MS from which extracts have been given, in the possession of the faqir of Kanta Duar. He assured me it had been in the possession of his family for many generations, but he was unable to read it and was quite ignorant of the contents.
উপরিউক্ত আলোচনার পর ইসমাঈল গাজীর কার্যক্রম গ্রন্থালোকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এ মহান সুফিকে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনমানুষের জীবনবোধ ও বিশ্বাসের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেখা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ায়; বিশেষভাবে বাংলায় ইসলামী সংস্কৃতির সাফল্যের পেছনে মধ্যযুগের সুফি-সাধকদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। টি আর্নল্ড মনে করেন, ‘ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম ধর্মপ্রচারকরা সর্বোচ্চ সফলতা পেয়েছেন বাংলায়।’ রিসালা সূত্রে জানা যায়, সুলতান বারবক শাহের শাসনামলে পূর্বাঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে দরবেশ ইসমাঈল গাজী বাংলায় এসেছিলেন।
গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, শাহ ইসমাঈল গাজীর জন্ম পবিত্র মক্কা নগরীতে। তিনি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, ইবাদত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিবেদিত ছিলেন। ১২০ জন বিজ্ঞ আলেম তার সহচর ছিলেন বলে গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। তাদের শিক্ষক হিসেবে মাওলানা হুসামউদ্দিন আরাবির নাম পাওয়া যায়। শহীদের মর্যাদা সম্পর্কে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআনের আয়াত ও হাদিসের বাণী তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং শাহ ইসমাঈল গাজী ও তার সঙ্গীদের অন্তরে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করে। এ পর্যায়ে তিনি ও তার সঙ্গীরা পরিচিত আবাসভূমি ত্যাগ করে কঠিন ও বিরতিহীন সফরে বেরিয়ে পড়েন। সুদীর্ঘ পথ, বন-জঙ্গল, মরু প্রান্তর পাড়ি দিয়ে আজমের (পারস্যের) সীমানা অতিক্রম করে তারা হিন্দ রাজ্যে (বিলাদে হিন্দ) উপস্থিত হন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলার (লখনৌ/লখনৌতি) রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করেন। এ বিবরণ মধ্যযুগীয় বাংলায় বৃহত্তর আরবীয় অভিবাসনের প্রমাণ। মধ্যযুগে স্থলপথে আরব ভূখণ্ড তথা বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত ছিল; শাহ ইসমাঈল গাজীর অভিবাসন সে বৃহত্তর চলাচলের জগতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে তার যাত্রাপথের প্রতিটি বিবরণ ঐতিহাসিক প্রমাণের আলোকে অনুসন্ধান ও যাচাই করা প্রয়োজন।
লখনৌতির সুলতান বারবক শাহ ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। রিসালাতুশ শুহাদায় শাহ ইসমাঈল গাজীর প্রথম উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হিসেবে ছুটিয়া-পুটিয়া নামের নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বর্ষায় নদীটির প্রবল স্রোতে জনজীবন বিপর্যস্ত হতো। বহু প্রকৌশলী ও শ্রমিক সাত বছর চেষ্টা করেও এ দুর্ভোগ নিরসন করতে পারেননি বলে গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে। রিসালাতুশ শুহাদার বর্ণনা থেকে মনে হয়, সুলতান বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করছিলেন। বন্যার সময় সুলতান যোগাযোগ সমস্যার সম্মুখীন হতেন এবং পানি নিষ্কাশনই ছিল এর আসল সংকট। শাহ ইসমাঈল গাজী সুলতানকে বাঁধের পরিবর্তে সেতু নির্মাণের পরামর্শ দিলেন এবং সুলতনের অনুমোদনক্রমে মাত্র তিনদিন তিন রাতে সেতুটি নির্মাণ করেন। সুফি ভক্তি ও অলৌকিকতার আবহে রচিত গ্রন্থটিতে জনকল্যাণের এ তাৎপর্যপূর্ণ ধারণাটি পাওয়া যায়। নদী, সেতু ও যোগাযোগ মধ্যযুগের বাংলার মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নদী যেমন বাণিজ্য ও যাতায়াতের পথ তৈরি করত, তেমনি বর্ষার প্লাবন মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বিপদের কারণ হতো। ফলে জনদুর্ভোগ দূর করার সঙ্গে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের পরিচয় যুক্ত হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। সাধকের মর্যাদা এখানে শুধু তার ইবাদত কিংবা আধ্যাত্মিক সাধনায় সীমাবদ্ধ নেই, মানুষের বাস্তব সংকট সমাধানের ক্ষমতার সঙ্গেও তা যুক্ত হয়েছে।
গ্রন্থের পরবর্তী অংশে সুলতানের অধীনে শাহ ইসমাঈল গাজীর সামরিক অভিযানের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। লখনৌতি রাজ্যে সেতু নির্মাণের পর তিনি সুলতানের অধীনে প্রশাসনিক কার্যক্রম, রাজ্য বিস্তার ও রাজ্যের সংহতি বিধানের কাজে নিয়োজিত হন। সুলতান বারবক শাহ তাকে একজন সামরিক কর্মকর্তারূপে নিযুক্ত করেন এবং কামরূপ ও মাদারণের অমুসলমান শাসকদের আক্রমণের দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করেন। এসব শাসককে দমন করতে ইসমাঈল গাজী সফল হয়েছিলেন বলে জানা যায়। লিপি ও মুদ্রা প্রমাণে জানা যায়, কামরূপ ও মাদারণ বারবক শাহের শাসনাধীন ছিল এবং শাহ ইসমাঈল গাজী এ এলাকা দুটিতে সামরিক অভিযান পরিচালনায় মুসলিম সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে সফল হয়েছিলেন। গ্রন্থের এ অংশে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মধ্যযুগীয় রাজনীতি তথা শাসকের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব বিস্তার এবং সামরিক অভিযানে সুফি সাধকের অংশগ্রহণের বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়। তবে গ্রন্থের বর্ণনায় যুদ্ধের ঘটনাগুলো গাজীর প্রতি ভক্তি ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে বিজয়ী পক্ষের প্রশংসা, প্রতিপক্ষের নেতিবাচক চিত্রায়ণ ও অলৌকিক শক্তির উল্লেখকে লেখকের অবস্থান এবং সময়ের মানসিকতার আলোকে পাঠ করা জরুরি।
গড় মান্দারনে শাহ ইসমাঈল গাজীর সমাধি ছবি: পিণাক পাণি
রিসালাতুশ শুহাদার ভাষ্যানুযায়ী ৮৮৭ হিজরির ১৪ শাবান শুক্রবার রাতে ইসমাঈল গাজী শাহাদাত বরণ করেন। ভান্দুসি রায়ের ষড়যন্ত্রে সুলতান বারবক শাহ তাকে হত্যা করেন। কিন্তু আবদুল লতীফের ভ্রমণ বৃত্তান্ত অনুসারে তিনি আরো কিছুদিন বেঁচে ছিলেন বলে জানা যায়। ইসমাঈল গাজীর মৃত্যুর পর তার মাজার ঘিরে মানুষের আবেগ অনুরাগ কালক্রমে বৃদ্ধি পায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের আনাগোনা ও তার মাজারে ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন চলমান থাকে।
রিসালাতুশ শুহাদার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঘটনার বিবরণের ফাঁকে ফাঁকে কোরআনের আয়াত, হাদিস ও ফারসি কবিতার ব্যবহার। কবিতাগুলো কখনো সাধকের সাহস ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে তুলে ধরে, কখনো জীবনের গভীর সত্যের ইঙ্গিত দেয়, আবার কখনো তার সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সাধারণ মানুষের আবেগ ও ভক্তির প্রকাশ ঘটায়। মাদারণের রাজা গজপতির বিরুদ্ধে অভিযানের প্রসঙ্গে গ্রন্থে একটি ফারসি পঙ্ক্তি রয়েছে,
[আয কারান তা বে-কারান লস্করে জুলুম আস্ত অলে - আয আযাল তা বাবাদ ফুরসতে দরবেশান আস্ত]
প্রান্ত থেকে প্রান্তরে বিস্তৃত সৈন্য অত্যাচারীর, তবে আদি থেকে অনন্ত রয়েছে সুযোগ দরবেশের।
এ পঙ্ক্তির তাৎপর্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস জোগানো নয়, বরং এখানে একদিকে রয়েছে দৃশ্যমান সামরিক শক্তি, অন্যদিকে আধ্যাত্মিক আত্মবিশ্বাস। ক্ষমতার বাহ্যিক প্রদর্শনই শেষ কথা নয়, মানুষের অন্তরের দৃঢ়তা ও বিশ্বাসও কখনো বিজয়ের প্রেরণা জোগায়—কবিতাটি দৃঢ়ভাবে সেদিকই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সুফি-আখ্যানের এ বৈশিষ্ট্যই গ্রন্থটিকে নিছক যুদ্ধবৃত্তান্তের বাইরে নিয়ে একজন ফারসি সাহিত্যপ্রেমী ভাববাদী পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আবার যুদ্ধের বর্ণনায় পাওয়া যায়,
[দো-দস্তি চুনাঁ মীগুজারীদ তিগ - কাজু খসম রা জান নায়ামদ দরীগ]
দুহাতে এমনভাবে তরবারি চালাও, যেন তা শত্রুর প্রাণ নেয় অনুশোচনা ছাড়াই।
এখানে কবিতার ভাষা কঠোর ও যুদ্ধমুখর। এটি আধুনিক অর্থে শান্তি বা মানবিক সহাবস্থানের কবিতা নয়, বরং দৃঢ় সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি জাগতিক শক্তির বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রন্থটির আরেকটি ফারসি পঙ্ক্তি জীবন সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়,
[হার কে আমাদ বে-জাহান, নকশে খারাবি দারাদ - দর খারাবাত মাপোরসীদ কে হুশয়ার কুজাস্ত]
পৃথিবীতে যে এসেছে, তার মাঝে আছে বিনাশের ছাপ; এই নশ্বর জগতে জিজ্ঞেস করো না সচেতন মানুষ কোথায়?
কবিতাটি একটি শক্তিশালী সুফি চিন্তাকে ধারণ করে। পৃথিবী একটি মোহ ও আসমানি খেলাঘর, এখানে সচেতন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় রাজা কামেশ্বরের সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং বহু অমুসলিম সৈন্য নিহত হয়। এমনকি শাহ ইসমাঈল গাজীর ১২০ জন বিজ্ঞ সহোচরও শাহাদাত বরণ করেন। এ পুণ্যাত্মা শহীদদের সন্তোষে দাফন করা হয়। গ্রন্থে এ বেদনাবিধুর বর্ণনার পর কবিতাটি উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে জীবনকে স্থায়ী অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তন ও বিনাশের অধীন একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়েছে। মধ্যযুগীয় সুফি সাহিত্যে জাগতিক অহংকার, ক্ষমতার অস্থায়িত্ব এবং আত্মোপলব্ধির প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। এ পঙ্ক্তিও সে বৃহত্তর ভাবজগতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয়। গ্রন্থের রাজনৈতিক ঘটনাবলির দিকে তাকালে বিষয়টি আরো অর্থবহ হয়ে ওঠে। সুলতানের ক্ষমতা, রাজাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুদ্ধের বিজয় ও পরাজয় সবকিছুই সময়ের পরিবর্তনের অধীন। কিন্তু সাধকের অনুসারীদের কাছে তার স্মৃতি টিকে থাকে ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের মধ্য দিয়ে। এভাবে কবিতাটি গ্রন্থের কাহিনীকে একটি দার্শনিক মাত্রা দেয়।
শাহ ইসমাঈল গাজীর সমাধি জিয়ারত প্রসঙ্গে গ্রন্থে একটি দীর্ঘ ফারসি কবিতা সংকলিত হয়েছে। কবিতাটির শুরু—
[দিলা কুন আর্জ আয আজ্য ও নিয়াজি - বেহজরতে শাহ ইসমাঈল গাজী]
হে হৃদয়! বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা নিবেদন করো; শাহ ইসমাঈল গাজীর পবিত্র দরবারে।
এর পরের পঙ্ক্তিতে বলা হয়েছে—
[বিয়া দর রওজায়ে আশ আয রোয়ে এখলাস - দিলে খোদ সাফ কুন আয লাহ্ও বাজি]
আন্তরিকতা নিয়ে তাঁর সমাধিস্থলে এসো এবং খেল-তামাশা থেকে নিজের হৃদয়কে নির্মল করো।
কবিতাটির বাকি অংশে সমাধিস্থলে বিনয়, ভক্তি, প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের কথা এসেছে। এখানে সমাধি কেবল মৃত ব্যক্তির শারীরিক উপস্থিতির স্মারক নয়; ভক্তের কাছে তা আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সংযোগের স্থান। এ ধরনের কবিতা থেকে বোঝা যায়, সুফি-সাধকের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় স্থান কীভাবে আবেগ, কল্পনা ও সামাজিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।
শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবনচরিতে অলৌকিক বিবরণের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কামরূপ অভিযানের সময় পানিতে নিমজ্জিত স্থানে প্রার্থনাকালে অদৃশ্য আওয়াজ শুনতে পাওয়া, জলমগ্ন স্থানে উঁচু ভূমি দৃশ্যমান হওয়া এবং সেখানে দুর্গ নির্মাণের বর্ণনা অতিমানবীয়। একইভাবে রাজা কামেশ্বরের সঙ্গে লড়াইকালে রাতের আঁধারে একা একা ঘোড়া নিয়ে নগরের দরজা অতিক্রম করে সুরক্ষিত প্রাসাদে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রবেশের মতো বিবরণ তাকে একজন অতিলৌকিক সাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মধ্যযুগে পীর-দরবেশদের জীবনী ঘিরে এমন অলৌকিক বিষয়ের অবতারণা প্রায় সব সুফি-দরবেশদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তবে আধুনিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে এসব বর্ণনাকে যাচাই না করে আক্ষরিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তাই বলে এগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও যথাযথ নয়। কারণ অলৌকিকতার কাহিনী আমাদের জানায়, কোনো সমাজ তার ধর্মীয় আদর্শ ও প্রিয় ব্যক্তিত্বকে কীভাবে কল্পনা করে। পাশাপাশি সাধককে ঘিরে মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রকাশ পরবর্তী সময়ে কোনো সমাধি, ধর্মীয় স্থাপনা কিংবা নির্দিষ্ট জনপদকে পবিত্র স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। কালের পরিক্রমায় এভাবে ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে এগিয়ে চলে।
ইতিহাসের সামগ্রিক বিষয় অনুধাবনের জন্য রিসালাতুশ শুহাদার মতো সুফি-সাহিত্যের পাশাপাশি সমকালীন দলিল, মুদ্রা-শিলালিপি ও অন্যান্য প্রত্ননিদর্শন এবং ঐতিহাসিক বিবরণ পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। এতে কোন তথ্য সমকালীন প্রমাণে সমর্থিত, কোনটি পরবর্তী স্মৃতির অংশ এবং কোনটি ধর্মীয় কিংবদন্তির অন্তর্ভুক্ত তা আলাদা করে বোঝা সম্ভব হবে। অতীতকে জানার অর্থ শুধু প্রচলিত কাহিনী জানা নয়, বরং সে বর্ণনা কীভাবে তৈরি হলো, কেন তা মানুষের স্মৃতিতে টিকে রইল এবং তার মাধ্যমে সমাজ নিজের অতীতকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও ইতিহাসচর্চার অংশ। শাহ ইসমাঈল গাজীর জীবনচরিত আমাদের সামনে ইতিহাস, বিশ্বাস ও সমকালীন ফারসি সাহিত্য অনুধাবনের নতুন সুযোগ এনে দেয়। গ্রন্থটি আমাদের কেবল অতীতের দিকে তাকাতে শেখায় না, বরং অতীতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও উৎসাহিত করে।
আবু বকর সিদ্দিক: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়