শাহ ইসমাঈল গাজীর ইতিহাস ও কিংবদন্তির খোঁজে

সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের মৃত্যুর পর তার ছেলে রুকনুদ্দীন বারবক শাহ বাংলার সুলতান হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার সময়ে বাংলা সালতানাতের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামরিক বিজয়ের সম্প্রসারণ দেখা যায়। রাজা গণেশ ও তদ্বীয় পুত্র জালালুদ্দীন মোহাম্মদের (ওরফে যদু) মৃত্যুর পরই ইলিয়াস শাহী বংশের অন্য একটি ধারা বাংলার ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়; যেটি পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বা মাহমুদ শাহী শাসন (১৪৩৪-১৪৮৭) নামে সুবিদিত। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহর সময়ে (১৪৬০-৭৪) বাংলার উত্তর-পশ্চিমের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধক শাহ ইসমাঈল গাজীর নাম। পীর মোহাম্মদের লেখা সুফি জীবনীমূলক গ্রন্থ রিসালাত-উশ-শুহাদা (১৬৩৩) থেকে রুকনুদ্দীন বারবক শাহর সামরিক অভিযানের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। মান্দারণ ও ত্রিহুত অঞ্চলে পরিচালিত এসব সামরিক অভিযানে কিংবদন্তির সুফি শাহ ইসমাঈল গাজীর নাম জড়িত। বাংলার উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাংশের বিভিন্ন এলাকায় এ সাধকের একাধিক খানকাহ বা সমাধির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বর্তমান লেখায় শাহ ইসমাঈল গাজীর সমসাময়িক রাজনীতি এবং পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত কিংবদন্তিগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা তুলে ধরতে চাই। উল্লেখ্য, মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসবিদ আবদুল করিম, সুখময় মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ এজাজ হোসেন কিংবা অনিরুদ্ধ রায় সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহর রাজনৈতিক ইতিহাস প্রসঙ্গে ইসমাঈল গাজীর উল্লেখ করেছেন। সবার প্রাইমারি সোর্স বা আকরসূত্র রিসালাত-উশ-শুহাদা ও স্থানীয় কিংবদন্তি।

জিএইচ দামন্তকৃত রিসালাত-উশ-শুহাদার ইংরেজি অনুবাদ থেকে এ সম্পর্কিত কয়েকটি লাইন নিচে তুলে দেয়া হলো—

... in the time of Barbak Shah, Ismail came to Gaur, where he gained the favour of the King by building a bridge or embankment across the great marsh, called elsewhere Chuttiah Patiah. He was then sent against Gajapati, King of Madaran [Mandaran] or Orissa, whom he utterly defeated, and lastly, he fought two battles with Kamesar, King of Kamrup. In the first battle he was defeated, and the second seems to have been somewhat indecisive; but the king finally tendered his allegiance, and consented to pay tribute, though it does not appear that the country was regularly occupied by the Musalmans. The Hindu Governor of Ghoraghat appears to have been envious of Ismail's fame, and falsely charged him with entering into an alliance with the king of Kamrup and conspiring to form an independent kingdom. A force was sent against Ismail, and he was beheaded. (G.H. Damant, 'Notes on Shah Ismail Ghazi', Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1874)

দামন্তের সমসাময়িক ইংরেজ প্রাচ্যবিদ হেনরি ব্লখম্যান বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলা থেকে একটি প্রচলিত কিংবদন্তি সংগ্রহ করেন যা এশিয়াটিক সোসাইটি প্রসিডিংসে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত নিবন্ধ অনুযায়ী শাহ ইসমাঈল গাজী ওড়িশা আক্রমণ করেন এবং বিজয়ী হন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একজন হিন্দু রাজার ষড়যন্ত্রে তিনি ওই এলাকায় স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ফলে সুলতান মান্দারণে দূত পাঠিয়ে ইসমাঈলকে দরবারে ডেকে পাঠান। ইসমাঈল সুলতানের আদেশ মান্য করে দরবারে পৌঁছেন। কিন্তু তিনি গৌড়ে উপস্থিত হলেই তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। পরবর্তী সময়ে তার মস্তকহীন দেহ ঘোড়ার পিঠে বসে মান্দারণ থেকে ঘোড়াঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। ব্লখম্যান কর্তৃক লিখিত স্থানীয় কিংবদন্তির ইংরেজি ভাষ্যটি আগ্রহী পাঠকের জন্য হুবহু তুলে দেয়া হলো:

When the head had been severed from the body, strange to behold, the headless trunk mounted a horse that stood near, and rode off in the direction of Madaran, whilst the head flew up and followed the rider, hovering high in the air perpendicularly above the body.

At night the headless rider arrived before the gate of Bhitargarh, where two of his servants stood on guard. He told them not to be afraid, and explained what had happened to Him in Gaur, and that he had been innocently killed by the king. He then asked them to give him some pan. But this the men would not do, saying that his head was high above, and he would not be able to eat. Then it is not Allah’s will,’ exclaimed Isma’il, ‘that my head should join the body—for he would have been restored to life, if they had given him something to eat, 1 go therefore, my head, go back to Gaur, to he buried there.’ Thereupon the head returned to Gaur the same road it had come, and the grave where it was buried, there, may be seen at this day.

When the head had left, Isma’il asked the guards to open the gates. He entered the town, and coming to a certain spot within the Fort, he ordered the earth to open herself, when suddenly, before the eyes of all, horse and rider disappeared in the yawning abyss. The earth then closed again.

These wonderful events were soon told all over the neighbourhood, and crowds of visitors came to see the hallowed spot where the martyr had disappeared. (H. J. Blochmann, 'The Headless Rider of Madaran', Proceedings of the Asiatic Society of Bengal, 1870)

বাংলার ইতিহাসের দুজন প্রবাদপ্রতিম গবেষক আবদুল করিম ও সুখময় মুখোপাধ্যায় শাহ ইসমাঈল গাজীর ইতিহাস রচনায় এ দুটি আকরসূত্রকেই ব্যবহার করেছেন। সুখময় মুখোপাধ্যায় শাহ ইসমাঈল গাজীর পরিচয় প্রসঙ্গে লেখেন, “রিসালৎ-ই-শুহাদা” নামে একটি ফার্সী ভাষায় লেখা এই বইতে ইসমাঈল গাজী সম্বন্ধে অনেক কথা লিপিবদ্ধ আছে।” এতে বলা হয়েছে:

ইসমাঈল বারবক শাহের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন এবং সুলতানের আজ্ঞাঁয় প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। ....

মান্দারণের রাজা গজপতি বাংলার সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রেরিত সৈন্যবাহিনী প্রথমে পরাজিত হয়। এর পর ইসমাঈলকে এ কাজের ভার দেওয়া হল। গজপতি পিতল দিয়ে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরী করেছিলেন। গজপতি যখন শুনলেন ইসমাঈল নামে একজন ফকির ১২০ জন জ্ঞানী লোককে সঙ্গে নিয়ে তাকে আক্রমণ করতে এসেছে, তখন তিনি হাসলেন। কিন্তু তার রাণী “ভগবানের সৈনিক” ইসমাঈলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে তাঁকে নিষেধ করলেন। রাজা কিন্তু যুদ্ধ করলেন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণরূপে পরাজিত ও বন্দী হলেন এবং তার মাথা কাট! গেল। ইব্রাহিম সুলতানের কাছে তখন আরও বেশী সন্মান পেলেন।

এর কয়েক বছর পর ইসমাঈল কামরূপের রাজা কামেশ্বরের বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ইসমাঈল এবং তার সঙ্গীরা এই রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্ব দেখান। রণক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হল এবং তাতে বাংলার সুলতানের বাহিনীর পরাজয় ঘটে। পরবর্তীতে যুদ্ধ আবার শুরু হয় কিন্তু যুদ্ধের মীমাংসা হবার আগেই রাত্রি হয়। ইসমাঈল রাত্রে ঘোড়ায় চড়ে রাজার প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করলেন এবং তার শোঁবার ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে রাজা-রানী আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ঘুমোচ্ছিলেন, ইসমাঈল তাদের বধ করার সুযোগ পেয়েও করলেন না, তার বদলে তাদের চুলে চুলে বেঁধে দিয়ে এবং দুজনের বুকের উপরে একখানি খোলা তলোয়ার রেখে দিয়ে সেখান থেকে চলে এলেন। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই ব্যাপার দেখে রাজা-রাণী অবাক। গোড়ায় তারা ভাবলেন দুষ্ট কোন প্রেতাত্মা! এ কাজ করেছে, কিন্তু পরে ঘোড়ার মল এবং খুরের ছাপ প্রাসাদের মধ্যে দেখে তাঁরা বুঝলেন এ কাজ মানুষেরই। রাজা অনেক অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদ করেও এ ব্যাপারের কিনারা করতে পারলেন না। এদিকে সেদিন রাত্রেও সেই একই ব্যাপার। তার পরদিন রাত্রেও তাই। রাজা তখন বুঝলেন এ কাজ করেছেন শাহ ইসমাঈল গাঁজী, তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়। রাজা তখন ইসমাঈলের কাছে গিয়ে বশ্যতা! স্বীকার করলেন এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। ইসমাঈল তাঁর এই স্বেচ্ছামূলক আত্মসমর্পণের পুরস্কারস্বরূপ তাকে “বড়া লড়াইয়া” উপাধি দিলেন এবং বাংলার স্থলতানের কাছে খবর পাঠালেন। সুলতান এ খবর শুনে আত্মহারা হলেন এবং ইসমাঈলকে নানারকম রত্ন বসানো। ঘোড়, তলোয়ার ও কটিবন্ধনী প্রভৃতি উপহার দিয়ে সন্মানিত করলেন। (সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল, ১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রীঃ, কলকাতা: ভারতী বুক স্টল, প্রথম প্রকাশ ১৯৬০, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড একত্রে, পৃষ্ঠা ১৯২-১৯৭)

সুখময় মুখোপাধ্যায় উপযুক্ত বিবরণীর অতিপ্রাকৃত উপাদান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তবে তিনি অলৌকিক ঘটনাগুলি বাদ দিলে এই বর্ণনাকে মোটামুটিভাবে ঠিক মনে করেছেন। আবদুল করিমের উপসংহারও একই রকম। কারণ ইসমাঈল বারবক শাহের সেনাপতি ছিলেন। বারবক শাহের সময় লিপি সাক্ষ্য ও মুদ্রা প্রমাণে এসমস্ত এলাকায় তার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রমাণিত। (আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস সুলতানী আমল, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৭।) বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ এজাজ হোসেনও লিপি ও মুদ্রা প্রমাণ বিশ্লেষণে সিদ্ধান্ত নেন যে কামরূপ ও মান্দারাণ, এই দুটি অঞ্চলই রুকনুদ্দিন বারবক শাহের অধীনে ছিল এবং শাহ ইসমাঈল গাজি এই এলাকা দুটিতে সামরিক অভিযানে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত বারবক শাহের ২১টি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৪৬০ থেকে ১৪৭৪ সময়কালে লিপিগুলির প্রাপ্তিস্থান হলো বাংলাদেশের নওগাঁ, দিনাজপুর, রাজশাহী, ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল এবং বরিশাল জেলা। এছাড়াও রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের গৌড়, বীরভূম, বর্ধমান, চব্বিশ পরগনা এবং উত্তর প্রদেশের গাজিপুর। তার মুদ্রায় প্রাপ্ত টাকশালগুলির মধ্যে রয়েছে খাজানাহ, সাতগাঁও, মুজাফ্ফরাবাদ, ফিরুজাবাদ, জান্নাতাবাদ এবং দার-উল-যরব। (Syed Ejaz Hussain, The Bengal Sultanate: Politics, Economy and Coins (AD 1205-1576), Delhi, 2003: 117-127)

ওপরে বর্ণিত ইতিহাস সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে কিছুটা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। কিংবদন্তির স্থানগুলো কোথায়? এখন কি যুদ্ধের ময়দানের দুর্গগুলোকে চিহ্নিত করা যায়? সমগ্র বাংলাদেশেই তো গাজী পীরের নানা উপাখ্যান ও কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে। পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায়ও রয়েছে গাজীর উপখ্যান। মধ্যযুগের বাংলা পুথি সাহিত্যের কালিক সীমানা ছাড়িয়ে গাজীর গান ও কাব্য স্থান পেয়েছে দোভাষী পুথি বা ছাপার অক্ষরে। কিন্তু ইতিহাসবিদদের প্রথাগত বয়ান রিসালাত-উশ-শুহাদা আর সাহেবদের সংগৃহীত কিংবদন্তির কাটাছেঁড়ার মধ্যেই সীমিত রয়ে গেছে। টেক্সট বা লিখিত সূত্র নির্ভর বাংলার ইতিহাসচর্চার এ প্রবণতাকে সাওয়াল তুলেছেন অধ্যাপক স্বাধীন সেন ও তার সহকর্মী প্রত্নতাত্ত্বিকরা (এসএম কামরুল আহসান, আবিন বিন কায়সার এবং আহমদ শরীফ)। এই প্রত্নতত্ত্ববিদদের লিখিত ‘Engaging with the past beyond the comfort zone Early medieval and medieval in the archaeological context of the north-western part of Bengal’ শিরোনামা গ্রন্থ অধ্যায়ে বাংলার ইতিহাস রচনায় প্রত্নতত্ত্বের ব্যবহার, ধারণাগত ও পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তাদের মতে, বাংলার ইতিহাস রচনাগুলোয় প্রত্নতাত্ত্বিক ধারণা ও পদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন দেখা যায় না; এছাড়া ইতিহাসের বয়ানগুলোয় ‘প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্তের প্রকৃতি’ ও ‘প্রেক্ষাপটের (context) প্রতি মনোযোগ’ দেয়ার ক্ষেত্রেও উদাসীনতা লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে ইতিহাসবিদরা নির্দিষ্ট কিছু বয়ানের অনুকূলে প্রায়োগিক বা বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের স্বার্থে প্রায়ই প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্তগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে থাকেন। এ গবেষণায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশে (দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল, রংপুর, গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট জেলার কিছু অংশ এবং বগুড়া জেলার আংশিক) মাঠ জরিপ এবং কিছু স্থানে উৎখনন প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে ঘোড়াঘাট এবং বর্তমান পীরগঞ্জ, কালাই, ক্ষেতলাল ও পাঁচবিবি উপজেলার সংলগ্ন এলাকাগুলোকে গবেষণার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল।

অধ্যাপক সেনের গবেষণাটি বর্তমান লেখার জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কেননা প্রথাগত ইতিহাস বয়ানের সিপাহসালার ইসমাঈল গাজী কিংবা কিংবদন্তির সুফি শাহ ইসমাঈল গাজীর মাজার ও তৎসম্পর্কিত যুদ্ধস্থান (দুর্গ) চিহ্নিত করার প্রয়াস এ গবেষণায় দেখা গেছে। মাঠ জরিপের তথ্যানুযায়ী ঘোড়াঘাটে একটি, পীরগঞ্জে দুইটি (বড়দরগা ও মাজার) শাহ ইসমাঈল গাজীর মাজার হিসেবে শনাক্ত করা যায়। এছাড়া একাধিক দুর্গকে চিহ্নিত করা গিয়েছে, যেগুলোকে প্রাইমারি টেক্সটে উল্লিখিত স্থাপনা হিসেবে অনুমান করা যায়। কিন্তু সুনিশ্চিত অবস্থান ও চিহ্নিতকরণ কঠিন। স্বাধীন সেন ও তার সহগবেষকদের উপস্থাপিত প্রশ্নাদি তোলা রইল ইতিহাসের পাঠকের কাছে।

শাহ ইসমাঈল গাজীর প্রতি নিবেদনের সমাপ্তি টানতে চাই বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রাধীন রংপুরের তাজহাট জমিদার প্রাসাদে স্থাপিত জাদুঘরে প্রদর্শনীকৃত পাঁচটি টেরাকোটা ফলকের উল্লেখের মাধ্যমে। এ পাঁচটি টেরাকোটা ফলকের নির্মাণ ও বক্তব্য উপস্থাপনায় সাদৃশ্য বোঝার জন্য ঝানু প্রত্নতাত্ত্বিক কিংবা ইতিহাস গবেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণ আরবি জ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ প্রতিটি টেরাকোটা লিখিত বাসমালাহ ও কালিমা-ই-তাওহীদ পড়তে পারবেন। প্রতিটি টেরাকোটার শেষে একজন ‍সুফির নাম খোদিত। উল্লেখ্য, কোনো টেরাকোটা ফলকেই তারিখ বা সময় উল্লেখ নেই। একটি ফলক (এক্সেশন নম্বর ১২)

হজরত শাহ ইসমাঈল গাজীর নামসংবলিত। এ পাঁচটি টেরাকোটা বর্তমান রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার ফুলচৌকি গ্রাম থেকে সংগৃহীত। ১২ নম্বর এক্সেশনসংবলিত টেরাকোটা ফলকটির আরবি পাঠ হলো:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল আল্লাহ

হযরত শাহ ইসমাঈল গাজী পীর সাহীব

ফুলচৌকি গ্রামটিতে শাহ ইসমাঈল গাজীর কোনো সমাধির উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ গ্রামে প্রায় দুই শতাব্দী পুরনো একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদটি সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার মোগল স্থাপত্যশৈলীর অনেক উপাদান বহন করছে। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের রণবিজয়ী সেনাপতি শাহ ইসমাঈল গাজীর নাম কীভাবে রংপুরে সংরক্ষিত টেরাকোটা ফলকে উপস্থাপিত হলো। এ পাঁচটি টেরাকোটা ফলক কে এবং কোন উদ্দেশ্যে বানিয়েছিলেন? এ ফলকগুলো কি কোনো স্থাপনার দেয়ালে ছিল? রংপুর, দিনাজপুর কিংবা বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা গাজীর মাজারগুলোর সঙ্গে ফলকের শাহ ইসমাঈল গাজী পীর সাহীব এর সম্পর্ক কি? জনপরিসরে সুফির মাজার-গাজীকাহিনী কিংবা মস্তকবিহীন ঘোড়সাওয়ারের আখ্যান তো ইতিহাসের অংশ। কিন্তু কিংবদন্তি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা কী? এ ধরনের সাওয়াল জওয়াবের বাহাস করার মতো ইলম অধম কাতিবের নেই। তাই শেষ করতে চাই শেখ ফয়যুল্লাহর সত্যপীরের পাঁচালির ভনিতার পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে:

খোঁটাদুরের পীর ইসমাঈল গাজী

গাজীর বিজয়ে সেহ মোক হইল রাজী।।

ড. শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও