ব্রিটিশ ভারতে ‘‌থান্ডারবক্স’

হাজার বছর আগেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন নগরগুলোয় গড়ে উঠেছিল পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সেখানে শৌচাগার ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

ভারতবর্ষে যুগ যুগ ধরে বহু বিদেশী শক্তির আগমন ঘটেছে। কেউ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে, কেউ সামরিক অভিযান চালিয়ে, আবার কেউ সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষায়। তবে এসব শক্তির মধ্যে ইংরেজরা কেবল ব্যবসা বা ক্ষণস্থায়ী আক্রমণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা এ দেশে এক দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক শাসন গড়ে তুলেছিল। একটি ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন বসবাস ও শাসন করতে গিয়ে কেবল প্রশাসন, রাজস্ব কিংবা সামরিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবলেই চলত না, দৈনন্দিন জীবনের নানা বাস্তব ও ব্যবহারিক সমস্যার মোকাবেলাও করতে হয়েছিল। ফলে শহরের রাস্তাঘাট, পানীয় জল, পয়োনিষ্কাশন থেকে শুরু করে শৌচাগারের ব্যবস্থাপনা—সবই হয়ে উঠেছিল সে প্রয়োজনের অংশ। এমনই এক প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘থান্ডারবক্স’ নামে পরিচিত শৌচাগারের ইতিহাস।

থান্ডারবক্স মূলত পাত্রনির্ভর শৌচ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে মলমূত্র একটি পাত্রে জমা হতো এবং পরে তা সরিয়ে নেয়া হতো। থান্ডারবক্সের মতো ব্যবস্থার মূল সুবিধা ছিল, এর জন্য প্রতিটি বাড়িতে ভূগর্ভস্থ নর্দমা নির্মাণের প্রয়োজন হতো না। নির্দিষ্ট পাত্রে বর্জ্য সংগ্রহ করা যেত এবং পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তা সরিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু এ সুবিধার আড়ালে ছিল আরেকটি বড় সমস্যা। বর্জ্যকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া গেলেও তা নিরাপদে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যেত।

আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে মানুষের মলমূত্র অপসারণ ছিল নগরজীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ঔপনিবেশিক ভারতের শহরগুলোয় সে চ্যালেঞ্জ আরো জটিল হয়ে উঠেছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নর্দমা ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞানের কারণে মানুষের দৈনন্দিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছিল এক কঠিন বাস্তবতা।

তবে আধুনিক ফ্লাশ টয়লেটের অনুপস্থিতি মানেই অতীতে শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, এমন নয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে বিভিন্ন ধরনের শৌচাগার ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। তবে অঞ্চল, সামাজিক অবস্থান ও বসতবাড়ির ধরন অনুযায়ী এসব ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য ছিল। কোথাও বাড়ির বাইরে নির্দিষ্ট জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করা হতো, কোথাও ব্যবহার করা হতো গর্ত, পাত্র কিংবা বর্জ্য জমিয়ে রাখার জন্য নির্মিত বিশেষ কক্ষ।

হাজার বছর আগেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন নগরগুলোয় গড়ে উঠেছিল পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সেখানে শৌচাগার ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, এসব নগরের অনেক বাড়িতেই ছিল নিজস্ব শৌচাগার। সেখান থেকে বর্জ্য চলে যেত বাড়ির বাইরের রাস্তার পাশে নির্মিত আবৃত নর্দমায়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত শৌচাগার থেকে বর্জ্য অপসারণের জন্যও ছিল একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সিন্ধু সভ্যতার অবসান ঘটে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় নগরজীবনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বহু সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাও।

পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রাচীন ভারতীয় সমাজে যেমন নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল, তেমনি দিল্লির সুলতানি আমলেও শৌচাগার পরিষ্কারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন আলাদা শ্রমিক। সে সময় বর্জ্য নিষ্কাশনের পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘সন্দা’ নামে পরিচিত এক ধরনের শৌচাগার ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।

ব্রিটিশ ভারতের একটি বিশেষ টয়লেট

মধ্যযুগের দিল্লি ও আগ্রার রাজপ্রাসাদগুলোয়ও শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল। মুঘল স্থাপত্য ও নগরজীবন নিয়ে গবেষণাকারী ঐতিহাসিক আর. নাথের বিবরণে দেখা যায়, প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে নিজস্ব শৌচাগার থাকত। কোনো কোনো স্থাপনায় স্নানাগার ও শৌচাগার একই ব্যবস্থার অংশ ছিল। আবার কোথাও উঁচু প্রাচীর দিয়ে আড়াল করা একাধিক শৌচাগার পাশাপাশি নির্মাণ করা হতো। শৌচাগারের নিচে বর্জ্য জমার জন্য বিশেষ গর্ত বা কক্ষ থাকত, যেখান থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তা সরিয়ে নিতেন। অর্থাৎ শৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি বর্জ্য অপসারণের জন্যও আলাদা ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এ ব্যবস্থা আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো স্বয়ংক্রিয় ছিল না।

ব্রিটিশদের আগমন ও শাসনের বিস্তারের সঙ্গে ভারতে ইউরোপীয় জীবনযাপনের নানা উপকরণ ও অভ্যাসের প্রচলন বাড়তে থাকে। ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা, সৈন্য ও তাদের পরিবারের বসবাসের জন্য নির্মিত বাড়ি, ব্যারাক ও প্রশাসনিক স্থাপনাগুলোয় শৌচাগারের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ প্রয়োজন থেকেই ব্রিটিশরা দিল্লিতে কমোড (থান্ডারবক্স) নিয়ে এসেছিল। তবে এর পাত্র পরিষ্কার করা, বর্জ্য বহন করা এবং তা ফেলার স্থান নির্ধারণ—সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন ছিল নিয়মিত শ্রম ও সংগঠিত ব্যবস্থাপনার।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এ কাজের সঙ্গে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য, পেশাগত বংশপরম্পরা ও সামাজিক বর্জনের কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অবমাননা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। ঔপনিবেশিক নগর ব্যবস্থায় বর্জ্য অপসারণের কাজ সংগঠিত হলেও শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা কিংবা কাজের নিরাপত্তা যে সমানভাবে নিশ্চিত হয়েছিল, এমনটি বলা যায় না। তবে ঔপনিবেশিক শাসনের বিশেষত্ব ছিল এই যে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন শহরে ইউরোপীয় নগর প্রশাসনের ধারণা, নতুন পৌর কাঠামো ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত নীতির বিস্তার ঘটেছিল। কিন্তু আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার গতি ছিল অসম। কোনো কোনো এলাকায় উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ হলেও অন্যত্র পুরনো ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। শহরের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্য সুবিধার বণ্টনও একরকম ছিল না।

থান্ডারবক্সের মতো পাত্রনির্ভর শৌচ ব্যবস্থা ভারতের শৌচাগারের ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। এটি দেখায়, বর্জ্য কোথায় জমা হবে, কে তা সরাবে, কীভাবে পরিবহন করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় ফেলা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো শৌচ ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ হতে পারে না।

কোনো সভ্যতার অগ্রগতি কেবল তার স্থাপত্য, শিল্পকলা কিংবা শাসন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় না, এর পরিচয় মেলে জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায়ও। মানুষের বর্জ্য কীভাবে অপসারণ করা হচ্ছে, পানির উৎস কতটা নিরাপদ থাকছে কিংবা নগরজীবনে পরিচ্ছন্নতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি সমাজের জীবনযাত্রার মান। তাই শৌচাগার ও পয়োনিষ্কাশনের ইতিহাস কেবল দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর ইতিহাস নয়, বরং নগরসভ্যতার বিকাশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রচেষ্টারও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই থান্ডারবক্সের ইতিহাসও কেবল একটি পুরনো শৌচপাত্রের গল্প নয়। এটি ঔপনিবেশিক ভারতের নগরজীবন, জনস্বাস্থ্যের বিকাশ ও পরিচ্ছন্নতার আড়ালে থাকা শ্রমের ইতিহাসও।

সুমাইয়া হক: গবেষক

আরও